• facebook
  • twitter
Thursday, 29 January, 2026

শরদ পাওয়ার থেকে ফড়নবিশের সঙ্গী: বিতর্কিত, আপসহীন এক নেতা

১৯৫৯ সালের ২২ জুলাই আহমেদনগর জেলার দেওলালি প্রভারার এক সাধারণ গ্রামীণ পরিবারে তাঁর জন্ম

মহারাষ্ট্রের রাজনীতির আকাশে আজ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল এক চেনা ও দৃঢ় কণ্ঠস্বর। অজিত অনন্তরাও পাওয়ার, যাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ক্ষমতার বাস্তবতা, প্রশাসনের দৃঢ়তা আর মাটির মানুষের রাজনীতি। আজ বারামতিতে এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায়, নিজের কর্মভূমিতেই, ৬৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি।
১৯৫৯ সালের ২২ জুলাই আহমেদনগর জেলার দেওলালি প্রভারার এক সাধারণ গ্রামীণ পরিবারে তাঁর জন্ম। রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাঁর রক্তে ছিল, তিনি ছিলেন শরদ পাওয়ারের ভ্রাতুষ্পুত্র, কিন্তু অজিত পাওয়ার নিজেকে কখনও শুধু সেই পরিচয়ে সীমাবদ্ধ রাখেননি। রাজনীতির মাটি তিনি চিনেছিলেন খুব কাছ থেকে, খুব অল্প বয়সেই।
বাবার অকালমৃত্যুর পর কলেজের পড়াশোনা অসম্পূর্ণ রেখে পরিবারের হাল ধরতে হয় তাঁকে।
ডিগ্রির বদলে জীবনই হয়ে ওঠে তাঁর শিক্ষক। সমবায় আন্দোলন, কৃষি, জল আর গ্রামের অর্থনীতি— এসব তিনি শিখেছিলেন মাঠে নেমে, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁকে এক দক্ষ প্রশাসকে পরিণত করেছিল।
রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি ১৯৮২ সালে, একটি সমবায়ী চিনি কারখানার পরিচালন পর্ষদে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ১৯৯১ সালে তিনি পুনে জেলা সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান হন এবং দীর্ঘ ১৬ বছর সেই দায়িত্বে থেকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নিজের ছাপ রাখেন। সেই বছরই তিনি লোকসভায় নির্বাচিত হন বারামতি থেকে, কিন্তু রাজ্যের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে গিয়ে একই বছরে বিধানসভায় উপনির্বাচনে জয়ী হন।
এরপর শুরু হয় এক বিরল রাজনৈতিক অধ্যায়।
১৯৯১ সাল থেকে টানা ৯ বার বারামতি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রমাণ করেন, ভোটারদের বিশ্বাস কতটা গভীর হলে এমন ধারাবাহিকতা সম্ভব হয়। এই ৯টি জয় কেবল নির্বাচনী সাফল্য নয়, এ ছিল তাঁর প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের আস্থা ও ভালোবাসার স্বীকৃতি।
মন্ত্রী হিসেবেও তাঁর পথচলা ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯১–৯২ সালে তিনি কৃষি ও বিদ্যুৎ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন, পরে জলসম্পদ মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলান। বহুবার তিনি মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন পৃথ্বীরাজ চবন, দেবেন্দ্র ফড়নবিশ, উদ্ধব ঠাকরে এবং একনাথ শিন্ডের সরকারের শরিক হিসেবে। ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে থেকেও প্রশাসনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা করে চিনিয়েছিল।
অর্থমন্ত্রী হিসেবে অজিত পাওয়ার ছিলেন পরিসংখ্যানের মানুষ। তাঁর বাজেট বক্তৃতা, আর্থিক বিশ্লেষণ এবং রাজ্যের কোষাগার নিয়ে স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে বিরোধীদের কাছ থেকেও সম্মান এনে দিয়েছিল। কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে তিনি পিছপা হতেন না, এটাই ছিল তাঁর রাজনীতির ধরন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিতর্কহীন ছিল না। ২০১৯ সালে তাঁর এনসিপি দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও স্বল্পস্থায়ী বিজেপি জোট, ২০২৩ সালে এনসিপি ভাঙন এবং দলীয় নাম ও প্রতীক নিয়ে লড়াই— সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন ক্ষমতার রাজনীতির এক জটিল কিন্তু কেন্দ্রীয় চরিত্র। তবু সমর্থকদের চোখে তিনি ছিলেন কর্মঠ, দৃঢ় এবং আপসহীন এক নেতা। তাঁর বিতর্কিত রাজনৈতিক জীবনের পথচলায় ঘটেছে নানা বাঁকবদল।
বিতর্ক ছাড়াও আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে তাঁর নাম। সেচমন্ত্রী থাকাকালীন ৭০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি কিংবা তাঁর পুত্রের পুনেতে জমি কেনা নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। কিন্তু সব সামলে তিনি নিজেকে প্রাসঙ্গিক করে রাখতে সক্ষম ছিলেন।কম কথা, সোজাসাপটা আচরণ আর বাস্তববাদী মনোভাব— এই ছিল অজিত পাওয়ারের পরিচয়। স্ত্রী সুনেত্রা পাওয়ার এবং দুই সন্তান পার্থ ও জয় পাওয়ারকে রেখে গেলেন তিনি।
তিনি এনডিএ-র জোট ছেড়ে আবার কাকা শরদ পাওয়ারের সঙ্গে যোগ দেবেন, এরকম আলোচনা চলছিল৷ সম্প্রতি পুরনির্বাচনেও তিনি লড়েছিলেন বিজেপির বিরুদ্ধে ৷ এসবের মধ্যেই তিনি চলে গেলেন। আর মহারাষ্ট্র হারাল এক দক্ষ প্রশাসক, এক অনমনীয় রাজনৈতিক যোদ্ধাকে। অজিত পাওয়ার চলে গেলেন, কিন্তু বারামতি থেকে বিধানসভা, সমবায় আন্দোলন থেকে রাজ্যশাসন— তাঁর রেখে যাওয়া দীর্ঘ ছায়া মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে থেকে যাবে বহুদিন।

Advertisement

Advertisement