সৈয়দ হাসমত জালাল
সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলিকে কার্যত নতুন মাত্রা দিল। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে করা মামলার শুনানিতে শীর্ষ আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে— তথাকথিত ‘তথ্যগত’ বা ‘লজিক্যাল’ অসঙ্গতির আড়ালে কোনোভাবেই নাগরিকদের ভোটাধিকার খর্ব করা চলবে না।
Advertisement
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনকে ভোটারদের তথ্যগত অসঙ্গতির সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করতে হবে— অনলাইন ও স্থানীয় দপ্তর, উভয় ক্ষেত্রেই। অর্থাৎ, কোন ভোটারের নাম কোন কারণে প্রশ্নের মুখে পড়েছে, তা আর গোপন রাখা যাবে না। এই নির্দেশ স্বচ্ছতার প্রশ্নে কমিশনের এতদিনের অবস্থানকে কার্যত চ্যালেঞ্জ জানাল। একই সঙ্গে আদালত জানিয়েছে, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডের মতো নথিকেও ভোটার পরিচয়ের বৈধ প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ভোটাররা নথি জমা দিলে তার রশিদ দিতে হবে এবং শুনানির সময় তাঁরা চাইলে আত্মীয় বা বুথ লেভেল এজেন্ট (বিএলএ)-কে সঙ্গে নিয়ে হাজির হতে পারবেন।
Advertisement
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের পর্যবেক্ষণ এই মামলার কেন্দ্রীয় সুরটি স্পষ্ট করে দেয়। তাঁর কথায়, এসআইআর-এর উদ্দেশ্য ভুল সংশোধন করা, মানুষকে হয়রানি করা নয়। এই একটি বাক্যেই নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক কার্যপ্রণালী নিয়ে আদালতের অসন্তোষ স্পষ্ট। প্রশাসনিক সুবিধা বা অ্যালগোরিদমিক সন্দেহের দোহাই দিয়ে নাগরিকদের ভয়ের মধ্যে ফেলে দেওয়া কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়— এমনই বার্তা দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
এই প্রেক্ষাপটে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা আরও বেশি করে প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
বিরোধী দলগুলির দীর্ঘদিনের অভিযোগ, তাঁর নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন ক্রমশ শাসক বিজেপির রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে অস্বচ্ছ পদ্ধতি, অতিরিক্ত নথির দাবি এবং প্রশাসনিক চাপ— সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগটি উঠে এসেছে এর মানবিক পরিণতি নিয়ে। এসআইআর প্রক্রিয়ার চাপ ও আতঙ্কে বহু সাধারণ মানুষ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও) চরম মানসিক চাপে পড়েছেন বলে দাবি। কিছু ক্ষেত্রে আত্মহত্যা কিংবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে। মৃতদের পরিবারের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের অবাস্তব সময়সীমা ও লাগাতার চাপই এই মৃত্যুর জন্য দায়ী। যদিও কমিশন এই অভিযোগ মানতে নারাজ, তবু আদালতের হস্তক্ষেপ স্পষ্ট করে দেয়— বিষয়টি আর নিছক রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার জায়গায় নেই।
এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি এনে দিয়েছে। আদালতের নির্দেশ থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে— নির্বাচন কমিশন এতদিন যে পথে এগোচ্ছিল, তা সংবিধানসম্মত নয় এবং গণতন্ত্রের মূল চেতনার বিরোধী। ভোটাধিকার কোনও প্রশাসনিক দয়া নয়; এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশনের কাজ হওয়া উচিত ক্ষমতাসীন বা বিরোধী নয়, সাধারণ মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো। সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশ তাই শুধু একটি মামলার রায় নয়— এটি নির্বাচন কমিশনের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা এবং ভারতীয় গণতন্ত্র রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপ।
Advertisement



