কলকাতার উত্তর প্রান্তের ইতিহাসবহুল চিৎপুর রোড ও রবীন্দ্র সরণির অলিগলি যেন একদিনের জন্য হয়ে উঠেছিল জীবন্ত ইতিহাসের পাঠশালা। শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের বাইরে বেরিয়ে শহরের শিকড়কে ছুঁয়ে দেখার লক্ষ্যে নোপানি হাই স্কুল আয়োজন করেছিল বিশেষ হেরিটেজ ওয়াক ‘Going with Ganga’। জানুয়ারির সকালে মিনার্ভা থিয়েটার থেকে শুরু হয় প্রায় ২.২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ঐতিহাসিক পদযাত্রা, যেখানে নোপানি হাই স্কুলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অংশ নেয় বিভিন্ন স্কুলের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা।
৭২ বছরের প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নোপানি হাই স্কুল, রামবাগান অঞ্চলে অবস্থিত, এই কর্মসূচির মাধ্যমে ছাত্রদের শহরের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। পদযাত্রার সূচনাতেই বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ দিব্যেন্দু সেন শর্মা তুলে ধরেন কলকাতার নাট্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। গিরিশচন্দ্র ঘোষের নাট্যজগতের অবদান, যাত্রাপালার লোকায়ত ধারার শহুরে রূপান্তর, বারুদখানার উৎসব— যা একসময় ছিল সামাজিক মিলনের কেন্দ্র, এমন নানা ইতিহাস ছাত্রদের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
Advertisement
পদযাত্রার পথে উঠে আসে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাখি বন্ধনের স্মৃতি, কোম্পানি বাগানের ইতিহাস, যা আজকের রবীন্দ্র কানন পার্ক। নোপানি হাই স্কুলের ঐতিহাসিক ভবন, চার্নক-লোহিয়া হাসপাতালের প্রায় দু’শো বছরের পুরনো গ্রিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত ভবন অতিক্রম করে যাত্রার সমাপ্তি হয় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। পথে পথে শিক্ষকরা ছাত্রদের শোনান উত্তর কলকাতার অলিগলির গল্প— যেখানে গঙ্গা ছিল জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, আর বাজার, ঘাট ও মন্দিরে মিশে আছে বহু শতাব্দীর ইতিহাস।
Advertisement
এই হেরিটেজ ওয়াকে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট হেরিটেজ ওয়াকার ইফতেখার আহসান, নিউ ইয়র্ক থেকে আসা কলকাতা-প্রেমী মিগুয়েল দিয়াজ, পার্ক ইংলিশ স্কুলের অধ্যক্ষ মেলভিন ডি ডঙ্কার এবং উপাধ্যক্ষা হীনা মুখার্জি। নোপানি হাই স্কুলের সঙ্গে অংশ নেয় আরও পাঁচটি বিদ্যালয়— আর এন সিং মেমোরিয়াল স্কুল, ক্যালকাটা গার্লস স্কুল, শ্রী দিগম্বর জৈন বিদ্যালয়, হরিয়ানা পাবলিক স্কুল ও দ্য পার্ক ইংলিশ স্কুল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নোপানির প্রাক্তনী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকারাও।
প্রায় চারশো বছরের ইতিহাস বহনকারী রবীন্দ্র সরণি একসময় ছিল মুঘল যুগের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। নাখোদা মসজিদ, ঘড়িওয়ালা মল্লিক বাড়ি, লোহিয়া হাসপাতালের নব্য-শাস্ত্রীয় স্থাপত্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিবিজড়িত স্থান— সব মিলিয়ে ছাত্রদের সামনে খুলে যায় এক ‘জীবন্ত জাদুঘর’-এর দরজা।
পদযাত্রার শেষে রথীন্দ্র মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় নোপানি হাই স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে গঙ্গার অবিরাম প্রবাহকে কেন্দ্র করে পরিবেশিত হয় সঙ্গীত ও নৃত্যের সমাহার, যা ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে ছাত্রদের আবেগী সংযোগ আরও গভীর করে তোলে।
এই হেরিটেজ ওয়াক ছাত্রদের কাছে শুধু একটি ভ্রমণ নয়, বরং ইতিহাসকে অনুভব করার এক অনন্য পাঠ। গঙ্গার পবিত্রতা, নগর সংরক্ষণের গুরুত্ব এবং ঐতিহ্য রক্ষার দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছে এই উদ্যোগ। নোপানি হাই স্কুলের এই প্রয়াস প্রমাণ করল— শ্রেণিকক্ষের বাইরে ইতিহাসকে জীবন্ত করে তুললেই গড়ে ওঠে সচেতন, দায়িত্বশীল ভবিষ্যৎ নাগরিক।
Advertisement



