• facebook
  • twitter
Tuesday, 17 February, 2026

মূল্যস্ফীতি ও বাস্তবতা

ভারতের মূল্যস্ফীতিকে ঘিরে নীরবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। সাম্প্রতিক খুচরো মূল্যস্ফীতির হার ২.৭৫ শতাংশ— সংখ্যাটি আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তিদায়ক

ভারতের মূল্যস্ফীতিকে ঘিরে নীরবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। সাম্প্রতিক খুচরো মূল্যস্ফীতির হার ২.৭৫ শতাংশ— সংখ্যাটি আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তিদায়ক। কারণ এটি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার নির্ধারিত সহনসীমার মধ্যেই রয়েছে। অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রেখেছে, আর দামও নিয়ন্ত্রিত— এই সমীকরণ যে কোনও নীতিনির্ধারকের কাছে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু প্রকৃত তাৎপর্য লুকিয়ে আছে অন্যত্র— মূল্যস্ফীতি মাপার পদ্ধতিতেই বদল এসেছে।

নতুন ভিত্তিবর্ষে সাম্প্রতিক ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) শুধু পরিসংখ্যানগত সংশোধন নয়, এটি ভারতীয় পরিবারের ব্যয়ের চরিত্রে পরিবর্তনের প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যদ্রব্য ভারতের মূল্যস্ফীতির কেন্দ্রে ছিল। বৃষ্টি কম হলে বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে শিরোনামের মূল্যস্ফীতি হঠাৎ বেড়ে যেত। ফলে অর্থনীতির সামগ্রিক ছবিতেও সেই অস্থিরতা ধরা পড়ত। এখন খাদ্যের ওজন কিছুটা কমানো হয়েছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির সামগ্রিক অঙ্ক আর একমাত্র খাদ্যমূল্যের ওঠানামার উপর এতটা নির্ভরশীল থাকবে না।

Advertisement

এই পরিবর্তন একদিকে বাস্তবতার স্বীকৃতি। ভারতীয় ভোগব্যয় এখন আগের চেয়ে বহুমুখী। শহর ও আধা-শহরাঞ্চলে বাসস্থান, পরিবহন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও বিভিন্ন পরিষেবায় ব্যয় বেড়েছে। ডিজিটাল পরিষেবা থেকে বিমা— খরচের খাতও বিস্তৃত। অর্থাৎ অর্থনীতির কাঠামো বদলাচ্ছে এবং সূচক সেই পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরছে।
এর তাৎক্ষণিক প্রভাব হতে পারে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতি।

Advertisement

খাদ্যদ্রব্য সাধারণত সবচেয়ে অস্থির উপাদান। তার ওজন কমলে সামগ্রিক সূচকও বড় ঝাঁকুনি থেকে রেহাই পায়। মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক তখন প্রত্যেকটি সাময়িক সরবরাহের ধাক্কায় সুদের হার পরিবর্তনের চাপ অনুভব না করে অর্থনীতির অন্তর্নিহিত চাহিদা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারে। এতে নীতির ধারাবাহিকতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়ে।

তবে এই স্বস্তির মধ্যেই সতর্কতার সুর লুকিয়ে আছে। পরিসংখ্যানগত গুরুত্ব কমলেও খাদ্যের গুরুত্ব মানুষের জীবনে কমেনি। নিম্নআয়ের পরিবারগুলির ব্যয়ের বড় অংশ এখনও খাদ্যেই যায়। বাজারে সবজির দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে বা রান্নার তেলের মূল্য বাড়লে সেই চাপ সংসারের বাজেটে স্পষ্টভাবে পড়ে। কিন্তু নতুন সূচকে তার প্রতিফলন তুলনামূলকভাবে কম হলে শিরোনামের সংখ্যা স্থির দেখাতে পারে। তখন প্রশ্ন উঠবে— সূচক কি মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে?

মূল্যস্ফীতির বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু প্রযুক্তিগত পরিমার্জনে নয়, মানুষের আস্থায় নির্ভর করে। যদি মানুষ অনুভব করেন যে, সূচক তাঁদের বাস্তব সমস্যাকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করছে না, তবে নীতির প্রতি আস্থাও কমতে পারে। তাই নীতিনির্ধারকদের সামনে দ্বৈত দায়িত্ব— একদিকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে দৈনন্দিন জীবনের চাপ সম্পর্কে সংবেদনশীল থাকা।

বর্তমান তথ্য ইঙ্গিত করছে, মূল্যচাপ এখন ক্রমশ খাদ্যনির্ভর অস্থিরতা থেকে সরে এসে পরিষেবা ও অন্যান্য ‘কোর’ উপাদানের দিকে যাচ্ছে। এটি অর্থনীতির পরিণত হওয়ার লক্ষণ হতে পারে। যখন পরিষেবা খাতের বিস্তার ঘটে এবং ভোগব্যয় বৈচিত্র্যময় হয়, তখন মূল্যস্ফীতির চরিত্রও বদলায়। কিন্তু সেই পরিবর্তনকে বোঝার জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ ব্যাখ্যা ও নিয়মিত পর্যালোচনা।

এই নতুন মূল্যস্ফীতির ধারা আসলে ভারতের অর্থনৈতিক আত্মপরিচয়ের এক নতুন অধ্যায়। আমরা কি এমন এক অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছি, যেখানে মৌসুমি ধাক্কা কম গুরুত্বপূর্ণ এবং কাঠামোগত প্রবণতা বেশি প্রভাবশালী? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে নীতিনির্ধারণেও সেই আত্মবিশ্বাস প্রতিফলিত হওয়া উচিত। তবে আত্মবিশ্বাস যেন আত্মতুষ্টিতে পরিণত না হয়। শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি কোনও বিমূর্ত পরিভাষা নয়। এটি প্রতিদিনের বাজারে মানুষের অনুভূত অভিজ্ঞতা। সূচকের অঙ্ক যদি স্থিরও থাকে, তবু রান্নাঘরের খরচ বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের কাছে সেটিই বড় সত্য।

তাই নতুন সূচক দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের পথ দেখালেও, নীতির সাফল্য নির্ভর করবে এই ভারসাম্যের উপর— সংখ্যার নির্ভুলতা ও জীবনের বাস্তবতার মধ্যে সংযোগ কতটা মজবুত থাকে। ভারতের সামনে সুযোগ আছে এই পরিসংখ্যানগত সংস্কারকে নীতিগত স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করার। তবে মনে রাখতে হবে, মূল্যস্ফীতির গল্প কেবল অর্থনীতিবিদদের আলোচনার বিষয় নয়, এটি প্রতিটি পরিবারের হিসাবের খাতা। সেই বাস্তবতাকেই শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য দিতে হবে।

Advertisement