• facebook
  • twitter
Saturday, 3 January, 2026

বারুইপুর থেকে ‘আবার জিতবে বাংলা’ অভিযানের সূচনা অভিষেকের

এসআইআর তালিকায় ‘মৃত’ দেখানো তিন জনকে মঞ্চে তুলে নির্বাচন কমিশনকে কড়া আক্রমণ 

শুক্রবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের সাগর সংঘ মাঠ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হল তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মসূচি ‘আবার জিতবে বাংলা’। বিপুল জনসমাগমের মধ্যেই এই জনসভা থেকে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সুর বেঁধে দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়া, ভোটার তালিকার অনিয়ম, কেন্দ্রীয় বঞ্চনা থেকে শুরু করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির প্রশাসনিক ব্যর্থতা— একের পর এক ইস্যুতে আক্রমণ শানিয়েছেন তিনি।

সভা শুরুর মুখেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সাম্প্রতিক সময়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ ঘিরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যে মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে, তার জন্য গভীর শোকপ্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, জীবিত মানুষকে মৃত দেখিয়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘জ্যান্ত মানুষকে মৃত বানিয়ে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এটা গণতন্ত্র হত্যার নামান্তর।’

Advertisement

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে অভিষেক জানান, সম্প্রতি তিনি দিল্লিতে কমিশনের দপ্তরে গিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। সেই বৈঠকে এক আধিকারিকের আচরণকে অসম্মানজনক বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দিকে আঙুল তুলে কথা বলা হলে সেটা মেনে নেওয়া যায় না। বাংলার মানুষ কী, সেটা আমরা দিল্লিতে গিয়েই বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি।’ প্রয়োজনে আগামী দিনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই দিল্লিতে যাবেন বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

Advertisement

এসআইআর প্রসঙ্গে এদিনের জনসভায় অভিনব প্রতিবাদে নামেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মঞ্চের সামনে তৈরি বিশেষ র‍্যাম্পে তিনি তিনজনকে ডেকে আনেন— মনিরুল ইসলাম মোল্লা, হরেকৃষ্ণ গিরি এবং মায়া দাস। অভিযোগ, খসড়া ভোটার তালিকায় তাঁদের মৃত হিসেবে দেখানো হয়েছে। তিনজনকে সামনে দাঁড় করিয়ে অভিষেক প্রশ্ন তোলেন, ‘এঁদের কি মৃত বলে মনে হচ্ছে?’ তাঁর কটাক্ষ, ‘কমিশন যাঁদের মৃত বলেছে, আজ সেই ‘ভূত’রাই র‍্যাম্পে হাঁটছে।’ এই ঘটনা প্রমাণ করে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে কী ভয়াবহ অনিয়ম চলছে, তা আজ স্পষ্ট।

কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আর্থিক বঞ্চনার অভিযোগ তুলে অভিষেক বলেন, সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও একশো দিনের কাজের প্রকল্প চালু করা হয়নি, আটকে রয়েছে গরিব মানুষের আবাসের টাকা। অথচ গত সাত বছরে জিএসটি ও আয়কর বাবদ বাংলা থেকে প্রায় ৬ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে কেন্দ্র। তাঁর প্রশ্ন, ‘এই টাকার ন্যায্য হিস্যা বাংলা পেল কোথায়?’

বক্তৃতায় শুভেন্দু অধিকারী সহ বিজেপি নেতাদের বিভিন্ন মন্তব্যের ভিডিও ও অডিও ক্লিপের উল্লেখ করে বিরোধী শিবিরের দ্বিচারিতার অভিযোগ তোলেন অভিষেক। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বিজেপি নেতাদের অবস্থান নিয়ে তিনি বলেন, ‘যেখানে হিন্দু নির্যাতনের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে আবার সেই সরকারের প্রশংসা— এটাই বিজেপির ভণ্ডামি।’

মধ্যপ্রদেশে দূষিত পানীয় জল পান করে মানুষের মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির প্রশাসনিক ব্যর্থতার দিকেও আঙুল তোলেন তিনি। অভিষেকের বক্তব্য, ‘যারা মানুষকে বিশুদ্ধ জল পর্যন্ত দিতে পারে না, তারা গণতন্ত্র আর অধিকারের কথা বলার নৈতিক অধিকার হারিয়েছে।’ দিল্লির বায়ুদূষণ নিয়েও কেন্দ্রের সমালোচনা করেন তিনি।

সভা থেকে একের পর এক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘বাংলার লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো করে যদি কোনও বিজেপি শাসিত রাজ্যে নিঃশর্তভাবে মহিলাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া যায়, আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব।’ একইসঙ্গে ঘোষণা করেন, ‘বিজেপি যদি একটি বিধানসভা কেন্দ্রে পাঁচ হাজার চাকরি দেওয়ার প্রমাণ দেখাতে পারে, আমিও রাজনীতি ছাড়ব।’

দক্ষিণ ২৪ পরগনায় দলের লক্ষ্য স্পষ্ট করে অভিষেক বলেন, জেলায় একত্রিশটি বিধানসভা আসনের সবক’টিতেই জিততে হবে। প্রতিটি আসনে জয়ের ব্যবধান যেন পঞ্চাশ হাজারের বেশি হয়, সেই নির্দেশ দেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘দক্ষিণ ২৪ পরগনায় একত্রিশে একত্রিশ চাই।’

মহারাষ্ট্রে বাংলায় কথা বলার কারণে গ্রেপ্তার ও হেনস্থার প্রসঙ্গ তুলে অভিষেক অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট বিজেপি সাংসদরা পাশে দাঁড়াননি। তৃণমূল কংগ্রেসই আইনি লড়াই করে ওই ব্যক্তিদের বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা করেছে বলে জানান তিনি। তাঁর কটাক্ষ, ‘যে দল নিজের বুথ সভাপতিকেই রক্ষা করতে পারে না, তারা বাংলার মানুষকে রক্ষা করবে কীভাবে?’

এদিন বারুইপুরের হাই ভোল্টেজ এই সভায় উপস্থিত ছিলেন বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, মন্ত্রী বঙ্কিম হাজরা ও দিলীপ মণ্ডল, সাংসদ বাপি হালদার ও প্রতিমা মণ্ডল, বর্ষীয়ান বিধায়ক অশোক দেব-সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক নেতা ও জনপ্রতিনিধি। যুব তৃণমূল সভানেত্রী সায়নী ঘোষও মঞ্চ থেকে বিজেপি ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানান।

সভা শেষে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেস লোহার মতো। যত আঘাত করবেন, দল তত শক্ত হবে।’ তাঁর মতে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন হবে বিজেপিকে শিক্ষা দেওয়ার নির্বাচন। বারুইপুরের এই জনসভা দিয়ে ‘আবার জিতবে বাংলা’ অভিযানের সূচনা করে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন— এসআইআর থেকে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা, প্রতিটি প্রশ্নেই তৃণমূল রাজপথে লড়াই চালিয়ে যাবে।

Advertisement