• facebook
  • twitter
Tuesday, 20 January, 2026

বিচারহীন, জামিনহীন চক্রই কি শাস্তি?

মামদানির এই মন্তব্যে অসন্তুষ্ট ভারত। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলে তাঁকে মামদানির সেই চিঠি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয়।

শোভনলাল চক্রবর্তী

২০২০ সালে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল দিল্লির জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রনেতা উমর খালিদকে। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি জেল খাটছেন। দিল্লি পুলিশের অভিযোগ, ২০২০ সালে দিল্লিতে হিংসার ঘটনায় অন্যতম প্রধান ষড়যন্ত্রকারী উমর। তাঁর সঙ্গে জেলে রয়েছেন আর এক প্রাক্তন ছাত্রনেতা শারজিল। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে তাঁদের জামিনের মামলার শুনানি ছিল। মোট সাত অভিযুক্তের মধ্যে পাঁচ জনের জামিন মঞ্জুর করেছে শীর্ষ আদালত। উমর এবং শারজিল জামিন পাননি। আদালত জানিয়েছে, অন্তত এক বছর পর তাঁরা ফের জামিনের জন্য আবেদন করতে পারবেন। এই মামলার সুরক্ষিত কয়েক জন সাক্ষীর জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব এখনও বাকি। এক বছরের আগে সেই জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন হয়ে গেলে আগেই জামিনের নতুন আবেদন করা যাবে। গত ডিসেম্বরে আমেরিকায় গিয়ে নিউ ইয়র্কের ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গে দেখা করেছিলেন উমরের বাবা-মা। সেই সময় উমরের প্রতি সমর্থন জানিয়ে নিজের হাতে একটি সংক্ষিপ্ত চিঠি লিখেছিলেন মামদানি। নিউ ইয়র্কের মেয়রের হাতে লেখা সেই চিঠি প্রকাশ্যে আসে কিছু দিন আগে। সুপ্রিম কোর্টে যেদিন উমরদের জামিনের মামলার শুনানি ছিল, তার আগে ওই চিঠি সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন উমরের বান্ধবী বনজ্যোৎস্না লাহিড়ি। তার পরেই শুরু হয় বিতর্ক। উমরকে কী লিখেছিলেন মামদানি? চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘প্রিয় উমর, তিক্ততা সম্বন্ধে তুমি যা যা বলতে, সেগুলো আমার প্রায়ই মনে পড়ে। তুমি বলতে, তিক্ততা যেন কখনও নিজের সত্তাকে গ্রাস করে না ফেলে, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে ভাল লেগেছে। আমরা সকলে তোমার কথা ভাবছি।’

Advertisement

মামদানির এই মন্তব্যে অসন্তুষ্ট ভারত। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলে তাঁকে মামদানির সেই চিঠি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয়। ওই মুখপাত্র মামদানির নাম উচ্চারণ করেননি। তবে তিনি বলেন, আমরা আশা করি, জনপ্রতিনিধিরা অন্য দেশের গণতন্ত্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন। যাঁরা নির্দিষ্ট কোনও পদে রয়েছেন, ব্যক্তিগত পক্ষপাত প্রকাশ করা তাঁদের শোভা পায় না। এই ধরনের মন্তব্য না করে তাঁদের উচিত নিজেদের দায়িত্বগুলি পালনে মনোনিবেশ করা। অর্থাৎ ভারত, বাংলাদেশ বা পাকিস্তা​নের ব্যাপারে নাক গলাবে, কিন্তু ভারতের ব্যাপারে কেউ নাক গলাবে না, চমৎকার। ২০২০ সালের দিল্লির সাম্প্রদায়িক হিংসায় চক্রান্তের অভিযোগে উমর ও শরজিলের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া বাকি অভিযুক্তরা বিবিধ সময়ে জামিন পেয়েছেন; এই দফাতেও জামিন পেলেন পাঁচজন। শীর্ষ আদালতের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা বজায় রেখেও কিছু প্রশ্ন তোলা ভারতীয় গণতন্ত্রের কর্তব্য। যে মামলায় বাকিরা জামিন পেতে পারেন, সেখানে এই দু’জনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তের পিছনে যে কারণ রয়েছে, তা ভারতীয় বিচারব্যবস্থার উদার দার্শনিক অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি? বিশেষত, পাঁচ বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এই মামলায় চূড়ান্ত বিচারের ধারেকাছে পৌঁছনো যায়নি— ফলে, এই দীর্ঘ সময় তাঁরা কারাবন্দি রয়েছেন নিছক অভিযোগের ভিত্তিতে। শেষ বিচারে যদি তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তা হলে এই বন্দিত্ব তাঁদের অহেতুক শাস্তি হবে। প্রশ্নটি উঠছে, কারণ গত এক দশকে ইউএপিএ বা দেশদ্রোহ আইনের প্রয়োগ বেড়েছে প্রবলভাবে। এক গবেষণাপত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০১০-১৪-কে ভিত্তি ধরলে ২০১৪ থেকে ২০২০ অবধি প্রতি বছর ইউএপিএ-র অধীনে মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮%। কিন্তু, ২০১৯-২০২৩-এর মধ্যে ইউএপিএ-র অধীনে গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তদের মাত্র ৩.২% দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ৯৭ শতাংশ অভিযুক্ত হয় বেকসুর খালাস পেয়েছেন, বা বিচারপ্রক্রিয়া শুরুই হয়নি। উমর-শারজিলের জামিনের আবেদনকে কি এই পরিপ্রেক্ষিতে দেখা বিধেয় ছিল না? মনে রাখা প্রয়োজন যে, কোনও মামলায় কাউকে জামিন দেওয়া মানেই তাঁকে নিরপরাধ ঘোষণা করা নয়।

Advertisement

সুস্থ ও ন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়ার শেষে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই তাঁর শাস্তি হবে। কিন্তু সেই বিচারের অপেক্ষায় কাউকে অনন্তকাল বন্দি না-রেখে তাঁকে জামিন দিলে সংবিধানের মূলগত অবস্থানটির প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়— অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে সাজা দেওয়া চলে না। আশা করা যায়, উমর-শারজিলের ক্ষেত্রেও এই নীতি অনুসৃত হবে। আইনবিভাগ ও শাসনবিভাগ যখন ক্রমে আরও অগণতান্ত্রিক হয়ে উঠছে, সেই পরিস্থিতিতে গণতন্ত্র বিচারবিভাগেরই মুখাপেক্ষী। ভারতীয় গণতন্ত্র তা গত দশ বছরের অভিজ্ঞতাতেই জেনেছে— এই জমানায় শাসকরা ইউএপিএ বা দেশদ্রোহ আইনের মতো দমনমূলক আইনকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কাজে ব্যবহার করেছেন।

এই অবস্থায় বিচারপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব যদি জামিনের আবেদন খারিজ করার কারণ হিসাবে বিবেচিত হয়, তা এক ভয়ঙ্কর ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। কোনও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তদন্ত করা, তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা ইত্যাদি ভার পুলিশ বা এনআইএ-সিবিআই-ইডির মতো সংস্থার হাতে। ‘খাঁচার তোতা’ এখন কতখানি বশ মেনেছে, তা নিয়ে সংশয়ের কোনও অবকাশই নেই। ফলে, সে সব সংস্থা কত দ্রুত বা কত শিথিলভাবে তদন্ত করবে, তার উপরে শাসকের রাজনৈতিক প্রভাব গভীর। শ্লথ গতিতে চলা তদন্ত বা বিচারপ্রক্রিয়া যদি অভিযুক্তের জামিন খারিজের যথেষ্ট কারণ হিসাবে বিবেচিত হয়, তা হলে তা কেন্দ্রীয় শাসকদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার মোক্ষম অস্ত্র হয়ে উঠবে কি না, গণতন্ত্রের স্বার্থেই সে কথা ভেবে দেখা প্রয়োজন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে ভারতীয় কারাগারগুলিতে প্রতি চার জন বন্দির মধ্যে তিন জনই বিচারাধীন ছিলেন— পরবর্তী তিন বছরে পরিস্থিতিটি পাল্টেছে, তেমন আশা করা কঠিন। অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই দীর্ঘ কারাবাসের বাধ্যবাধকতা নাগরিকের মানবাধিকার লঙ্ঘন কি না, শীর্ষ আদালতের কাছে সে প্রশ্ন করা বিধেয়। উমর ও তাঁর সঙ্গীরা কেন এই মুহূর্তেই জামিন পাওয়ার যোগ্য, বিচারহীন অবস্থায় কারাগারে তাঁদের অর্ধদশক কাটিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সে উত্তরটি নিহিত।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনও নাগরিককে এভাবে বিনা বিচারে রুদ্ধ করে রাখা চলে না, তা তাঁর ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’র লঙ্ঘন, সর্বোপরি ভারতের সংবিধানের প্রাণভোমরা ‘আর্টিকল ১৯’-এ বর্ণিত নাগরিকের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। এই সব কথাই অগণিত বার বলা হয়েছে— মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার ও আইনের আলোচনায়, নানা পত্র পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে, এমনকি সমাজমাধ্যমেও। তবু কার্যক্ষেত্রে কিছুই হয় না— উমর খালিদদের একের পর এক জামিনের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েই চলে, বেড়ে চলে বিচারহীন বন্দিদশাও— এ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের। আরও হতাশাজনক: ঠিক কী কারণে এই জামিনের আবেদন নাকচ করা হচ্ছে, আদালতের তরফে তার স্পষ্ট ও বোধগম্য ব্যাখ্যার অভাব, এমনকি তার চেষ্টাটুকুরও অভাব।
সরকারপক্ষ উমরদের বিরুদ্ধে প্রমাণস্বরূপ যা যা পেশ করেছে, সেগুলির গ্রহণযোগ্যতা ও যৌক্তিকতাই শুধু আদালতের বিচার্য হওয়া উচিত, সরকারপক্ষের বয়ানে থাকা ফাঁক কি আদালত নিজ উদ্যোগে পূরণ করতে পারে? ২০২০ সালে দিল্লি দাঙ্গার প্রেক্ষিতে জনসভায় উমর খালিদের ‘ইনকিলাবি সালাম’-এর মতো শব্দবন্ধ আদালতের মতে অপরাধমূলক, কারণ যতক্ষণ না স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হচ্ছে যে এই ‘ইনকিলাব’ রক্তপাতহীন, ততক্ষণ তার মানে দাঁড়ায়, এ আসলে হিংসার ইন্ধন। অথচ, ওই একই বক্তৃতায় বক্তার একাধিক বার শান্তিপূর্ণ, অহিংস প্রতিবাদের আহ্বানও ছিল, যে বিষয়টি পাত্তা পায়নি।

উমর খালিদ ও শারজিল ইমামকে বলা হয়েছে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘সামগ্রিক ষড়যন্ত্রের বৌদ্ধিক স্থপতি’ (ইন্টেলেকচুয়াল আর্কিটেক্টস), কিন্তু কাকে বলে বৌদ্ধিক স্থপতি, আইনের চোখে তার সংজ্ঞা কী, তার কোনও ব্যাখ্যা নেই। উমর খালিদরা তো কারারুদ্ধ, যে বিপুল নাগরিকেরা বাইরে, তাঁরাও কি তা হলে রাষ্ট্রের চোখে যে কোনও সময় ষড়যন্ত্রের বৌদ্ধিক স্থপতি হিসাবে কারারুদ্ধ হতে পারেন? তার পর সেই একই চক্রটি ঘুরবে— জামিনহীন, বিচারহীন?

Advertisement