• facebook
  • twitter
Sunday, 1 February, 2026

রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩০ শেষ হলো কোনও কার্যকরী সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা ছাড়াই

দুই সপ্তাহের আলোচনার পর ব্রাজিলের বেলেমে কপ-৩০ আয়োজক দেশের প্রকাশিত নতুন খসড়া চুক্তিতে ‘ফসিল জ্বালানি’ শব্দটির কোনো উল্লেখ ছিল না।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

স্নেহাশিস সুর

শেষ হলো রাষ্ট্রসঙ্ঘের ৩০তম বার্ষিক বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন। ব্রাজিলের আমাজন জঙ্গলের ভেতরে বেলেম শহরে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে দু’সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন আলোচনার পর প্রতিনিধিরা একটা গ্রহণযোগ্য এবং কার্যকরী সমাধানসূত্র দিতে ব্যর্থ হলেন। বিশেষত ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ বা ফসিল ফুয়েল বা জীবাষ্ম থেকে তৈরি শক্তি অর্থাৎ কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ তেল ব্যবহার ক্রমান্বয়ে কমিয়ে কমিয়ে শূন্যে নামানোর কোনও ব্যবহারিক কর্মসূচি এবং সময়সীমা নির্দিষ্ট করতে ব্যর্থ হলেন।

Advertisement

তবে সভাপতি ব্রাজিলের চাপাচাপিতে এবিষয় আলাদা একটি কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে, যা আগামী একবছর ব্রাজিলের সভাপতিত্বে কার্যকরী করার একটা প্রয়াস নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। কপ সভাপতি আন্দ্রে লাগো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বন কেটে ফেলা বন্ধ করার দুটি কর্মসূচি এবং জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের অবসানের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করতে তাঁর ব্যক্তিগত অঙ্গীকারের কথা ঘোষণা করেছেন। ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি এই কপ-এর উদ্বোধনী ভাষণে বলেছিলেন, আমাদের এমন কর্মপরিকল্পনা দরকার যাতে মানবজাতি ন্যায়সঙ্গত এবং পরিকল্পিত উপায়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে বন কাটা বন্ধ ও প্রতিরোধ করতে পারে এবং এই কাজগুলি করার জন্য সম্পদ সংগঠিত করতে পারে।

Advertisement

দুই সপ্তাহের আলোচনার পর ব্রাজিলের বেলেমে কপ-৩০ আয়োজক দেশের প্রকাশিত নতুন খসড়া চুক্তিতে ‘ফসিল জ্বালানি’ শব্দটির কোনো উল্লেখ ছিল না। আলোচনার চূড়ান্ত পর্যায়ে শুক্রবার (২১ নভেম্বর) কিছু দেশ তড়িঘড়ি করে এই জলবায়ু আলোচনাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। কারণ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, তারা চূড়ান্ত চুক্তিতে ফসিল ফুয়েল বা জীবাষ্ম থেকে আসা জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার বিষয়টা উল্লেখ করতে বাধা দিচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু কমিশনার ওপকে হুকস্ট্রা বলেন, এই খসড়াটি ‘অগ্রহণযোগ্য’ এবং সম্মেলনটি কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হতে পারে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলছি, চুক্তির বর্তমান অবস্থায় এটা গ্রহণযোগ্য নয়। ফ্রান্সের পরিবেশগত রূপান্তর মন্ত্রী মনিক বারবুট বলেন, তেলসমৃদ্ধ রাশিয়া ও সৌদি আরব, কয়লাসমৃদ্ধ ভারত এবং কিছু উন্নতিশীল দেশ ফসিল জ্বালানি সম্পর্কিত চুক্তিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকুক তা চায় না। জার্মান পরিবেশ মন্ত্রী কার্সটেন শ্নাইডার বলেন, চুক্তি এভাবে থাকতেই পারে না। কলম্বিয়ার পরিবেশ মন্ত্রী ইরেন ভেলেজ টরেস বলেন, এই ধরনের বিশ্ব সম্মেলন ঐকমত্য ছাড়া শেষ হতে পারে না। এ বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুপস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র সম্মেলনে অংশ নেয়নি।

সারা বিশ্বের ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়ন কমাতে তেল, গ্যাস ও কয়লার পর্যায়ক্রমিক সমাপ্তির চাপ ২০২৩ সালে দুবাইতে অনুষ্ঠিত কপ-২৮ এ আসে। কিন্তু এর বাস্তবায়নের সমস্যা আসতেই থাকে। বিতর্ক শুধু ফসিল জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ নয়, বরং বাণিজ্যিক সংস্থা এবং উন্নতিশীল দেশগুলোতে বন্যা, খরা ইত্যাদির সঙ্গে অভিযোজন বা টিকে থাকার ব্যবস্থা করতে এবং কার্বন ব্যবহার কমাতে যে বিকল্প প্রযুক্তির প্রয়োজন তার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের সমস্যা নিয়েও সদ্য সমাপ্ত কপ-৩০ সম্মেলনে মতপার্থক্য হয়।

আগের খসড়ায় বলা হয়েছিল উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থ সাহায্য অনেকগুণ বাড়ানো দরকার এবং ২০২৫ সালের তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে অভিযোজনের ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ তিনগুণ করার আহ্বান জানানো হয়।

খনিজ জ্বালানি সংক্রান্ত সংস্থা অয়েল চেঞ্জ ইন্টারন্যাশনালের পক্ষে ব্রনওয়েন অর্থ বরাদ্দের সর্বশেষ খসড়াটিকে ‘লজ্জাজনকভাবে দুর্বল’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, খসড়ায় জীবাষ্ম জ্বালানির উল্লেখ নেই, ধনী দেশগুলোর অর্থায়নের বাধ্যবাধকতার জন্য কোনো জবাবদিহির কথা নেই এবং অভিযোজন সম্পর্কে শুধু অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়ছে।

আলোচনার চূড়ান্ত পর্যায়ে শুক্রবার কয়েকটি দেশ তড়িঘড়ি করে এই জলবায়ু আলোচনাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে, কারণ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তারা চূড়ান্ত চুক্তিতে ফসিল জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার উল্লেখ করতে বাধা দিচ্ছে।

৩০টিরও বেশি দেশ— ধনী, উন্নতিশীল, দরিদ্র দেশ এবং ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রসহ – ব্রাজিলকে একটি চিঠিতে সতর্ক করে জানিয়েছিল যে, ফসিল জ্বালানি থেকে সরে যাওয়ার কর্ম পরিকল্পনার সুস্পষ্ট উল্লেখ না থাকলে তারা কোনো চুক্তি মেনে নেবে না।

কপ-৩০ এর চূড়ান্ত ঘোষণাপত্রের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ভারতের পক্ষে বলা হয়েছে ‘জাস্ট ট্রানজিশন মেকানিজম’–ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাকে ভারত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলে বর্ণনা করছে। ভারতের আশা, এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্তরে সমতা ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের বাস্তবায়নকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলিকে ক্রমশ ক্ষতিগ্রস্ত করা একতরফা বাণিজ্যনির্ভর এবং জলবায়ুর ক্ষতিকারক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ভারত সভাপতি ব্রাজিলকে ধন্যবাদ জানিয়েছে।

আরেকটি কপ শেষ হল। এত হইচই করে এত দেশের সরকারি, বেসরকারি প্রতিনিধি শুধু নয়, এত সাংবাদিক ও অসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি নিয়ে, এত খরচ করে প্রতি বছর রাষ্ট্রসঙ্ঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু এই সম্মেলন থেকে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, প্রথম দিকে এই সম্মেলন যত সাহসী এবং কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করত, ক্রমে পরের দিকে উন্নত দেশগুলি টাকা দেওয়া এড়িয়ে চলতে এবং অন্যান্য কিছু দেশ পরিষ্কার করে কিছু প্রকল্প নেওয়া এড়িয়ে চলতে চাওয়ায় গত দুটি কপে না অর্থ বরাদ্দ বা কার্যকরী প্রকল্প গ্রহণ কোনও দিক থেকেই বিশেষ নজরকাড়া কিছু হচ্ছে না। এরকম চলতে থাকলে কপের কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

Advertisement