• facebook
  • twitter
Tuesday, 20 January, 2026

খেলাধুলাতেও এখন সাম্প্রদায়িক রাজনীতি

বিসিসিআই আইপিএল-এর এক ফ্র্যাঞ্চাইজি কেকেআরকে বলল, মুস্তাফিজ়ুর রহমানকে ছেড়ে দিতে। কেকেআর টুঁ শব্দটি না-করে নির্দেশ পালন করল।

প্রতীকী চিত্র

শোভনলাল চক্রবর্তী

বাংলাদেশ সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করলেন সে দেশের ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সভাপতি। সেখানে ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না আসার ব্যাপারে অনড় অবস্থান বজায় রাখল বাংলাদেশ সরকার। সে দেশের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা জানালেন, ভারতে খেলতে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। তাই বিকল্প হিসাবে শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ খেলতে চেয়ে দ্বিতীয় চিঠি পাঠানো হবে আইসিসিকে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের বক্তব্য স্পষ্ট, তাঁরা জানাচ্ছেন যে ভারতে নিরাপদে খেলার মতো পরিস্থিতি নেই। বাংলাদেশের মর্যাদার প্রশ্নে তাঁরা কোনও রকম আপস করবেন না। তাই তাঁরা অপর আয়োজক দেশ শ্রীলঙ্কায় খেলতে চান। তাঁরা দেশের মর্যাদার বিনিময়ে বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলতে চান না।

Advertisement

আইসিসি-র থেকে যে বাংলাদেশ বোর্ড চিঠি পেয়েছে, সে কথা স্বীকার করে নিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের আক্ষেপ নিরাপত্তা নিয়ে আগামী দু’দিনের মধ্যেই আইসিসি-কে চিঠি দেবে বাংলাদেশ। তাঁদের আশা তাঁরা আইসিসি-কে বোঝাতে পারবেন এবং আইসিসি তাঁদের যুক্তিগুলো নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ করে দেবে। বাংলাদেশ বোর্ডের প্রাথমিক দায়িত্ব খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ ছাড়াও সাংবাদিক, স্পনসর এবং হাজারও সমর্থক রয়েছেন। বিদেশ সফরের জন্য যেহেতু সরকারি নির্দেশ দরকার, তাই তাঁরা সরকারের দিক্‌নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন। ভারতে এলে শুধু এক-দু’জন ক্রিকেটার নন, জাতীয় দল, সমর্থক, সাংবাদিক সকলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। যখন মুস্তাফিজের মতো একজন আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং তাঁকে বাদ দিতে হয়, তখন পুরো বাংলাদেশের সমর্থকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়াটা স্বাভাবিক এবং অত্যন্ত যৌক্তিক একটা প্রশ্ন। তিনি আরও বলেছেন, ‘আমরা বাস্তব ও যৌক্তিক বিষয় নিয়েই কথা বলছি। বাংলাদেশ যে কোনও অবস্থাতেই লিটন দাসদের বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে পাঠাবে না, তা একরকম পরিষ্কার করে দিয়েছেন তাঁরা। প্রয়োজনে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কট করার পথে হাঁটতে পারে। বিশ্বকাপের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া না হলে বাংলাদেশের পক্ষে বর্তমান পরিস্থিতিতে খেলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সে দেশের বোর্ড কর্তা। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ভারতে চারটি ম্যাচ খেলার কথা বাংলাদেশের। তিনটি ম্যাচ কলকাতায় এবং একটি ম্যাচ মুম্বইয়ে। কলকাতা বা মুম্বইয়ে যে বাংলাদেশের খেলোয়াড় আর দর্শকদের হেনস্থা হতে হবে, সেটা আজ একটা বাচ্চা ছেলেও জানে।

Advertisement

বাংলাদেশি খেলোয়াড় মুস্তাফিজ়ুর রহমানের আইপিএল-এ খেলা নিয়ে যে কুনাট্য অভিনীত হল, প্রকৃতপক্ষে তা রাজনীতির সর্বগ্রাসেরই এক মোক্ষম উদাহরণ। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে কূটনৈতিক অস্থিরতা চলছে, তাকে পর্যবসিত করা হল দেশপ্রেমের প্রশ্নে। গত বছর থেকেই বাংলাদেশে ভারত-বিদ্বেষী সুর ক্রমাগত চড়ছে, কিন্তু ভারতের ক্রিকেট-সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ হয়তো তা নয়। প্রধান কারণ হল, বাংলাদেশে এখন হিন্দু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিপন্নতা আগের থেকে অনেক বেশি বাড়ছে, প্রকাশ্য হচ্ছে। যে যে ঘটনা সেখানে ঘটছে, তা সত্যিই ভয়ঙ্কর। প্রতিবেশী দেশের সমাজে যদি এমন ঘটনা ঘটে, তবে তার প্রকাশ্য নিন্দা এবং প্রয়োজনে অন্য কোনও পদক্ষেপ করাই উচিত। কিন্তু সেই পদক্ষেপ হওয়া উচিত, আন্তর্জাতিক কূটনীতির স্তরে। অথচ দেখা গেল, এই প্রশ্নে উগ্র দেশপ্রেম জাগানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সংশয় হয়, হিন্দু রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বরকে এখন জাতীয় সুর হিসাবে বিবেচনা করে সমাজে ও ঘরোয়া রাজনীতিতে তাকে কেন্দ্র করে তুফান তোলার উদ্দেশ্যেই ভারতের মুস্তাফিজ়ুর সিদ্ধান্ত। এর উত্তরে, বাংলাদেশ যে ভঙ্গিতে টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতে খেলতে না-আসার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে, তা-ও একই রকম বিদ্বেষপ্রসূত। প্রশ্ন হল, ভারত যদি বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তানের মতোই হতে চায়, তবে তাদের সমালোচনা করে কোন যুক্তিতে? ক্রিকেটের উপরে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ‘দেশপ্রেম’-এর গুরুভার। খেলার শেষে পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত না-মেলানোর মতো অসৌজন্যে তার প্রকাশ। বাংলাদেশের খেলোয়াড়কে আইপিএল থেকে বাদ দিতে বলা আর একটি। ‘খেলোয়াড়ি মনোবৃত্তি’ নামক কথাটি এখন অতীত— ফলে, যে দ্বন্দ্বের সমাধান হওয়ার কথা কূটনীতির পরিসরে, প্রয়োজনে বহুজাতিক মধ্যস্থতার সাহায্যে, সেই ‘যুদ্ধ’ এখন ক্রিকেট মাঠেও ঢুকে পড়েছে। কেন ক্রিকেট বা বলিউডের সিনেমা এমন উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রদর্শনী হয়ে উঠল, সে কারণটি বোঝা কঠিন নয়— এই দু’টি মাধ্যমকে ব্যবহার করতে পারলে সবচেয়ে সহজে সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় বিদ্বেষের বার্তা। দুর্ভাগ্যজনক, বহু অভিনেতা এবং নির্দেশক বা খেলোয়াড়ই এই বিদ্বেষের স্বেচ্ছা-বাহক। নিজেদের পেশায় তাঁরা যে জনপ্রিয়তা ও প্রভাব অর্জন করেছেন, তাকে এই উগ্র জাতীয়তাবাদের সঙ্কীর্ণ স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যবহৃত হতে দিতে তাঁদের আপত্তি নেই, বরং বিশেষ আগ্রহ আছে। রাষ্ট্রীয় মদতপ্রাপ্ত এই বিদ্বেষের রাজনীতি কী ভাবে দখল করে নিচ্ছে বাজারকেও।

আইপিএল তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বিসিসিআই কোনও সাংবিধানিক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়, তা এক ক্রীড়া প্রশাসক সংস্থামাত্র। তার পরিচালিত হওয়ার কথা ক্রিকেটের বাজারের ধর্ম অনুসারে। অবশ্য, সে সংস্থা কী ভাবে চলে, তা নিয়ে সংশয়ের কোনও অবকাশ নেই। বিসিসিআই আইপিএল-এর এক ফ্র্যাঞ্চাইজি কেকেআরকে বলল, মুস্তাফিজ়ুর রহমানকে ছেড়ে দিতে। কেকেআর টুঁ শব্দটি না-করে নির্দেশ পালন করল। খেলোয়াড় হিসাবে মুস্তাফিজ়ুরের মূল্য কতখানি, সে প্রশ্ন বিবেচনায় আসেনি বলেই অনুমান করা যায়। তাঁরা এই সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করল না, তার একটি কারণ রাজনৈতিক চাপ; কিন্তু অন্য কারণ বাজার। রাজনৈতিক বিদ্বেষের বার্তা এমন ভাবে দর্শকদের মনে ঠাঁই পেয়েছে যে, বোর্ডের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে মুস্তাফিজ়ুরকে খেলালে তার তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এক রকম অনিবার্য ছিল। সযত্নে রোপণ করা ও লালন করা বিদ্বেষের বিষবৃক্ষ এখন ফলের ভারে নুয়ে পড়ছে। সেই ফল আস্বাদন করাই এখন ভবিতব্য। নোয়াম চোমস্কি বলেছিলেন, হিটলার ষাট লক্ষ ইহুদি নিধন করেছিলেন, তার থেকেও বড় কথা এই যে, সে কালের সাধারণ জার্মানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হিটলারের এই গণহত্যা সঠিক বলে মনে করেছিলেন। এখানেও বক্তব্য একই। অপরের রাজনীতি আমাদের কোন অতলে নিয়ে দাঁড় করায় সেটাই দেখার। হাত মেলান বন্ধ,খেলোয়াড় বাদ,এর পর হয়ত খেলা বন্ধ হবে, তার পর শুরু হবে আমার দল থেকে তুমি বাদ কারণ তোমার ধর্ম আলাদা, এই ভাবেই একদিন একা হবে সবাই।

Advertisement