হোয়াইট হাউসে (White House) বৃহস্পতিবার রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ( Xi Jinping) নৈশভোজ সারেন। সেখানে তাঁদের মধ্যে উষ্ণ সম্পর্কের ছবি ফুটে ওঠে। নৈশভোজ করার পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বার্তা দেওয়া হয়।
তবে এদিন হোয়াইট হাউসের (White House) বাইরে বিক্ষোভ দেখানো হয়। ‘ফ্রি তিব্বত’ এবং ‘ফ্রি হংকং’ স্লোগান ওঠে। শি জিনপিংয়ের ( Xi Jinping) উদ্দেশেও স্লোগান দেওয়া হয়। আপনি ‘স্বাগত নয়’ বলেও স্লোগান দেওয়া হয়।
নৈশ্যভোজের পর ট্রাম্প (Donald Trump) বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক ‘আগের চেয়ে ভালো’ হয়েছে। অন্যদিকে শি ( Xi Jinping) বলেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে হবে এবং এর জন্য ‘নতুন বিষয়বস্তু’ এবং ‘নতুন কৌশলগত দিশা’ প্রয়োজন। নৈশভোজে দুই দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পার্থক্যের কথা স্বীকার করলেও সহযোগিতার উপরেই বেশি জোর দেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প (Donald Trump) বলেন, ‘দুই দেশের নেতা হিসেবে প্রেসিডেন্ট শি ( Xi Jinping) এবং আমি দু’জনেই বুঝি যে আমরা ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করি। কিন্তু আমাদের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক অটুট রয়েছে এবং আমরা এর আগে কখনও এত ভালোভাবে একসঙ্গে কাজ করিনি।‘
দুই দেশের মধ্যে পণ্য, জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ভাবনার আদানপ্রদান বাণিজ্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে—এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
শি ( Xi Jinping) বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর আলোচনায় বিভিন্ন বিষয়ে ‘সাধারণ বোঝাপড়া’ তৈরি হয়েছে। তবে কোন কোন বিষয়ে সেই বোঝাপড়া হয়েছে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি এবং কোনও নির্দিষ্ট চুক্তির কথাও ঘোষণা করেননি।
চিনের প্রেসিডেন্ট বলেন, ট্রাম্পের (Donald Trump) সঙ্গে তাঁর আলোচনার ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পকর্কে ‘নতুন বিষয়বস্তু’ এবং ‘নতুন কৌশলগত দিশা’ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন’ নীতি এবং চিনের ‘মহান জাতীয় পুনর্জাগরণ’-এর লক্ষ্যকে একই সূত্রে বাঁধার চেষ্টা করেন শি ( Xi Jinping)। তাঁর মতে, দুই দেশের এই লক্ষ্যগুলি পরস্পরকে শক্তিশালী করতে পারে।
শি ( Xi Jinping) আরও বলেন, ‘চিন ও আমেরিকাকে দায়িত্বশীল বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করতে হবে। নিজেদের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। সময়ের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে এবং বৃহৎ দেশগুলির পারস্পরিক সহাবস্থানের জন্য নতুন পথ খুঁজে বের করতে হবে।‘
নৈশভোজে প্রতীকী নানা আয়োজন
ট্রাম্প(Donald Trump) শি ( Xi Jinping)-কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক টাক-মাথা ঈগলের একটি মূর্তি উপহার দেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সেটি বেজিংয়ে ‘‘একটি সুন্দর জায়গায়’’ স্থান পাবে।
মার্কিন-চিন কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসকেও নৈশভোজের আয়োজনে তুলে ধরা হয়। হোয়াইট হাউসের সরকারি মেনুতে ছিল শ্রামসবার্গ ব্ল্যাঙ্ক দ্য নোয়ার্স। ১৯৭২ সালে নিক্সন ও চৌ এনলাইয়ের ঐতিহাসিক ‘টোস্ট টু পিস’-এ পরিবেশিত স্পার্কলিং ওয়াইনের কথা মাথায় রেখেই এই পানীয় বেছে নেওয়া হয়েছিল।
নৈশভোজের সাজসজ্জাতেও চিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন ছিল। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, চিনের সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে লাল রঙের বিশেষ গুরুত্ব থাকায় সাজসজ্জায় লাল রঙকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। ইস্ট রুমে লাল রঙের টেবিলক্লথ, ডালিয়া ও রানানকুলাস ফুল ব্যবহার করা হয়।
হোয়াইট হাউসের (White House) প্রেস পুলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নৈশভোজে অ্যাপলের সিইও টিম কুক, এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং, ইলন মাস্ক এবং এএমডির সিইও লিসা সু-সহ মোট ১৩৪ জন অতিথি উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন: হোয়াইট হাউসে শি জিনপিং-কে স্বাগত ট্রাম্পের, বাণিজ্য ও কূটনীতিতে নজর
হোয়াইট হাউসের বাইরে ‘ফ্রি তিব্বত’, ‘ফ্রি হংকং’ স্লোগান
শির ( Xi Jinping) সফর ঘিরে হোয়াইট হাউসের (White House) বাইরে এদিন বিক্ষোভ দেখা যায়। বিক্ষোভকারীরা ‘ফ্রি হংকং’, ‘ফ্রি তিব্বত’, ‘সিসিপি, আপনাদের স্বাগত নয়’ এবং ‘শি জিনপিং, আপনাকে স্বাগত নয়’— স্লোগান ওঠে।
বিক্ষোভকারীরা রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং হংকংয়ের কারাবন্দি সংবাদমাধ্যমের প্রকাশক ও গণতন্ত্রকর্মী জিমি লাইয়ের মুক্তির দাবিও তোলেন। শির সফরকে কেন্দ্র করে তিব্বতি, উইঘুর, হংকং, তাইওয়ান, দক্ষিণ মঙ্গোলিয়া এবং চিনের গণতন্ত্রপন্থী বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে একাধিক বিক্ষোভের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল।
চিনের দূতাবাসের কাছে বিক্ষোভে বাধার অভিযোগ তিব্বতি সংগঠনগুলির
তিব্বতি সংগঠনের আয়োজকরা অভিযোগ করেন, চিনের দূতাবাসের বাইরে বিক্ষোভ করার অনুমতি থাকা সত্ত্বেও কয়েকশো বিক্ষোভকারীকে ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভে পৌঁছতে দেওয়া হয়নি।নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রাস্তা নিয়ন্ত্রণের কারণে ভ্যান নেস স্ট্রিটে তাঁদের আটকে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
আয়োজকদের দাবি, তাঁদের মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিপার্টমেন্টের অনুমতিতে সর্বোচ্চ ২,০০০ জনের অংশগ্রহণ, মাইকে বক্তব্য এবং ৩৫০৫ ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভ থেকে মিছিলের অনুমতি ছিল।
ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেন ফর টিবেট অভিযোগ করে, শিকে স্বাগত জানানো গোষ্ঠীগুলি হোয়াইট হাউসের বাইরে জমায়েতের সুযোগ পেলেও চিনের দূতাবাসের কাছে তিব্বতি বিক্ষোভকারীদের নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হয়েছে।
ক্যাপিটাল এরিয়া টিবেটান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তেনজিন নরবু বলেন, এই পরিস্থিতি নিয়ে আগামী দিনে পরিকল্পিত অন্যান্য বিক্ষোভ কর্মসূচি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: আফগানিস্তানে ফের হামলা পাকিস্তানের, অন্তত ১০টি এলাকায় হামলা
বিক্ষোভকারীদের নজরদারি নিয়ে উদ্বেগ
ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেন ফর টিবেটের নির্বাহী পরিচালক রায়ান ফিওরেসি অভিযোগ করেন, চিনা নাগরিকরা তিব্বতি বিক্ষোভকারীদের ছবি ও ভিডিও রেকর্ড করছিলেন।
তিনি বলেন, ‘এরা আমেরিকান। তাঁরা তিব্বতি-আমেরিকান এবং আমেরিকার মাটিতে নিজেদের অধিকার প্রয়োগ করছেন। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার সম্পূর্ণ অধিকার তাঁদের রয়েছে।’
তাঁর আরও অভিযোগ, আমেরিকায় নিজেদের মতামত প্রকাশ করার সময় তিব্বতিদের নজরদারি বা ভয় দেখানোর পরিবেশ থাকা উচিত নয়। বিক্ষোভকারীরা ১১তম পাঞ্চেন লামা এবং অন্যান্য তিব্বতি রাজনৈতিক বন্দির মুক্তির দাবিও জানান। চিনা কর্তৃপক্ষ এবং তিব্বতি প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু করা এবং তিব্বতের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পরিচয় ক্ষুণ্ণ করছে বলে তাঁরা যে নীতিগুলির অভিযোগ করেন, সেগুলি বন্ধ করারও দাবি জানান।
চিন-মার্কিন বন্ধুত্বের সুন্দর ফুল ফোটানোর আহ্বান শি জিনপিংয়ের
এদিন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ( Xi Jinping)-এর বক্তব্যের মূল সুর ছিল দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চিন ও আমেরিকার সহযোগিতার ইতিহাস এবং দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আগে ‘পিং-পং কূটনীতি’র কথাও তুলে ধরেন শি।
চিনের প্রেসিডেন্ট ( Xi Jinping) দুই দেশকে তাঁদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ‘নতুন অধ্যায়’ লেখার আহ্বান জানান। অন্যদিকে ট্রাম্প দুই দেশের জনগণের জন্য ‘সম্প্রীতি, শান্তি ও সাফল্য’ কমনা করেন। নৈশভোজের আগে ট্রাম্প জিনপিংকে হোয়াইট হাউসের নতুন সাউথ লন হেলিপ্যাডও দেখান। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউস সেই সফরের ভিডিও প্রকাশ করেন। তবে নৈশভোজে দুই নেতার কেউই জিনপিং-এর উল্লেখ করা ‘সাধারণ বোঝাপড়া’ কীভাবে নির্দিষ্ট চুক্তি বা পদক্ষেপের রূপ নেবে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।
দেখুন: এমন ব্যবস্থা গোটা ভারতে কোথাও নেই’, আদানি হাসপাতাল নিয়ে দাবি মুখ্যমন্ত্রীর