ভোটার তালিকা থেকে বৈধ নাম বাদ দেওয়ার পিছনে সুপরিকল্পিত ও সর্বভারতীয় চক্রান্ত চলছে—এই অভিযোগ তুলে বুধবার দুপুরে কলকাতার তৃণমূল ভবনে তীব্র ভাষায় বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ করল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। সাংবাদিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং তৃণমূল সাংসদ পার্থ ভৌমিক।
সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ না করে বিজেপির নির্দেশে চলেছে। তাঁর কথায়, “নির্বাচন মানে গণতন্ত্রের উৎসব। কিন্তু বাংলার মাটিতে সেই উৎসবকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সংবিধানকে পদদলিত করে নাগরিকদের হয়রানির মুখে ফেলতে আর কত রকমের পথ বেছে নেবে বিজেপি ও তাদের ইশারায় চলা নির্বাচন কমিশন?”
তৃণমূলের অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বাঁকুড়ার খাতড়া ব্লকের একটি ঘটনা। চন্দ্রিমা জানান, রানিবাঁধ বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত খাতড়া ব্লকে একটি গাড়ি আটক করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ আগে থেকেই পূরণ করা ‘অবজেকশন ফর্ম’ বা ফর্ম–৭ পাওয়া গেছে। এই ফর্মগুলিতে ভোটারদের নাম ও যাবতীয় তথ্য আগে থেকেই নথিভুক্ত ছিল। আশ্চর্যের বিষয়, এই ফর্মগুলির সিংহভাগই তালডাংরা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটারদের নাম সংক্রান্ত। তাঁর দাবি, “এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পুরো জেলা জুড়ে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য এটি একটি সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত অভিযান।”
তিনি আরও জানান, গাড়িটি আটক করার সময় তার মধ্যে পাঁচজন বিজেপি কর্মী ছিল। এর মধ্যে দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তিনজন পালিয়ে যায়। তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। চন্দ্রিমার কথায়, “যারা জনসমর্থন নিয়ে জিততে পারে না, তারা ভোট চুরি করে। জাল ফর্ম পূরণ করে, গণহারে ভোটারদের নাম কেটে দিয়ে নির্বাচন জেতার চেষ্টা করছে বিজেপি।”
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য স্পষ্টভাবে প্রশ্ন তোলেন, এই হাজার হাজার ফর্মে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য এল কোথা থেকে? কে তাদের এই তথ্য দিল? কীভাবে তারা ভোটার ডেটাবেসে প্রবেশাধিকার পেল? তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন—বিজেপির কাছে বাদ দেওয়া ভোটারদের গোপন তালিকা আছে—এই ঘটনা তারই প্রমাণ। যোগসাজশকারী কিছু আধিকারিকের সহায়তায় নির্দিষ্ট ভোটারদের চিহ্নিত করে পদ্ধতিগতভাবে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তৃণমূলের।
সংবাদমাধ্যমের সামনে পার্থ ভৌমিক বলেন, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব নির্দেশিকাই বিজেপি প্রকাশ্যে লঙ্ঘন করছে। কমিশনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, একজন বুথ লেভেল এজেন্ট খসড়া তালিকা প্রকাশের আগে দিনে সর্বাধিক ৫০টি এবং খসড়া প্রকাশের পরে দিনে সর্বাধিক ১০টি ফর্ম জমা দিতে পারেন। অথচ বিজেপির নেতা-কর্মীরা অফিসে চড়াও হয়ে একসঙ্গে হাজার হাজার ফর্ম জমা নিতে চাপ দিচ্ছেন। “গাড়ি বোঝাই করে ফর্ম এনে বাল্কে জমা দেওয়া হচ্ছে। খাতড়ার ঘটনা প্রমাণ করে, এটি বাস্তব, সংগঠিত এবং একাধিক জেলা জুড়ে সক্রিয় একটি চক্রান্ত,” বলেন পার্থ।
তৃণমূলের দাবি, এই জালিয়াতি শুধু বাঁকুড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। মালদার ইংরেজবাজার, বাঁকুড়ার রানিবাঁধ ও তালডাংরা, পূর্ব মেদিনীপুরের ময়না ও তমলুক, হুগলির চুঁচুড়া ও চন্দননগর, উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুর এবং কলকাতার জোড়াসাঁকো থেকেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। এমনকি এই জাল ফর্ম জমা দেওয়ার জন্য বিহার ও ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্য থেকে লোক আনা হয়েছে বলেও দাবি তৃণমূলের।
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের অভিযোগ, বিজেপির লক্ষ্য ছিল গণহারে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং পরে ওড়িশা, বিহার ও ঝাড়খণ্ড থেকে জাল ভোটার এনে নির্বাচন প্রভাবিত করা। “খাতড়ায় তারা হাতেনাতে ধরা পড়েছে। তবে যে গাড়িটি ধরা পড়েছে, তা রাজ্য জুড়ে সক্রিয় একটি বিশাল মেশিনারির মাত্র ছোট অংশ,” বলেন তিনি। বিশেষ করে মহিলা ভোটারদের নাম টার্গেট করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে তিনি স্পষ্ট বলেন, “মহিলাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে কাটার সাহস কারও নেই।”
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন পার্থ ভৌমিক। তাঁর বক্তব্য, “নির্দেশ যেন হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে আসছে। নিয়ম প্রতিদিন বদলাচ্ছে। মাইক্রো–অবজারভার রয়েছে শুধু বাংলাতেই। তারা কার্যত বিজেপির এজেন্টের মতো কাজ করছে। বিএলএ-২ প্রতিনিধিদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, অথচ নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।”
তৃণমূলের দাবি অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই বেআইনিভাবে ৫৪ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, ১.৩৬ কোটি ভোটার নোটিসের মুখোমুখি হয়েছেন এবং SIR আতঙ্কে বহু মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে। এর মধ্যেই হাজার হাজার আগে থেকে পূরণ করা ফর্ম-সহ বিজেপি কর্মীদের ধরা পড়া এই জালিয়াতির মাত্রাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বলেন, “বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে কার্যত একটি দলীয় কার্যালয়ে পরিণত করেছে। প্রথমে ম্যাপিং, পরে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’—একটির পর একটি কৌশল নেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হল, অন্য রাজ্যগুলিতেও কি একই নিয়ম প্রয়োগ করা হচ্ছে?” তিনি অভিযোগ করেন, নথি জমা দেওয়ার সময় কোনও রসিদ পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না, যা ভবিষ্যতে বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
সবশেষে তৃণমূল নেতৃত্ব স্পষ্ট ভাষায় জানায়, কোনও প্রকৃত ও বৈধ ভোটারের নাম কাটতে তারা কোনওভাবেই দেবেন না। এই চক্রান্তের নেপথ্যে কারা রয়েছে, কোন কোন আধিকারিক যুক্ত, কে নির্দেশ দিয়েছে এবং কে ভোটারদের তথ্য সরবরাহ করেছে—সবকিছুর পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ ও আপসহীন তদন্তের দাবি জানানো হয়।
চন্দ্রিমা ও পার্থ দু’জনেই বলেন, “এটি শুধু নির্বাচনী জালিয়াতি নয়, এটি সরাসরি গণতন্ত্রের উপর আঘাত। বাংলা সতর্ক, বাংলার পুলিশ সজাগ এবং বাংলার মানুষ সব দেখছে। বিজেপিকে বাংলার গণতন্ত্র চুরি করতে দেওয়া হবে না।”