ইরানের ফের হামলার কথা ভাবছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক বৈঠকের পর নতুন করে সামরিক হামলার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্য়মে আমেরিকার কাছে পরমাণু সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠিয়েছে তেহরান। এই পরিস্থিতিতে সংঘাতের অবসান ঘটাতে নতুন করে উদ্যোগী হচ্ছেন মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরাও।
ফক্স নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার ও বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে ইরানকে ঘিরে সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক বৈঠক করেন মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকরা। ইরানের বিরুদ্ধে ফের বড় মাপের সামরিক অভিযান শুরু করা হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়। সম্ভাব্য অভিযানের জন্য প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। তবে এখনও পর্যন্ত ওয়াশিংটন থেকে নতুন করে হামলার কোনও নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প জানান, এ বিষয়ে শীঘ্রই সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে কিছু জানাননি তিনি। ট্রাম্পের কথায়, ‘সম্ভব হলে আমি ইরানের বাকি অংশটুকু ধ্বংস করতে চাই না। হয়তো আমাকে তা করতেই হবে। খুব শীঘ্রই আপনারা জানতে পারবেন।‘ তাঁর দাবি, ইরানের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি যাতে কোনও ভাবেই চালু করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে। সামরিক প্রস্তুতি চললেও চূড়ান্ত নির্দেশ নেই।
এর আগে ৮ অক্টোবর ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে ইরানে হামলা চালাবে না আমেরিকা। সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও নতুন করে বড়সড় অভিযানের অনুমোদন দেননি তিনি।
তবে চলতি সপ্তাহেই ইরানের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে সীমিত হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। মার্কিন আধিকারিকরা জানিয়েছেন, ২ নভেম্বর হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছিল। পরে ইরানের একটি বায়ু প্রতিরক্ষা কেন্দ্রেও হামলার কথা স্বীকার করেন ট্রাম্প।
সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, কাতারের মাধ্যমে আমেরিকার কাছে পরমাণু সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে তেহরান। তবে আলোচনায় বসার আগে আমেরিকাকে ইরানের সাতটি শর্ত পূরণ করতে হবে।
ইরানের দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ মুক্ত করা এবং যুদ্ধের কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেওয়া। ইরানের নিরাপত্তা আধিকারিক মহসেন রেজাই জানিয়েছেন, শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া বা আলোচনায় বসার কোনও প্রশ্ন নেই।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের দাবি, যে কোনও প্রাথমিক চুক্তির মধ্যেই পরমাণু সংক্রান্ত বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ইরানের প্রস্তাব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, আমেরিকার অনুমতি ছাড়া ইরান তার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনও পদক্ষেপ করতে পারবে না। তেহরানকে কোনও ভাবেই পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না বলেও ফের স্পষ্ট করেছেন তিনি।
অর্থাৎ, আলোচনার শর্ত নিয়েই দু’পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ইরান প্রথমে নিজেদের দাবি পূরণের শর্ত দিচ্ছে। অন্যদিকে, আমেরিকা শুরু থেকেই পরমাণু কর্মসূচির বিষয়টি আলোচনায় রাখতে চাইছে।
ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার মধ্যেই মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর নতুন করে সক্রিয় হয়েছে ডেমোক্র্যাট শিবির। আগামী কংগ্রেসে হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা।
হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি মিকস জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে প্রস্তাব আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। দলের সহকর্মীদের কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে তিনি সংঘাতের বিষয়ে প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের প্রকাশ্যে সাক্ষ্য দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন। যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কী ভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা নিয়েও জবাবদিহি চাইছে ডেমোক্র্যাট শিবির।
এর আগে যুদ্ধ সংক্রান্ত ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়ে একাধিক প্রস্তাব এনে আমেরিকার সামরিক ভূমিকা বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন ডেমোক্র্যাটরা। আগামী কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ফের সেই উদ্যোগ জোরদার হতে পারে। যদিও এ ধরনের কোনও প্রস্তাব কার্যকর করতে হলে একাধিক সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বাধা পেরোতে হবে।
বৃহস্পতিবার সিএনএন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাউস ডেমোক্র্যাটিক হুইপ ক্যাথরিন ক্লার্কও ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, স্পষ্ট লক্ষ্য বা যুদ্ধ শেষ করার কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই সংঘাতে জড়িয়েছে আমেরিকা। যুদ্ধের জন্য কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচের উপর কতটা পড়ছে এবং মার্কিন সেনাদের নিরাপদে দেশে ফেরানোর পরিকল্পনা কী, সে সব প্রশ্নের জবাব চাইবে ডেমোক্র্যাটরা।
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য দেশও। পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কায় নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ইরাক।বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি ফালেহ আল-জাইদি। প্রতিবেশী কোনও দেশের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালানোর জন্য ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না বলে তিনি ট্রাম্পকে জানিয়েছেন।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের বিবৃতি অনুযায়ী, দুই নেতার আলোচনায় আঞ্চলিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা সমন্বয় এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়া আটকানোর উপায় নিয়ে কথা হয়েছে। জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানো এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উপর জোর দিয়েছেন আল-জাইদি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলার পর থেকেই আমেরিকা-ইরান সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও।
ভারত-সহ এশিয়ার একাধিক দেশ অপরিশোধিত তেলের আমদানির জন্য এই অঞ্চলের উপর নির্ভরশীল। ফলে ইরানে ফের বড়সড় সামরিক অভিযান শুরু হলে তেল সরবরাহ ও সামুদ্রিক পরিবহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।
পরমাণু কর্মসূচি এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে বিধিনিষেধ নিয়ে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে কোনও সমঝোতা হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। কিন্তু নতুন করে সামরিক হামলা শুরু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যে সব দেশে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলিও পাল্টা হামলার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি, অন্যদিকে পরমাণু চুক্তি নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা—দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আন্তর্জাতিক মহল। তবে কবে সেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
দেখুন:<iframe width=”560″ height=”315″ src=”https://www.youtube.com/embed/va985nnNsXQ?si=-5cJ0aMhLUh1EWlP” title=”YouTube video player” frameborder=”0″ allow=”accelerometer; autoplay; clipboard-write; encrypted-media; gyroscope; picture-in-picture; web-share” referrerpolicy=”strict-origin-when-cross-origin” allowfullscreen></iframe>