প্রথম একদিনের ম্যাচের মতোই ভারত ও নিউজিল্যান্ডের দ্বিতীয় লড়াইটাও বেশ হাড্ডাহাড্ডি জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ভারত চ্যালেঞ্জ জানিয়েও হেরে গেল নিউজিল্যান্ডের কাছে ৭ উইকেটে। এই জেতার ফলে নিউজিল্যান্ড সমতা ফিরিয়ে আনলে একদিনের সিরিজে। প্রথম ম্যাচটা ভারত জিতলেও শেষ রক্ষা করতে পারল না দ্বিতীয় একদিনের ম্যাচে। নিঃসন্দেহে বুধবারের এই ম্যাচটা দারুণ উপভোগ্য হয়। তবে দর্শকরা ভারতের লোকেশ রাহুল ও নিউজিল্যান্ডের ড্যারিল মিচেলের শতরান দেখে অভিভূত। দু’জনেই দুরন্ত ব্যাট করেছেন।
দ্বিতীয় একদিনের ম্যাচে ভারতের অধিনায়ক শুভমন গিল আবার টসে হারলেন। নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক কোনও দ্বিধা প্রকাশ করেননি এখানকার উইকেট দেখে ফিল্ডিং নেওয়ার। বুধবার খেলার শুরু থেকেই ভারতের দুই ওপেনার রোহিত শর্মা ও শুভমন গিল ঝোড়ো ব্যাটিং শুরু করেন। তাই অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো ভারত আবার ৩০০ রানে পৌঁছে যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট ওভারে ভারতের ইনিংস শেষ হল ৭ উইকেট হারিয়ে ২৮৪ রানে।
Advertisement
তবে এদিন রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলি সেইভাবে সফল না হলেও উইকেটরক্ষক লোকেশ রাহুল দুরন্ত ব্যাট করলেন। তিনি ছয় মেরে শতরান করার কৃতিত্ব দেখান। যখন ভারতীয় দলের অবস্থা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখন নিউজিল্যান্ডের বোলারদের বিরুদ্ধে লড়াই করে লোকেশের সাহসী ভূমিকা দেখা গেল এবং শেষ পর্যন্ত তিনি ১১২ রানে নটআউট থাকলেন। আর সেই কারণেই লোকেশের ব্যাটে ভর করে ভারতীয় দল সম্মানজনক রান উপহার দিতে পেরেছে। রাহুল ৯২ বলে ১১২ রান করেন। তার মধ্যে ১১টি চার ছিল। আর তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে শতরান করার সময় প্রথম ছক্কাটি। অবশ্য তারপরে তাঁর ব্যাট থেকে আর ছক্কা আসেনি। শতরান করার পরেই হেলমেট খুলে লোকেশ রাহুল এক হাতে ব্যাটটি তুলে অন্য হাতে উড়ন্ত চুম্বন ছুঁড়ে দেন দর্শকদের উদ্দেশ্যে।
Advertisement
ভারত ব্যাট করতে নেমে ১০ ওভারে কোনও উইকেট না হারিয়ে ৫৭ রান করে। তখন ক্রিজে দাঁড়িয়ে ছিলেন রোহিত শর্মা ২১ ও শুভমন গিল ৩১ রান করেন। যখন রোহিত হাতখুলে মারতে গেলেন, তখনই নিজের উইকেটটি উপহার দিয়ে চলে গেলেন প্যাভিলিয়নে। একটা বড় শট মারতে গিয়ে ২৪ রানে তিনি আউট হয়ে যান। ভারতের স্কোরবোর্ডে তখন ৭০ রান। ক্রিস ক্লার্কের বলে তিনি ক্যাচ তুলে দেন উইল ইয়ংয়ের হাতে। মাঠে আসেন দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে বিরাট কোহলি। স্বাভাবিকভাবেই সবাই আশায় ছিলেন বিরাট কোহলির কাছ থেকে বড় রান দেখতে পাওয়া যাবে। অধিনায়ক শুভমন গিল ৪৬ বলে ৫০ রান পূরণ করেন। ভারতের অধিনায়কের শট বলের দুর্বলতা এখনও কেটে যায়নি। শুভমন ৫৬ রান করে কাইল জেমিসনের বলে ক্যাচ তুলে দেন ডারি মিচেলের হাতে। গিল ৫৩টি বল খেলেন। অর্ধশতরানের মধ্যে ন’টি চার ও একটি ছক্কা রয়েছে। তৃতীয় উইকেট জুটিতে কোহলির সঙ্গে জুটি বেঁধে খেলেন শ্রেয়স আইয়ার। এদিন যদি শ্রেয়সের ব্যাট থেকে ৩৬ রান আসত, তাহলে তিনি দ্রুততম ৩০০০ রান করার কৃতিত্বে বিরাট কোহলিকে টপকে যেতেন। কিন্তু শ্রেয়স আট রানে প্যাভিলিয়নের দিকে পা বাড়ান। এই উইকেটটি নিয়েছেন ক্লার্ক। এবার ব্যাট করতে আসেন কোহিলকে সঙ্গী করে লোকেশ রাহুল।
বিরাট ভালোই খেলছিলেন। কিন্তু ক্লার্কের বলের বাউন্স বুঝতে না পেরে ২৩ রানের মাথায় তিনি আউট হয়ে যান। কোহলি সরাসরি বোল্ড আউট হন। এরপরেই লোকেশ রাহুল ও রবীন্দ্র জাদেজা নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে রান করছিলেন। এমনকি ধীরে ধীরে তাঁরা অর্ধশতরানের জুটি করেন। শেষ পর্যন্ত ব্রেসওয়েলের বলে জাদেজা তাঁরই হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হন। তিনি করেন ২৭ রান। ভারতকে পঞ্চম উইকেট হারাতে হয় ১৯১ রানে। রাহুল অর্ধশতরান করে ভারতের স্কোরবোর্ডকে ২০০ রানে পৌঁছে দেন। রাহুলের সঙ্গে নীতীশ রেড্ডি শুরুটা ভালই করেছিলেন। কিন্তু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ফোকসের বলে ফিলিপসের হাতে ক্যাচ দেন। তিনি করেন ২০ রান।
লোকেশ রাহুল শতরানের দিকে যখন এগিয়ে চলেছেন, তখন প্রতিপক্ষ দলের বোলাররা আক্রমণের ধার বাড়াতে চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু অবিচল লোকেশ রাহুল তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ব্যাট করে শতরানে পৌঁছে যান। অবশ্য তার আগে হর্ষিত রানা খেলতে এলেও, মাত্র ২ রান করে মাঠের বাইরে চলে যান। সেই মুহূর্তে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করেন অধিনায়ক শুভমন গিল। মাঠে আসেন মহম্মদ সিরাজ। সিরাজ ও লোকেশ রাহুল অত্যন্ত বুদ্ধি সহকারে ব্যাট করতে থাকেন। লোকেশ কোনওরকম দ্বিধা প্রকাশ না করেই ১০০ রান করার লক্ষ্যে এগিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত লোকেশ রাহুল ১১২ ও মহম্মদ সিরাজ ২ রানে নটআউট থেকে ভারতের ইনিংস শেষ করেন ২৮৪ রানে।
নিউজিল্যান্ডের ক্লার্ক ৫৬ রান দিয়ে তিনটি উইকেট পেয়েছেন। লোকেশের খেলা দেখে এদিন সবাই বাহবা দিয়েছেন। আসলে যখন ভারতীয় শিবিরে চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক সেই সময় লোকেশের ব্যাট খেলার চেহারা বদলে দেয়। নিউজিল্যান্ডকে ২৮৫ রানে টার্গেট দিয়ে ভারতীয় দল মাঠ ছাড়ে।
নিউজিল্যান্ড খেলতে নেমেই আক্রমণাত্মক ভূমিকা নেয়। দুই ওপেনার ডি কনওয়ে ও এইচ নিকোলস খুব তাড়াতাড়িই আউট হয়ে যান। কনওয়ের ব্যাট থেকে আসে ১৬ রান এবং নিকোলসের ব্যাট থেকে এসেছে ১০ রান। কিন্তু তারপরেই দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে উইল ইয়ং ও ডি মিচেল শক্ত হাতে ব্যাট করতে থাকেন। এই দুই ব্যাটসম্যান ভারতের বোলারদের বেশ চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলেন। তাঁরা যেভাবে উইকেটে দাঁড়িয়ে ব্যাট করছিলেন, তাতে দর্শকরা ভেবেই রেখেছিলেন, তাঁদের জয়ের পথ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভারতীয় বোলাররা ভীত না হয়ে দুরন্ত ভূমিকা পালন করেন। কুলদীপ যাদবের বলে উইল ইয়ং ৮৭ রান করে আউট হয়ে যান। তিনি ৯৮টি বল খেলেছেন। সাতটি চার মারলেও কোনও ছক্কা আসেনি তাঁর ব্যাট থেকে।
প্রথম দু’টি উইকেট নেন ভারতের হর্ষিত রানা ও প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ। তারপরেই অধিনায়ক শুভমন গিল বোলার পরিবর্তন করে কুলদীপের হাতে বল তুলে দেন। কুলদীপের বলে একটি বাউন্ডারি মারতে গিয়ে ইয়ং বল তুলে দেন নীতীশ রেড্ডির হাতে। চতুর্থ উইকেট জুটিতে মিচেলের সঙ্গে জুটি বাঁধেন ডি ফিলিপ। তারই মধ্যে মিচেল শতরান করে নিউজিল্যান্ডকে ভালো জায়গায় পৌঁছে দিয়ে যান। মিচেল ও ফিলিপ ইংল্যান্ডের স্কোরবোর্ডকে সমৃদ্ধ করেন। নিউজিল্যান্ডের জয়ের পিছনে প্রধান কারিগর ছিলেন মিচেল ও ইয়ং। মিচেল ১৩১ রানে নটআউট থাকেন। তাঁর সঙ্গী ফিলিপসও ৩২ রানে অপরাজিত থাকেন। ভারতের ২৮৪ রানের জবাবে ৩ উইকেট হারিয়ে জয়ের প্রয়োজনীয় রান তুলে নেয়। নিউজিল্যান্ড ৪৭.৩ ওভারে
২৮৬ রান করে।
Advertisement



