তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম

Written by SNS May 11, 2024 2:26 pm

হাননান আহসান

২ মে আমাদের সবার প্রিয় লেখক সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন পেরিয়ে গেছে৷ তাঁর জন্মের শতবর্ষ পেরিয়েও তিনি এখনো সমানভাবে জনপ্রিয়৷ আজ তাঁর ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’ অনুবাদের বইটি সম্পর্কে কিছু কথা জেনে নেব৷ আমরা জানি, ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’ আদ্যোপান্ত একটি ননসেন্স ছড়ার বই৷ মুচমুচে আর লোভনীয় এই বইয়ের লেখক সত্যজিৎ রায়৷ মজার ব্যাপার, লুইস ক্যারল, এডওয়ার্ড লিয়র, ভার্মি টমসন ও হিলেয়ার বেলকের কিছু লেখার অনুবাদকর্ম এটি৷
আমরা জানি, সত্যজিৎ রায় মৌলিক গল্পের পাশাপাশি নিজস্ব ঢঙে বেশ কিছু অনুবাদও করেছেন৷ আর ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’ তার-ই এক সোনালি ফসল যা আপামর শিক্ষিত বাঙালি পাঠকের কাছে সাত রাজার ধন এক মানিকের মতো৷ বইটিতে মোট সাতটি অনূদিত ছড়া ও একটি গল্প জায়গা পেয়েছে৷ বিষয়গুলি এইরকম—

পাপাঙ্গুল (The Jumlies অবলম্বনে), ডং (The dong with a luminous nose অবলম্বনে), লিমেরিক, পিপলি বিলের ধারের সাতটি পরিবারের ইতিকথা, জবরখাকি, রামপাগলের গান (A mad Gardener’s song অবলম্বনে), মেছো গান, আদ্যি বুড়োর পদ্যি (The white knight’s song অবলম্বনে), হেসরি কিং-এর অকালমৃতু্য (হিলেয়ার বেলকের ‘হেনরিকিং’ অবলম্বনে), তিন ভিখিরি (ডার্মি টমসনের ‘থ্রি পুওর বেগারমেন’ অবলম্বনে)৷ যাঁরা বইটি পড়েছেন তাঁরা জানেন, ‘পিপলি বিলের ধারের সাতটি পরিবারের ইতিকথা’ ছাড়া অন্যগুলো শুধুই ছড়া৷ তবে মজার ঘটনা যেটা, তা হল ছড়াগুলো অনুবাদ করা হয়েছে ঠিকই কিন্ত্ত এগুলি ঠিক আক্ষরিক অনুবাদ নয়৷ একেবারে মুখাবয়ব বদলে দিয়ে সত্যজিতের নিজের ছাঁচে তৈরি গরম গরম পাঁপড়ভাজা৷ সুকুমারপুত্র কিন্ত্ত ভুলে যাননি মূল কবির কথা, তাঁদের সামনে বসিয়ে রেখে চিত্রশিল্পীর মতো নিখুঁত ছবি এঁকে গেছেন৷ অর্থাৎ রস-গন্ধ বজায় রেখে বিশ্বের দুই খেয়ালরসিক এডওয়ার্ড লিয়র ও লু্যইস ক্যারল এর মজার আজগুবি ছড়ার জগৎকে নিজের কল্পনার রঙে রাঙিয়ে নতুন করে পরিবেশন করেছেন সত্যজিৎ৷ ছোটোরা তো বটেই বড়োরাও চেটেপুটে সাবাড় করবে এই ঘোড়ার ডিম৷ এ স্বাদের ভাগ হবে না, একেবারে জিয়নকাঠের মোড়কে তৈরি৷ নিখুঁত নিটোল৷ মনে রাখতে হবে, শুধু ঘোড়ার ডিম নয়, ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’! ‘আবোল তাবোল’- এর শেষ কবিতায় বলাবাহুল্য সুকুমার রায়েরও শেষ রচনায়, এই পঙক্তিগুলি যত সংক্ষেপে ধরা হয়েছিল আজগুবি দুনিয়ার মেজাজকে, তার তুলনা মেলা ভার৷ সুকুমারের আবোল তাবোলের সেই বিদায়ী করুণ সুরটি পাঠক মনে করতে পারেন— ‘আদিম কালের চাঁদিম হিম, / তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম৷ / ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর, গানের পালা সাঙ্গ মোর৷’

আবোল তাবোলের ধারাবাহিকতার সুর ধরে রাখার জন্যই হয়তো সত্যজিৎ বইয়ের নামটাও পিতার কাছ থেকে ধার করেছেন৷ সন্দেহ নেই, বিশ্বের সেরা দুই খেয়ালরসিক লিয়র ও ক্যারলের বেয়াড়া ও সৃষ্টিছাড়া, নিয়মহীন ও হিসেবহারা আজগুবি জগৎকে নিজস্ব কল্পনার ছাঁচে ঢালাই করে বাংলা ননসেন্স জগতকে নতুন করে রাঙিয়ে দিয়েছেন সত্যজিৎ রায়৷ আবারও বলতে হয়, তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম যতটা না অনুবাদ ঠিক ততোটাই কবির অনুভবের উজ্জ্বল অনুসঙ্গ৷ ধরুন, সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল কেউ অনুবাদ করতে চাইছেন, কল্পনা করুন তার অবস্থাখানা কেমন হবে৷ ঐ ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’-মতো৷

লিয়রের লিমেরিক আর ক্যারলের ননসেন্সও তাই৷ আক্ষরিক অনুবাদ করা কঠিন তবে অসম্ভব আজগুবি দুনিয়ার রসদ ও রহস্যময় আনকোরা শব্দের দ্যোতনায়, হিজিবিজবিজদের কাণ্ডকারখানা যখন আমাদের মনের জগতকে নাড়িয়ে দেয়, লিয়রের স্কেচ থেকেই তখন জন্ম নেয় নতুন লিমেরিক; ক্যারলের লেখা আর স্যার জন টেনিয়েলের ছবি জুড়ে দিয়ে নতুন সৃষ্টিতে মেতে উঠতে৷ রক্তে যাঁর সুকুমার রায়ের উত্তরাধিকার, নিজে যিনি স্বপনঘোড়ার চড়নদার, সেই সত্যজিৎ রায় যেমন অনায়াসে এর আগে ‘আবোল তাবোল’- এর কয়েকটি কবিতাকে রূপান্তরিত করেছেন ইংরিজিতে, তেমনই স্বচ্ছন্দে ইংরিজি ননসেন্সকে বাংলা সাহিত্যের অন্দরমহলে নিয়ে এলেন এবার৷ তোড়ায় বাঁধার লেখাগুলি যতখানি লিয়রের, ক্যারলের বা বেলকের, ততখানিই সত্যজিতের৷