লোকসভার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব— ঘটনাটি সংখ্যার বিচারে যত না তাৎপর্যপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি তা প্রতীকের দিক থেকে। কারণ অধ্যক্ষ কেবল একটি সাংবিধানিক পদ নন, তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রের নৈতিক ভারসাম্যের প্রতীক। সেই চেয়ারের প্রতি আস্থা নড়বড়ে হলে সংসদের ভিতই কেঁপে ওঠে।
বিরোধীদের অভিযোগ, অধ্যক্ষ ওম বিড়লা কার্যত সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিরোধী দলনেতাকে বক্তব্য রাখতে না দেওয়া, প্রাক্তন সেনাপ্রধানের একটি বই থেকে উদ্ধৃতি পাঠে আপত্তি তোলা, কয়েকজন সদস্যকে সাসপেন্ড করা— এসব ঘটনার জেরে ক্ষোভ জমেছে। অভিযোগের সত্যতা নিয়ে তর্ক চলতেই পারে। কিন্তু যে প্রশ্নটি আজ কেন্দ্রে, তা হল— সংসদে বিরোধিতার অধিকার কতটা সুরক্ষিত?
Advertisement
সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের কারখানা নয়। এটি প্রশ্ন, প্রতিবাদ ও পাল্টা যুক্তির মঞ্চ। বিরোধী দলনেতা যদি কোনও বইয়ের বক্তব্য তুলে ধরে সরকারের সমালোচনা করেন, তার উত্তর দেওয়ার দায় সরকারের। বইটি প্রকাশিত কি না, এ যুক্তিতে আলোচনা রুদ্ধ করা কি যুক্তিসঙ্গত? যুক্তির বদলে নিষেধাজ্ঞা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না, দুর্বলই করে। জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চয়ই সংবেদনশীল বিষয়, কিন্তু সেটি সরকারের একচ্ছত্র অধিকারের ক্ষেত্র নয়। জনস্বার্থে তার পর্যালোচনা ও প্রশ্ন তোলার অধিকার সংসদের আছে।
Advertisement
আরও উদ্বেগজনক হল, সংসদীয় রীতিনীতির প্রশ্ন। রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হল, অথচ প্রধানমন্ত্রী বিতর্কের জবাব দিলেন না— এমন নজির সংসদীয় ইতিহাসে বিরল। শোনা গেল, অধ্যক্ষ নাকি আগাম আশঙ্কা করেছিলেন যে, বিরোধীরা ‘অপ্রত্যাশিত’ কিছু করতে পারেন। সংসদে অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন উঠবে না— এ আশা কি আদৌ গণতান্ত্রিক? প্রশ্নই যদি আশঙ্কার কারণ হয়, তবে জবাবদিহির সংস্কৃতি কোথায় দাঁড়ায়?
ভারতের সংসদীয় ঐতিহ্যে অধ্যক্ষের নিরপেক্ষতা এক গৌরবময় অধ্যায়। দলীয় রাজনীতির বাইরে উঠে চেয়ারের মর্যাদা রক্ষা করেছেন একাধিক অধ্যক্ষ। সেই ইতিহাসই আজ তুলনার মানদণ্ড। অধ্যক্ষ একবার নির্বাচিত হলে তিনি আর কোনও দলের প্রতিনিধি নন— এই নীতিই সংসদীয় শিষ্টাচারের ভিত্তি। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে আস্থা ভাঙে, সন্দেহ জন্মায়।
অবশ্য দায় কেবল একপক্ষের নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সংসদের উৎপাদনশীলতা ক্রমহ্রাসমান। হট্টগোল, মুলতুবি, ওয়াকআউট— সব মিলিয়ে কার্যদিবসের অপচয় বেড়েছে। বিরোধীরা কখনও কখনও প্রতিবাদের তীব্রতায় আলোচনার পথ সংকুচিত করেছেন। আবার সরকারও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গুরুত্বপূর্ণ বিল দ্রুত পাশ করানোর অভিযোগ এড়াতে পারেনি। ফলে সংঘাতের আবহই হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক।
এই আবহেই অধ্যক্ষের ভূমিকা সবচেয়ে সংবেদনশীল। তিনি যদি উভয় পক্ষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হন, তবে সংসদে সংলাপের পরিবেশ ফিরবে কী ভাবে? শৃঙ্খলা রক্ষা যেমন তাঁর দায়িত্ব, তেমনই মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করাও তাঁর কর্তব্য। একটিকে অজুহাত করে অন্যটিকে খর্ব করা যায় না।
অনাস্থা প্রস্তাবের পরিণতি অনুমেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনীতিতে বিরোধীদের এই উদ্যোগ সফল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু প্রশ্ন হল, তাতে কি সমস্যার সমাধান হবে? সংখ্যার জোরে প্রস্তাব খারিজ করা সহজ; আস্থা পুনর্গঠন করা কঠিন। সংসদ যদি কেবল সংখ্যার অঙ্কে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি শুকিয়ে যায়।
এ-ও মনে রাখা জরুরি, সংসদীয় সংঘাতের অভিঘাত সংসদের বাইরেও পড়ে। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনাস্থা— সব কিছুর সঙ্গে সংসদের ভাবমূর্তি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জনগণ তাঁদের প্রতিনিধিদের পাঠান সমাধানের প্রত্যাশায়। সেই প্রত্যাশা বারবার বিফল হলে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
অতএব এই অনাস্থা প্রস্তাবকে নিছক রাজনৈতিক চাল বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। এটি সতর্কবার্তা, সংসদের ভেতরে জমে ওঠা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। অধ্যক্ষের উচিত নিরপেক্ষতার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার আরও স্পষ্ট করা, বিরোধীদেরও উচিত প্রতিবাদ ও অংশগ্রহণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। সরকারেরও মনে রাখা দরকার, বিরোধিতাকে স্থান দেওয়াই গণতন্ত্রের শক্তি।
চেয়ারের মর্যাদা রক্ষা করা মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে সমর্থন করা নয়, তা সংসদের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা। সেই সম্মান যদি বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে, তবে ক্ষতি সবার। গণতন্ত্রের শক্তি তার বিতর্কে, তার সহনশীলতায়। সেই শক্তিকেই আজ পুনরুদ্ধার করা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
Advertisement



