সৈয়দ হাসমত জালাল
প্রথম পর্ব
Advertisement
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক ময়দানে উত্তেজনা চড়ছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের নজিরবিহীন উপস্থিতি— সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়েও এক বড় পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে।
Advertisement
এই আবহেই জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সোমবার ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ঢোলারহাটে এক নির্বাচনী সভায় তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশকে ‘আফগানিস্তানে পরিণত করতে চাইছে’ এবং দেশকে ইতিহাসের উল্টো দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নারীদের কর্মক্ষেত্র, বিশেষ করে পোশাক শিল্পে কাজের অধিকার খর্ব করার হুমকির প্রসঙ্গ টেনে ফখরুল বলেন, ‘মেয়েরা কাজ না করলে খাবে কী— এই প্রশ্নের কোনও উত্তর জামায়াত দেয় না।’ তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শনকে তিনি উন্নয়ন ও আধুনিকতার পরিপন্থী হিসেবেই তুলে ধরতে চেয়েছেন।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গেও আপসহীন অবস্থান নিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব। তাঁর অভিযোগ, ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিল এবং স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। ‘তাদের কাছে দেশ কখনওই নিরাপদ নয়’—এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি জামায়াতকে রাজনৈতিক ভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি ফখরুল প্রতিশ্রুতি দেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। ঠাকুরগাঁওয়ে মেডিক্যাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিমানবন্দর এবং শিল্পাঞ্চল গড়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
একই সুর শোনা গিয়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যেও। কক্সবাজারের চকরিয়ায় এক নির্বাচনী পথসভায় তিনি জামায়াতের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ‘বিকৃতি’ করার অভিযোগ তোলেন। সম্প্রতি জামায়াত নেতাদের স্বাধীনতার ঘোষণাকারী নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তারাই আজ ইতিহাস পাল্টাতে চাইছে।’ তাঁর দাবি, জামায়াত নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যা আদতে ‘প্রতারণা’।
বিএনপি নেতৃত্ব বারবারই একাত্তরকে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছে। মির্জা ফখরুলের ভাষায়, ‘একাত্তর আমাদের মূল, আমাদের অস্তিত্ব। একে অস্বীকার মানে নিজেদের অস্তিত্ব অস্বীকার করা।’ গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা এবং উন্নয়নের প্রশ্নেও আপসহীন থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।
এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলের নজরও অভূতপূর্ব ভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট পর্যবেক্ষণে ভারত-সহ মোট ১১টি দেশ এখনও ঢাকার আমন্ত্রণের জবাব দেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছেন, যদিও এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে, তবু ইতিমধ্যেই ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নির্বাচনে অংশ নিতে সম্মত হয়েছেন, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে নজিরবিহীন।
মুহাম্মদ ইউনূসের দাবি, এই নির্বাচন ভবিষ্যতের জন্য একটি ‘মানদণ্ড’ হয়ে থাকবে। তবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত, ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দ্বন্দ্ব এবং আন্তর্জাতিক চাপ— সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে?
তবে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বৈধতার লড়াই, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান নিয়ে আশঙ্কা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা— এই তিনটি বিষয়ই এবার ভোটের কেন্দ্রে। বিএনপি স্পষ্ট ভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান জোরালো করতে চাইছে এবং সেই জায়গা থেকেই জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রচিন্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরছে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে একপেশে করে তুললেও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর বাড়তি চাপ নিশ্চয়ই। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়, তার দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক মহল।
Advertisement



