• facebook
  • twitter
Thursday, 29 January, 2026

কংক্রিটের জঙ্গলের আড়ালে ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চেতলার রাধাকান্ত মন্দির

এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরটি আজও দক্ষিন কলকাতার চেতলার - ১এ, মন্ডল টেম্পেল লেনে ঘন জনবসতিপূর্ণ এবং ঘিঞ্জি এলাকার মাঝে মাথা উঁচু দাড়িয়ে আছে।

ঢাকা পড়েছে চেতলার রাধাকান্ত মন্দির।

সম্বুদ্ধ দত্ত

কলকাতা শহরের মধ্যেই কত যে ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে তার হিসাব রাখা মুশকিল । যেগুলো আজ ধীরে ধীরে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছে। এমনই এক স্থাপত্য হল চেতলার — রাধাকান্ত মন্দির ।

Advertisement

এই মন্দিরের কথা বলতে গেলে অনিবার্য ভাবে চলে আসে বজবজ বাওয়ালির জমিদার মন্ডল পরিবারের কথা ৷ দক্ষিণবঙ্গের সমগ্র বজবজ অঞ্চল একসময় ছিল সুন্দরবনের অংশ। বাওয়ালির অধিবাসীদের পেশা ছিল জঙ্গল থেক মধু এবং কাঠ সংগ্রহ করা। এই অঞ্চলের নাম বাওয়ালি হওয়ার পিছনে বেশ কয়েকটা মত প্রচলিত আছে। তবে সব থেকে জনপ্রিয় মত হলো, জঙ্গল থেকে মধু ও কাঠ সংগ্রহকারী বাউলে নামের এক সম্প্রদায়ের স্থানীয় বাসিন্দাদের নাম অনুসারে এখানকার নাম হয় বাওয়ালি।

Advertisement

জমিদার মন্ডল পরিবারের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে দুটো মত রয়েছে – প্রথমত, মন্ডল পরিবার মূলত ছিলেন উত্তর ভারতের বাসিন্দা। এই পরিবারের সূচনা পুরুষ হিসাবে বাসুদেব রামের নাম প্রথম জানা যায় । বাসুদেব রাম ছিলেন মুঘল দরবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মচারী। বাসুদেব রামের বংশধর শোভা রাম নামের এক ব্যক্তি উত্তরপ্রদেশের সরযূ নদীর তীর ধরে বাংলায় আসেন এবং বসন্তপুর নামক এক গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। তবে সেই সময়ের বসন্তপুর বর্তমানে ঠিক কোন অঞ্চল তা সঠিকভাবে এখন আর বলা সম্ভব নয়। এই বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। কারো মতে মুর্শিদাবাদের স্থলবসন্তপুর, অনেকের মতে নদীয়ায়, আবার অনেকের অভিমত হুগলি জেলায়। দ্বিতীয় মত হলো, শোভারাম ‘বালিয়া পরগনা’র ( বর্তমান উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার মাঝামাঝি একটি অংশ ) জগন্নাথপুরে বসবাস শুরু করেন । বংশ পরম্পরায় রাজ কর্মচারী রূপে কাজ করা শোভা রাম এক সময় হিজলীর পাটোয়ারী নিযুক্ত হন। পাটোয়ারীর ভূমিকায় শোভা রামের কাজের দক্ষতা দেখে হিজলী রাজ তাকে মন্ডল উপাধি প্রদান করেন এবং নিজের নামের সঙ্গে ‘মন্ডল’ উপাধি যুক্ত করে শোভা রাম মন্ডল নাম ব্যবহার করতে থাকেন।

এইসময় সারা বাংলা জুড়ে প্রজাদের মধ্য নানা অসন্তোষের কারণে বিদ্রহ শুরু হয়। শোভা রাম মন্ডলের পৌত্র রাজা রাম মন্ডল এই সময় ধৈর্যসহকারে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সুকৌশলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। রাজা রাম মন্ডলের বুদ্ধিমত্তা এবং প্রশাসনিক দক্ষতায় প্রসন্ন হয়ে হিজলীর রাজা তাকে বজবজ, বাওয়ালি, কালীনগর এবং সাহেবান বাগের অন্তর্গত ১৫টি গ্রামের ‘মোড়লম্বের সনদ’ প্রদান করেন। তবে বাওয়ালির জমিদারির কথা আলোচনা করলে আলাদা ভাবে জমিদার হারাধন মন্ডলের কথা বলা প্রয়োজন। কারণ বাওয়ালির জমিদারির প্রকৃত সূচনা হয়েছিল হারাধন মন্ডলের মাধ্যমে। বাওয়ালির জমিদারির দৃষ্টান্তমূলক উন্নতি হয়েছিল জমিদার হারাধন মন্ডলের সময়। আধ্যাত্মিক চেতনায় পুষ্ট হারাধন মণ্ডল তাঁর জমিদারির শ্রীবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অনেক মন্দির তৈরি করেছিলেন। ( কথিত আছে হারাধন মণ্ডলের জমিদারি এক সময় খিদিরপুর থেকে দক্ষিনে সুন্দরবন এবং সাগর অবদি বিস্তৃত ছিল।

জমিদার হারাধন মন্ডলের আধ্যাত্মিক ধারাকে অক্ষুণ্ণ রেখে বাওয়ালির জমিদারদের মধ্য মন্দির তৈরি একটা প্রথা হয়ে দাঁড়ায়। বাওয়ালির জমিদার বাড়ি সংলগ্ন ‘গুপ্ত বৃন্দাবন — যা আজও সেই সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক এমন ভাবেই বাওয়ালির জমিদার পরিবারের সদস্যদের হাত ধরে আদি গঙ্গার দুই পারে চেতলা রোড এবং টালিগঞ্জ রোডে দর্শনার্থীয় কিছু মন্দির তৈরি হয়েছিল।

ব্রিটিশ সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের থেকে কলকাতা, সুতানুটি এবং গোবিন্দপুরের প্রজাসত্বের অধিকার লাভ করার পর বৃহত্তর কলকাতার আয়তন এবং জনবসতির পরিধি বাড়াতে থাকে। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নানা পেশার মানুষ কলকাতায় বাসতি গড়তে শুরু করে। অন্যদিকে জমিদারি ও ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশদের সঙ্গে বাওয়ালির জমিদারদের সখ্যতা গড়ে ওঠে। এই সখ্যতার সূত্র ধরে বাওয়ালির জমিদার পরিবারের সদস্য রাধানাথ মন্ডল এবং মানিক মন্ডল আদিগঙ্গার দুদিকে চেতলা ও টালিগঞ্জে বসতি গড়ে তোলেন । মন্ডল পরিবারের এখানে বসতি নির্বাচনের অন্যতম কারণ ছিল এই অঞ্চলের মাহাত্ম্য। প্রথমত- হিন্দুদের পূজ্য ও পবিত্র স্রোতস্বিনী আদি গঙ্গার অবস্থান, দ্বিতীয়ত – এই আদি গঙ্গার একেবারে পাশেই হিন্দুদের পূর্ণ ভূমি কালীক্ষেত্র কালীঘাট।

আদি গঙ্গার উভয় তীরে চেতলায় ও টালিগঞ্জে বসতি গড়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্ডল পরিবার তাঁদের পরিবারিক আরাধ্য দেবতা রাধামাধবের মন্দির সহ আরও বেশ কিছু মন্দির গড়ে তোলেন। এই মন্দিরগুলির মধ্য সবথেকে বড় এবং অপরূপ সৌন্দর্য্যের অধিকারি চেতলার রাধাকান্ত মন্দির৷

এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরটি আজও দক্ষিন কলকাতার চেতলার – ১এ, মন্ডল টেম্পেল লেনে ঘন জনবসতিপূর্ণ এবং ঘিঞ্জি এলাকার মাঝে মাথা উঁচু দাড়িয়ে আছে। যা মন্ডল পরিবারের বৈভব ও আধ্যাত্মিকতার নিদর্শনকে প্রকাশ করে।। মন্দির এলাকাটি এতটাই ঘন বসতিপূর্ণ, যে কারণে পূর্ণরূপে মন্দিরটি এখন আর দেখা সম্ভব নয়। এক সময় বহু দূর থেকে এই মন্দিরকে দেখা গেলেও বর্তমানে একের পর এক গজিয়ে ওঠা উঁচু বহুতলের আড়ালে আজকাল মন্দিরটিকে প্রায় নজরেই আসে না।

অপরূপ স্থাপত্যের এই মন্দিরের নাম ‘রাধাকান্ত মন্দির’। ১৭৯৩ সালে রাধানাথ মন্ডল এই মন্দিরটি তৈরি শুরু হয়। মন্দিরটি তৈরী হতে সময় লেগেছিল ১৪ বছর। ৯১ ফুট ( অনেকের মতে ১০০ ফুট থেকে কিছু বেশি) উঁচু বিশাল মন্দিরটি ১৮০৭ সালে পূর্ণ রূপে তৈরি হয়। রাধাকান্ত মন্দিরের একেবারে সামনেই রয়েছে বেশ বড় নাট মন্দির। প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু চাতালের ( প্লাটফর্ম) উপর সমতল ছাদের ১৬ টি গোলাকার সুউচ্চ স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে এই নাটমন্দির। বর্তমানে এই নাটমন্দিরের দেওয়ালের বিভিন্ন অংশে নাটমন্দিরে প্রবেশের এবং ছবি তোলার বিধিনিষেধ আরোপ করে বার্তা দেওয়া হয়েছে। সম্ভবত সংস্কার ও নিরাপত্তার কারনে এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে।

রাধাকান্ত মন্দিরের মূল চাতাল বা প্লাটফর্মে উপর পৌঁছতে দশটি সিঁড়ি অতিক্রম করতে হয়। এই সিঁড়ির সংখ্যা দিয়ে সহজেই অনুমান করা যায় মন্দিরের চাতালের উচ্চতা। মাটি থেকে প্রায় ছ’ফুট উঁচু চাতালের উপরে তৈরি করা হয়েছে এই রাধাকান্ত মন্দির এবং মূল মন্দির গৃহ থেকে এই উঁচু চাতাল চারদিক সম্পুর্ন উন্মুক্ত এবং অনেকটা প্রশস্ত ।

দ্বিতল বিশিষ্ট রাধাকান্ত মন্দিরটি দক্ষিণমূখী । যদিও এই দ্বিতল মন্দিরের প্রতি দিকে দরজা রয়েছে। প্ৰথম তলার চার দিকে অর্থাৎ পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর এবং দক্ষিণে রয়েছে পাঁচটা বড় দরজা। ঠিক একই ভাবে প্রথম তলা থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট দ্বিতীয় তলারও চারদিকে রয়েছে তিনটে দরজা। বিশাল আকারের প্রতিটি দরজার ঠিক উপরে গোলাকার স্টুকোর আলপনার অলঙ্কার মন্দিরটিকে আরও দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে।

রাধাকান্ত মন্দিরটি মূলত উড়িষ্যার রেখা শৈলীর এক অনন্য মন্দির স্থাপত্য। এই মন্দিরে সর্ব মোট ন’টি চুড়া রয়েছে। মন্দিরের প্রথম এবং দ্বিতীয় তলার চার প্রান্তে চারটে রেখা শৈলীর চূড়া দিয়ে সাজানো। একই ভাবে মন্দিরের একেবারে মাঝে রয়েছে মন্দিরের সব থেকে বড় ও উঁচু চূড়াটি । সর্বমোট ন’টি চূড়ার রেখা শৈলীর স্থাপত্য এই রাধাকান্ত মন্দির। প্রত্যেক চূড়ার চার দিকে সমান ভাবে রয়েছে একটা করে দরজা। হিন্দু মন্দির স্থাপত্যে মন্দির চূড়াকে রত্নের মান্যতা ও মর্যাদা দেওয়া হয়। এই কারণে মোট ন’টি চূড়ার সমষ্টি এই মন্দিরকে বলা হয় ‘রাধাকান্ত নবরত্ন’ মন্দির ৷

অসাধারণ দৃষ্টি নন্দন রাধাকান্ত মন্দিরের উপরি ভাগের চারদিকে পর্যায় ক্রমে তিনটে ধনুকের মতো বাধন দেওয়া এবং এই ধনুকের বাধন গুলো সুক্ষ সুক্ষ স্টুকোর কারুকার্যময়। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ধনুকের ঠিক উপরে ছোট ছোট দুটো স্তম্ভের মাথায় প্রতিস্থাপন করা হয়েছে একটা করে গ্লোব। এই গ্লোব যুক্ত স্তম্ভের মাঝের অংশে আরও আকারে ছোট এবং পাতলা স্তম্ভ দিয়ে রেলিং এর আকারে দাঁড় করানো আছে। মন্দিরের পূর্ব দিকের দেওয়ালের গায়ে একটা কালো ছোট ফলকে মন্দির তৈরির তথ্য লেখা আছে। যদিও ফলকটি বাংলা হরফে লেখা তবুও লেখার অর্থ বোঝা মুশকিল। এই নবরত্ন রাধাকান্ত মন্দির এবং রানি রাসমনির তৈরি দক্ষিনেশ্বরের কালী ( ভবতারিণী) মন্দিরের গঠনগত সাদৃশ্য রয়েছে। স্মরণ রাখা প্রয়োজন দক্ষিনেশ্বর মন্দির কিন্তু তৈরি হয়েছিল – ১৮৫৫ সালে। সুতরাং উভয় মন্দিরের স্থাপত্যে সাদৃশ্য থাকলেও চেতলার রাধাকান্ত মন্দির যে দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরের থেকে প্রাচীন তা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়।

রানি রাসমনির পরিবারের সঙ্গে মন্ডল পরিবারের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। এই কারণেই সম্ভবত পারিবারিক ধারার প্রভাবে উভয় মন্দিরের গঠনশৈলীর এমন মিল রয়েছে। বজবজ বাওয়ালির জমিদার বাড়ির পাশের ‘গুপ্ত বৃন্দাবনে’ও মানিক চন্দ্র মন্ডল দ্বারা নির্মিত ঠিক এমনই গঠন শৈলীর ‘গোপীনাথ জীউ’র একটি মন্দির রয়েছে।

রাধাকান্ত মন্দিরের গর্ভগৃহে কষ্ঠি পাথরের রাধামাধব যুগল মূর্তি এবং অষ্ট ধাতুর লক্ষী নারায়নের বিগ্রহ বিরাজ করছে। আজও প্রতিদিন সকাল- সন্ধ্যা নিষ্ঠার সঙ্গে এই বিগ্রহগুলি পুজো করা হয়। এই মন্দিরের পূর্ব দিকে সুসজ্জিত তুলসী মঞ্চটিও বেশ নজর কাড়ে।

কোন এক সময় এখানে মহা ধুমধামের সঙ্গে রাস উৎসব, জন্মাষ্টমী ও ঝুলন যাত্রার মতো উৎসব পালন করা হত । স্থানীয়দের মতে বর্তমানে কেবল জন্মাষ্টমী ধুমধামের সঙ্গে পালন করা হয়। কলকাতা হেরিটেজের প্রথম শ্রেনীর মর্যাদাপ্রাপ্ত এই রাধাকান্ত মন্দিরের প্রবেশ পথের একটি অংশে মন্ডল পরিবার এখনও বসবাস করেছে ।
পরিশেষে বলতে হয় চেতলার রাধাকান্ত মন্দির দেখতে দেখতে মন চলে যায় সুদূরের সন্ধানে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুরনো কলকাতার সঙ্গে মন্ডল পরিবারের এবং রাধাকন্ত মন্দিরের গৌরবময় অতীত।

(কৃতজ্ঞতা, পারিবারিক তথ্য – বাংলার বৃন্দাবন বাওয়ালি – ড. শিশুতোষ সামন্ত। আদিত্য মন্ডল বর্তমান চেতলা মন্ডল পরিবারের সদস্য।)

Advertisement