• facebook
  • twitter
Friday, 16 January, 2026

হাফিজের শহরে ফজর ফিল্ম উৎসব

আর একদিন অতিথিদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সিরাজ শহর থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার দূরে পার্সেপোলিস নামের এক ছোট্ট শহরে।

নির্মল ধর

তেহরাণের ফজর ফিল্ম উৎসবের বয়স হল তেতাল্লিশ বছর। বলা যায় উৎসব যৌবন প্রান্ত সীমায় দাঁড়িয়ে। কিন্তু ফিল্ম উৎসব তো আর মানুষের জীবন নয়, যে, চার প্রস্থ সময় নিয়ে তৈরি। ফিল্ম বানানোটা শিল্প— সেখানে গার্হস্থ-বানপ্রস্থ-সন্ন্যাস তো হয় না! সুতরাং ইরানের ফজর ফিল্ম উৎসবই শুধু নয়, ইরানের সিনেমাও বানপ্রস্থ বা সন্ন্যাস জীবনে পৌঁছবে এটা হতে পারে না! অন্তত, বছর দশ আগে পর্যন্ত ভাবা হয়নি। এখন এক নাগাড়ে প্রবীণ দারিয়ুস মেহেরজুই থেকে আব্বাস কিয়ারেস্তামি, মহসেন মাখমালবাফ, জাফর পানাহি, আসগার ফারহাদিরা পৃথিবীর তাবড় ফিল্ম উৎসবে একের পর এক পুরস্কার-প্রশংসা-সম্মান প্রায় কুক্ষিগত করে বিশ্বের সিনেমায় দর্পিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

Advertisement

কিন্তু এখন সেখানে সেই দর্পিত ভঙ্গি কি আর আছে! ইরানের বর্তমান শাসক গোষ্ঠী ধর্মীয় প্রথাকে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যেমন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে দিয়েছে, তেমনইভাবে একই মানসিকতা ঢুকে পড়েছে শিল্পে-সাহিত্যে, বিশেষ করে সিনেমায়— ‘ইসলামিক গাইডেন্স’ নামের নির্দেশিকার আড়ালে। যার নিটফল সপরিবারে মাখমালবাফ পরিবার এখন প্যারিসবাসী। দেশের বাইরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন মহম্মদ রসৌলফ, আমির নাদেরি, বহমান ঘোবাডি, আসগার ফরিদি এবং সাম্প্রতিক সংযোজন জাফর পানাহি। তাঁকে আবার এই ক’দিন আগেই দেশে অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ইরানি আদালত এক বছরের জেল এবং দু’বছরের জন্য বিদেশ ভ্রমণ বাতিলের ’শাস্তি’ ঘোষণা করেছে। এই শাস্তি ঘোষণার সময় জাফর পানাহি নিউ ইয়র্কে সেরা পরিচালকের পুরস্কার নিচ্ছিলেন কান উৎসবে পুরস্কৃত তাঁর নতুন ছবি ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’ ছবির জন্য! আর মাত্র ক’দিন পরেই ৪ ডিসেম্বর ‘রেড সি’ ফিল্ম উৎসবে দাঁড়িয়ে জাফর পানাহি সোচ্চার ঘোষণা করেছেন— ‘আমার একটাই পাসপোর্ট। নিজের দেশেরই দেওয়া। সেটাই আমি রাখব। … যে কোনও মানুষের কাছে তাঁর নিজের দেশটাই বেঁচে থাকার সেরা জায়গা— তা সে যতই অসুবিধে হোক না কেন! আমার দেশেই আমি প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি। বেঁচে থাকার রসদ পাই ওখানেই। আমার সৃজনের মাটি তো আমার দেশ! এখন ইরানে যে সমস্যা, সেটা নিশ্চয়ই সাময়িক— যা যে কোনও দেশে বা সমাজে হামেশাই হয়ে থাকে। দেশে আমি ফিরবই— আজ হোক বা কাল।’ তাঁর ছবি এবার ঠাঁই পেয়েছে অস্কার প্রতিযোগিতায়। আসগার ফারহাদির ‘দ্য সেলসম্যান’ ২০১৭ সালে অস্কার সম্মান পেয়েছিল সেরা বিদেশি ছবির। এবার একই বিভাগে রয়েছে পানাহির ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’। অবশ্য ইরান দেশের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, জার্মানির। পানাহি এখন আমেরিকায় ওই ছবির প্রচারেই ব্যস্ত রয়েছেন। বলেছেন— ‘আমার এই ব্যস্ততার মধ্যেই ইরান সরকার ‘শাস্তি’ ঘোষণা করেছে। আমার উকিল নিশ্চয়ই এই শাস্তির বিরুদ্ধে আবেদন করবে। আর আমিও প্রচারকাজ শেষ করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশে ফেরার কথাই ভাবছি।’

Advertisement

এমন একটা ঘোলাটে পরিস্থিতির মধ্যেই বাড়তি খবর এলো ইরানের জনপ্রিয় অভিনেত্রী গোলসিফতেহ ফারহানিও দেশত্যাগী হয়ে সুইজারল্যান্ডে। এর আগে নায়িকা পরিচালক নিকি কারিমি, শিরিন নেসাত, বেহরাজ ভোসৌঘিও দেশ ছেড়েছেন। এবং তার চেয়েও বড় ঘটনা ইরানি সিনেমার প্রাণকেন্দ্র তেহরান থেকে এবছর ফজর ফিল্ম উৎসবকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে দক্ষিণ ইরানের বড় শহর সিরাজ-এ। (অবশ্য একটা সময় এই শহরটাই ছিল রাজধানী।) উৎসবের উদ্যোক্তারা অবশ্য বলেছেন, আন্তর্জাতিকখ্যাত ইরানি কবি লেখক হাফিজ সিরাজির শহর, সিরাজ পারশিয় শিল্প-সংস্কৃতিরও পীঠস্থান। পোয়েটিক সিনেমা বা সিনেমায় কাব্যের কথা মনে রেখেই এবং হাফিজকে সম্মান জানাতেই ফিল্ম উৎসবের এই ঠাঁই বদল! কিন্তু সত্যিই কি তাই! ফজর উৎসবে সশরীরে উপস্থিত থেকে এবং সাত-সাতটা দিন ওখানে কাটিয়ে কিছু ফিসফিসানিও তো কানে এলো। আগেই জেনেছিলাম ইরানি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম মেকার্স অ্যাসোসিয়েশন উৎসবের এই স্থান বদলকে ভালো চোখে দেখেনি। প্রতিবাদ জানিয়েছিল। এমনকি পরপর তিনটি ছবি নিয়ে কান উৎসব জয়ী তুর্কী পরিচালক নুরে বিলগে চেলানকে আন্তর্জাতিক ফিল্ম প্রতিযোগিতার জুরি চেয়ারম্যান করায় তাঁর বিরুদ্ধেও অভিযাগ জানিয়েছিল অ্যাসোসিয়েশন। তাঁরা অনুরোধ করেছিলেন ইরান সরকার যখন স্বাধীন চিন্তার পরিচালকদের ওপর নানাভাবে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে তখন নুরে বিলগে চেলান যেনে স্বৈরাচারী এই সরকারের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন।

সিরাজে উপস্থিত হয়ে বুঝতে পারলাম তুরস্কের মানুষটি আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন ঠিকই, কিন্তু জনসমক্ষে একটি বারের জন্যও উপস্থিত হননি। এমনকি ছবিও তিনি দেখেছেন আলাদা জায়গায়, একা। অন্য সাতজন জুরির সঙ্গে সম্ভবত চেলান একটিবারই মিলিত হয়েছেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সভায়! এমনকি, তিনি উৎসবের সমাপ্তি সন্ধ্যায় পুরস্কার বিতরণের সময়েও ছিলেন গরহাজির—যা কিনা আন্তর্জাতিক ফিল্ম উৎসবের প্রথা বহির্ভূত কাজ। উৎসবের মাঝপথে এক কর্ত্রী অবশ্য জানিয়েছিলেন— ‘জুরি চেয়ারম্যান নুরে বিলগে চেলান রাজি হলে একবার তাঁকে উৎসবের মার্কেট বিভাগ দেখাতে আনবেন। তখন সব অতিথিদের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থাও হবে!’ কিন্তু না, সেই ঘটনা ঘটেনি। বরং তিনি উল্টে হলিউডি সিনেমা দৈনিক ভ্যারাইটি পত্রিকাকে জানিয়েছিলেন, ‘আমি জুরি সভাপতি হওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছি বটে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে বর্তমান শাসকের কাজকে আমি সমর্থন করি! আমি সিনেমা ভালবাসি, ইরানি সিনেমাকে যথেষ্ট সম্মান দিই, শ্রদ্ধা করি বলেই আমি এই দায়িত্ব নিয়েছি।’

সম্ভবত এমন একটি বিবৃতি দেওয়ার কারণেই চেলানকে উৎসব কর্তৃপক্ষও আর সবার সামনে আনতে চাননি এবং চেলান নিজেও ‘পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স’ এড়িয়ে গেছেন। এমনকি এই প্রতিবেদকের পাঠানো একটি ব্যক্তিগত ই-মেইলের প্রসঙ্গে ছিলেন নিরুত্তর! শুধু তাঁর এমন নীরবতা নয়, পুরো ইরানি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ক’জন প্রতিষ্ঠ, নামী ও পরিচিত ফিল্ম ব্যক্তিত্ব এসেছিলেন উৎসবে তা আঙুলে গোনাও যায় না। একমাত্র উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল রেজা মিরিকারিমির! যাঁর একাধিক ছবি একাধিকবার এই ফজর ফিল্ম উৎসবেই একাধিক বিভাগে পুরস্কার জিতেছে। কখনও সেরা ছবি, কখনও সেরা পরিচালক, আবার কখনও জুরিদের ‘বিশেষ’ পুরস্কার এখানেই হাতে তুলেছেন। এবার তাঁকে বিশেষ সম্মান ফটিক হুমা পাখির মূর্তি তুলে দিতে মঞ্চে এসেছিলেন তিন তিনজন সরকারি ব্যক্তিত্ব। তাঁরা হলেন সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স দপ্তরের মন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস এলাহি, প্রবীণ ফিল্ম আলোকচিত্রী মাহমুদ কালারি এবং ‘ইরানি সিনেমা’ সংস্থার মুখ্য আধিকারিক কামাল তাবরিজ।

এবার উৎসবের প্রাণকেন্দ্র ছিল সিরাজ শহরের দক্ষিণ প্রান্তে পারশিয়ান গালফ সেন্টার। সেখানে বিশাল আকারের একটি শপিং মলও আছে। সেই মলের শেষপ্রান্তে রয়েছে শহর আফতাব আর্ট ক্যাম্পাস অ্যান্ড সিনেমা কমপ্লেক্স। কমবেশি আড়াইশো আসন বিশিষ্ট ছয়টি সিনেমা হল। তারই পাঁচটি হলে সীমাবদ্ধ ছিল উৎসবের সব ছবি দেখানো। হলগুলি ১ থেকে ৬ নম্বর দিয়ে নির্দিষ্ট করে হলগুলির নাম ছিল পারপল্, ইয়োলো, গ্রিন, রেড আর অরেঞ্জ! হলগুলির দেওয়াল নির্দিষ্ট রং-এ রাঙানো।

আর দু-পাশে ছড়িয়ে থাকা হলগুলির মাঝের ফাঁকা জায়গাটিতে এবছর বসেছিল ফিল্ম মার্কেট। প্রায় সাত/আট বছর ধরে নিয়মিত উপস্থিত থেকেছি ফজর ফিল্ম উৎসবে। ছবি দেখার পাশাপাশি ছবি নিয়ে আলোচনা, সাংবাদিক আসর, পরিচালকের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্ব, মাস্টার ক্লাস সবকিছুই হয়েছে এবার। কিন্তু সেখানে উপস্থিতির সংখ্যা কোনওভাবেই উৎসাহব্যাঞ্জক নয়! এমনকি বার্লিন উৎসবের প্রেরণায় ‘ট্যালেন্ট ক্যাম্পাস’ নামের বিভাগটিতেও ভারত-বাংলাদেশ থেকে বেশ ক’জন তরুণ প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকেও এসেছিলেন একঝাঁক তরুণ।

এত বছর ধরে ফজর উৎসবে আসার একটা বড় কারণ সাম্প্রতিক ইরানি সিনেমার সঙ্গে পরিচিত হওয়া। মার্কেট বিভাগে এবার মাত্র একডজন ফিল্ম সংস্থা অংশ নিয়েছিল শুধুমাত্র প্রতিনিধি পাঠিয়ে। আর স্টল করেছিল ছয়টি সংস্থা। বাকি স্টলগুলি ভাগ করে নিয়েছিল চিন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তান, লেবানন, কাতারের আল জাজিরা, রুশ ফেডারেশনের তাজকিস্তান, উজবেকিস্তান। কিন্তু, মজার ঘটনা— মার্কেটিং বিভাগ তো শুরুই হল উৎসব শুরুর (২৬ নভেম্বর) তিনদিন পর ২৯ নভেম্বর। চলেছিল মাত্র তিনদিন ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরই মধ্যে দেখা মিলল চিনের স্টলে ঝাং ঝন নামের এক তরুণ চিনা প্রযোজক-পরিচালকের সঙ্গে। আশ্চর্যের ব্যাপার নতুন ছবি ‘চাং আন জিয়ান’-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন একজন ভারতীয় পরিচালক ডা. বিজু দামোদরণ। উনি আমাদের ঘনিষ্ঠ পরিচিত জেনে জমল আড্ডা! বেলারুশের রাজধানী মিনস্ক-এর ফিল্ম উৎসবে বিজু আর ঝাং-এর পরিচয়। পূর্বজন্ম আছে কিনা, সেটা নিয়েই এই ছবির গল্প। বিজুরই কাহিনী। গল্প শুনে ঝাং রাজি হন ছবিটি বানাতে। ভারতে অল্প ক’দিন শুটিংও হয়েছে জানালেন ঝাং ঝন। এখনও চিনে মুক্তি পায়নি ছবি। ইচ্ছে আছে ভারতেও ছবিটি দেখানোর। বুদ্ধদেবের জাতক কাহিনী আমাদের কাছে পরিচিত। বুদ্ধদেব বিভিন্ন জন্মে বহুরূপী ‘জাতক’ হয়েছেন। এই ছবি সেই সত্যকেই প্রতিষ্ঠা দেয়। এই ডা. বিজুর পরিচালনায় পাপুয়া নিউগিনি দেশটার প্রযোজনায় ‘পাপা বুকা’ নামের ছবিটি এখন অস্কার প্রতিযোগিতায়! কী হবে সেটা অনুমান করা গেলেও আবার একজন ভারতীয়র নাম অস্কার প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে গেল— সেটাই বড় খবর। সেই ডা. বিজু চিনের এক তরুণ পরিচালকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কাহিনীকার সূত্রে— সেটাই বা কম কিসে! দেখা হল অস্ট্রেলিয়াবাসী ইরানি তরুণী রওনক তাহের-এর সঙ্গে। সে নিয়ে এসেছিল তাঁর প্রথম ফিচার ছবি ‘টু ফেসেস অফ অটাম।’ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগে থাকা ছবিটি যুগ্মভাবে সেরা ছবির পুরস্কার জেতে। অন্য ছবিটি ছিল টিউনিশিয়ার ‘রাউন্ড ১’। পরিচালক মহম্মদ আলি নাহদি। রওনকের ছবিটা দেখেছি। একটি ইরানি পরিবারের ঘরোয়া জীবনের ছবি— যেখানে ‘তালাক’ আছে আবার মিলনও আছে। মন্দ নয় মেকিং, তবে বিষয়ে অভিনবত্ব নেই। আমার চারটে দিনের বেশির ভাগ সময়টাই কেটেছে ৫ নম্বর প্রেক্ষাগৃহ অর্থাৎ পার্পল হলে। দিনে চারটে করে একমাত্র ইরানি ছবিই দেখানো হয়েছে। ওখানেই প্রথম শো-তে দেখেছি অজানা ইরানি পরিচালক আরাশ আনিসি’র ‘ফার ফার ইন দ্য মিডল ইস্ট।’ ক’দিন আগেই টোকিও ফিল্ম উৎসবে ইরানের প্রতিনিধিত্ব করেছে। একজন নারী পরিচালকের প্রথম ফিচার ছবি তৈরির ভেতরকার সমস্যা নিয়ে ছবি! কিন্তু আরাশ আনিসি শুরু থেকেই ছবির ফটোগ্রাফি, সম্পাদনা ও লোকেশন নির্বাচনের মধ্যেই এক মরমী কবিতার ছন্দ জাগিয়ে তোলেন। একটু দীর্ঘ হলেও ছবিটি দৃশ্য বিন্যাসে এবং আলোকচিত্রীর কৃৎকৌশলে এক মায়াময় জগৎ তৈরি করে পর্দায়, যা এবারের ফজর উৎসবে তেমনটা আর দেখি না।

ভালো লাগার দ্বিতীয় ছবিটি হল ‘কাম ম্যান’। পরিচালক: বেহনুস সাদেঘি। মধ্যবয়সী এক আফগান পুরুষ জামাল বিয়ে করে কিশোরী ছাত্রী শামিলাকে। সে পড়াশুনো করতে চায়, স্কুলে যেতে আগ্রহী। বিয়ের ব্যাপারে কোনও আগ্রহ নেই, এমনকি সে নারী-পুরুষের সম্পর্কের ব্যাপারটাও সম্ভবত বোঝে না। অনাথ শামিলাকে তার কাকা-কাকিমা বুনো জামানের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে যেন আপদ বিদেয় করেছে, কিন্তু জামান বুঝতে পারে শামিলার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এবং ‘বিয়ে’ ব্যাপারটার প্রতি অনীহার মনোভাব। তার কাছে মাঝেমধ্যে লুকিয়ে দেখা করতেও আসে গ্রামের প্রেমিক। এবং একসময় প্রেমিকার ছোরার আঘাতে আহত জামান শামিলাকে প্রতিবেশীর নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। শামিলাকে বলে যায় আমি আল্লাহর কাছে ‘স্নান’ করতে যাচ্ছি। ভয়ার্ত কিশোরীর সঙ্গে কোনও শারীরিক সম্পর্ক না করেই শান্ত ভঙ্গিতে জামান চলে যায়। বিষয়টি অবশ্যই যথেষ্ট মানবিক, তবে পরিচালক বেহনুস নিতান্ত সাধাসিধে ভঙ্গিতে সরলরেখায় গল্পটি বলেছেন শুধু। সিনেমাটিক কোনও নৈপুণ্য বা গুনপনা নেই। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে বরং ভারতীয় মালায়ালাম ভাষার ছবি তরুণী হিন্দু লক্ষ্মীর পরিচালনায় ‘দ্য আদার সাইড’ অনেক বেশি সমাজসচেতনতা এবং ফিল্মি ভাষার প্রমাণ রাখে। স্বামী-স্ত্রী এবং তাদের কৈশোর উত্তীর্ণা কন্যা জানকীকে নিয়েই ছবির গল্প। মা অপঘাতে (আত্মহত্যা!) মারা গেলে ওই গ্রামের নিয়মমতে স্বামী বা মেয়ে কেউই মৃতার সৎকার করতে পারবে না।

প্রতিবেশীরা পেশি শক্তির সাহায্যে ওদের দু’জনকেই গৃহবন্দী করে মৃতের সৎকার করে ফেলে। এমনকি একই সঙ্গে পারলৌকিক শ্রাদ্ধেরও আয়োজন হয়। এদিকে বদ্ধ ঘরে কন্যা জানকীর শরীর ‘খারাপ’ হয়ে যায়। মা মৃত্যুর আগে মেয়েকে বলেছিল তার চিতাভস্ম যেন হিমালয়ের নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। মায়ের সেই অনুরোধ রাখতে তথাকথিত ‘অপবিত্র’ অবস্থায় বদ্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে সব্বাইকে ঠেলে সরিয়ে শ্রাদ্ধস্থান থেকে মায়ের চিতাভস্মের পাত্রটি নিজ হাতে তুলে নেয় জানকী। এরপর বাবাকে নিয়ে সোজা হিমালয়ে! নিঃসন্দেহে ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদের ছবি এই ‘দ্য আদার সাইড’! ইন্দুলক্ষ্মীর পরিচালনার কাজটিও সরল, স্বচ্ছ, সাধারণ খুবই। কিন্তু বিষয়ের জন্য মনে রাখতে হয়।

দুর্ভাগ্যের বিষয় উৎসবে দেখা বাকি আটটি ইরানি ছবির মধ্যে একটিতেও আজকের ইরানের সমাজচিত্র ফুটে উঠতে দেখলাম না। ‘দ্য ফিশারম্যান’ ছবিটায় (পরিচালক: জাভেদ আফসর) ইরাক-ইরান যুদ্ধের সেই পুরনো ইতিহাস খুঁড়ে দেখা, ইরাকের বাথ পার্টির সমালোচনা। বাজা জামালির ‘হি ডাজ নট স্লিপ’ ছবিতেও ইরাক যুদ্ধে যাওয়া সন্তান না ফেরায় আতঙ্কিত বাবার দীর্ঘ সময় অনিদ্রার কথা বলা হয়। ফেরেদৌস নাজাফির ‘উল্ফ হেয়ার’-এও সেই অতীত চারণা। অ্যাসো নামে এক কিশোরের বাবা খুনের অভিযোগে পলাতক। পুলিশ খুঁজছে অ্যাসোকেও। সে অগত্যা মেয়েদের পোশাক পরে তুতো ভাই পরিকে নিয়ে চলে যায় অ্যাপেল উপত্যকায় মায়ের খোঁজে। আজকের ইরানের সমাজচিত্র ইরানের সিনেমায় ঠাঁই পাচ্ছে না। যেটুকুও পাচ্ছে, তা সংসার-পরিবার আর কমেডিতে ভরা! একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল হেসাম ফারমন্দের প্রথম ফিচার ছবি ‘রাহা’! রাহা নামের এক ইরানি তরুণী এক বছর আগে ‘নারী-জীবন-স্বাধীনতা’র আন্দোলনে যোগ দিয়ে পরে গ্রেপ্তার হয় নীতি পুলিশের হাতে। প্রতিবাদী রাহা মুখ খোলে না। তার আসন্ন পরীক্ষার জন্য একটি ল্যাপটপ প্রয়োজন। কিন্তু বাবার আর্থিক ক্ষমতা নেই। তার পেশা পুরনো জিনিসপত্র কেনাবেচা করা! অগত্যা মেয়েটি তার দীঘল চুল বিক্রি করে ল্যাপটপ কেনার জন্য বাবাকে টাকা দেয়। কিন্তু সেই অর্থও যথেষ্ট নয়। অগত্যা বাবা একটি পুরনো ল্যাপটপ চোরাই বাজার থেকে কেনে। এরপর ধারাবাহিকভাবে নাটকের চাপান উতোর! ছবি শুরু হয়েছিল যে আশা নিয়ে তা এক কল্পিত পারিবারিক নাটুকেপনায় শেষ হল! এমনই বেহাল অবস্থা এখনকার ইরানি সিনেমার। কোনও রাজনীতির প্যাম্ফলেট না হয়েও বাহমান ঘোবাডি’র ‘টার্টল কান্ট ফ্লাই, মজিদ মাজিদির ‘সঙ অফ স্প্যারো’, জাফর পানাহির ‘দ্য সার্কেল’, আব্বাস কিয়ারোস্তামির ‘দ্য হোয়াইট বেলুন’, আসগার ফারহাদির ‘সেপারেশন’ তো ইরানের মানুষের আশা-স্বপ্ন এবং তার বিপরীত পরিস্থিতির কথাই সহজ-সরল গল্পের মধ্যে তুলে ধরেছিল। এখনকার ইরানে কি তাঁরা বিস্মৃত বা ফসিল! নাকি তাঁরা কলম ও ক্যামেরা ধরতেই পারছেন না? এই প্রশ্নের কোনও জবাব নেই বর্তমান প্রজন্মের কাছে। এমনকি রেজা মিরিকারিমিও অস্ফুট ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি দিয়ে কণ্ঠ রোধ করে রইলেন। তাঁর উত্তরটা অবশ্যই অবোধ্য রইল না!

এবং আরও বিস্ময় ও মজার ঘটনা রাজধানী তেহরান থেকে সিরাজ শহরে ফিল্ম উৎসবকে সরিয়ে আনার অন্যতম কারণ হিসেবে উদ্যোক্তারা বলেছেন, দেশের আইকনিক কবি ও ইরানি সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের প্রথম নাম হাফেজ সিরাজিকে স্মরণ রেখেই হাফেজ-এর জন্ম ও মৃত্যুর শহর ‘সিরাজ’কে নির্বাচন। যে কবি মানসিকভাবে থিওজফিক্যাল হয়েও দর্শন অধ্যয়ন করেছিলেন। কোরান তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল কিশোর বয়স থেকেই। কাব্যচর্চাও শুরু হয়েছিল একই সময়ে। হাফিজের কবিতা ও গজলের প্রতিটি লাইনে ঐশী প্রেম বিদ্যমান। তাঁরই কলম থেকে বেরিয়েছে—
‘হায় বধুয়া দাও পেয়ালা ঢালো শরাব মধুক্ষরা
সহজ ছিল পথটি প্রেমের দেখছি এখন কাঁটা ভরা,
ভেবেছিলাম ভোর বাতাসে কস্তুরীবাস আসবে ভেসে
বধূর চিকন চিকুর হতে, কলজে হলো ঘায়েল শেষে।’

কিন্তু আজকের সিরাজ শহরে সেই প্রেমিক শিল্পী, সুফি গায়ক কবি সিরাজ কতটুকু আর উপস্থিত আছেন?
তবে এবারের ফিল্ম উৎসবে আসা অতিথিদের একটি বিরল সৌভাগ্য হয়েছে। কবি হাফিজের সমাধিস্থল দর্শন। উৎসবের কর্তারাই দু’দফায় অতিথিদের সাদরে নিয়ে গিয়েছিলেন সিরাজ শহরে গোলগত-এ-মোসাল্লা অর্থাৎ মোসাল্লা বাগানে, যেখানে সুন্দরভাবে ফুলের বাগান ও লেবু গাছের শান্ত পরিবেশে রয়েছে তাঁর সমাধি। চারদিকে উৎকীর্ণ তাঁর কবিতার লাইন। রয়েছে হাফিজ স্টাডি সেন্টার। অতিথিদের জন্য প্রায় আধ ঘণ্টার এক বাদ্যসঙ্গীতের আয়োজন হয়েছিল পারশি মহাকবির কবিতাকে ভিত্তি করে।

দেখানো হয়েছিল পিংক মস্ক, যার প্রকৃত নাম পাসির-উল-মুলক মস্ক। সূর্যোদয়ের প্রথম আলো— এই মসজিদের ঘষা কাঁচের ওপর পড়লে এক অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য তৈরি হয়, সেটাই বড় আকর্ষণ এই বড় মাপের মসজিদের। তবে খুব ভোরে যাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। বেলা দশটা নাগাদ নানা রঙিন কাঁচে ঢাকা প্রার্থনা ঘরে ঢুকেই মালুম হচ্ছিল কাকভেরের সৌন্দর্য কেমন হতে পারে!

আর একদিন অতিথিদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সিরাজ শহর থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার দূরে পার্সেপোলিস নামের এক ছোট্ট শহরে। যেখানে রয়েছে সম্রাট দারিয়ুস-এক-এর তৈরি বিশাল প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। খ্রীষ্টপূর্ব ৫১৫ বছর আগে পারসিক নববর্ষ অর্থাৎ ‘নওরোজ’ উৎসব পালন করা হতো এখানে। দুর্ভাগ্যের বিষয় খ্রীষ্টপূর্ব ৩৩০ সালে গ্রীক রাজা আলেকজান্ডার প্রায় পুরো রাজপ্রাসাদটি আগুনে পুড়িয়ে দেন। কারণ তার আগেই পারসিয়রা গ্রীসের রাজধানী এথেন্সকেও একইভাবে ধ্বংস করেছিল। এখন এই পার্সেপোলিসের ধ্বংসাবশেষের কংকালসম চেহারাটি ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সম্মান নিয়ে ট্যুরিস্টদের কাছেই শুধু দর্শনীয়!

ওখান থেকে ফেরার পথে মনে হচ্ছিল ইরানি সিনেমার সোনালি সময়গুলো মাত্র পাঁচ/দশ বছর আগেও তো অস্তিত্ব ছিল। এখন সেই সোনালি সময়ের একাধিক স্থপতি দেশ ছাড়া! তাঁরা কি আবার ফিরে আসবেন? তাঁদের ফিরে আসার ‘সুসময়’ কি তৈরি করে দিতে পারবে বর্তমানের ধর্মভিত্তিক শাসক গোষ্ঠী? প্রশ্ন এবং উৎকণ্ঠা নিয়েই অপেক্ষা করতে হবে হয়তো। মহাকবি হাফিজ-ই তো ধর্মের নামে প্রতারণা ও ভান করা সম্পর্কে লিখেই গেছেন, ‘…কপটতা ও প্রতারণার আগুন ধর্মের ‘ভার’কে অবশ্যই জ্বালিয়ে ফেলবে, হে হাফিজ! দরবেশি পোশাক পরিত্যাগ করে সামনে অগ্রসর হও।’ আমরা অপেক্ষায় রইলাম সেই নব-পরিবর্তনের!

Advertisement