নতুন ইতিহাসের সামনে বেন শেলটন। নিজের দেশেই গ্র্যান্ড স্ল্যামের ফাইনালে উঠে মার্কিন টেনিসের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ২৩ বছরের এই তারকা। শুক্রবার রাতে সতীর্থ ফ্রান্সিস টিয়াফোকে ৪-৬, ৬-৩, ৬-৩, ৭-৫-এ হারিয়ে প্রথম বার কোনও গ্র্যান্ড স্ল্যামের ফাইনালে উঠলেন (US Open)শেলটন। শেষ লড়াইয়ে তাঁর সামনে বিশ্বের এক নম্বর আলেকজান্ডার জেভেরেভ।
আর এই ফাইনাল (US Open) শুধু শেলটনের ব্যক্তিগত স্বপ্নপূরণের ম্যাচ নয়। ২০০৩-এ অ্যান্ডি রডিকের পর কোনও মার্কিন পুরুষ টেনিস খেলোয়াড় গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিততে পারেননি। অর্থাৎ জেভেরেভকে হারাতে পারলে ২৩ বছরের সেই খরা কাটবে। পাশাপাশি আর্থার অ্যাশের পরে ইউএস ওপেনের পুরুষ সিঙ্গলস ফাইনালে ওঠা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন পুরুষ খেলোয়াড়ও হলেন শেলটন।
সেমিফাইনালে শুরুটা অবশ্য শেলটনের পক্ষে ছিল না। প্রথম সেটে ৪-৬ হেরে যান তিনি। টিয়াফো তাঁর সার্ভিসে চাপ তৈরি করছিলেন, অন্য দিকে শেলটনের খেলায় তখনও বেশ কিছু অনভিজ্ঞতার ছাপ। কিন্তু দ্বিতীয় সেট থেকেই বদলে যায় ম্যাচের ছবি। সার্ভিসের গতি বাড়ান, রিটার্নে চাপ তৈরি করেন। টিয়াফোকে ছন্দে ফিরতেই দেননি।
দ্বিতীয় সেট ৬-৩ এবং তৃতীয় সেটও একই ব্যবধানে জিতে ম্যাচে ২-১-এ এগিয়ে যান শেলটন। চতুর্থ সেটে টিয়াফো শেষ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ৫-৫ অবস্থায় তাঁর সার্ভিসে তিনটি ম্যাচ পয়েন্ট পেয়ে যান শেলটন। প্রথমটি বাঁচালেও দ্বিতীয় সুযোগে ডাবল ফল্ট করে বসেন টিয়াফো। সেখানেই শেষ হয়ে যায় তাঁর লড়াই। ৩ ঘণ্টা ১৭ মিনিটের ম্যাচে শেলটন পৌঁছে যান জীবনের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনালে।
শেলটনের বড় অস্ত্র ছিল তাঁর সার্ভিস। ম্যাচে ১৮টি এস করেন তিনি। আগের কোয়ার্টার ফাইনালে কার্লোস আলকারাজকে হারিয়েও দারুণ নজর কেড়েছিলেন এই আমেরিকান। পর পর এমন দুই জয় তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে একেবারে অন্য উচ্চতায়।
ফাইনালে ওঠার পর আবেগ সামলাতে পারেননি শেলটন। দর্শকদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ‘রবিবার তোমাদের সব শক্তি নিয়ে আসতে হবে। আমি সবটা দিয়ে লড়ব। কোর্টে যা দেওয়ার, সব দিয়ে দেব। আশা করছি তোমরা আমাকে সমর্থন করতে আসবে। আমেরিকার জন্য এটা আমরা সবাই মিলে করি’।
আরও পড়ুন: আফগানিস্তান সিরিজের আগে বড় ধাক্কার আশঙ্কা, নেটে চোট ইশানের! কী বললেন সাইনি?
টিয়াফোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথাও বলেছেন শেলটন। তাঁর কথায়, ‘ফো আমার বড় ভাইয়ের মতো। একসঙ্গে এই কোর্টে নামা, আর্থার অ্যাশে খেলা—এটা বিশেষ অনুভূতি। এই টুর্নামেন্টের শেষে আমরা দু’জনেই এখানে থাকতে চেয়েছিলাম। এই টুর্নামেন্ট আমাদের দু’জনেরই প্রিয়, এই কোর্টও পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় কোর্ট। এখানে তোমাদের গর্জে উঠতে দেখা বিশ্বের সেরা অনুভূতি’।
এ বার সামনে জেভেরেভ। জার্মান তারকা এর আগেই সেমিফাইনালে ক্যারেন খাচানভকে ৬-৩, ৭-৬, ৭-৬ হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছেন। এটাই জেভেরেভের ইউএস ওপেনের দ্বিতীয় ফাইনাল এবং চলতি মরসুমে তৃতীয় গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনাল।
তবে পরিসংখ্যান শেলটনের বিরুদ্ধে। জেভেরেভের বিরুদ্ধে আগের পাঁচটি ম্যাচের একটিতেও জিততে পারেননি তিনি। অর্থাৎ ফাইনালে নামার আগে মানসিক লড়াইটাও কম নয়। কিন্তু গ্র্যান্ড স্ল্যামের ফাইনাল অন্য মঞ্চ। আর নিউ ইয়র্কের গর্জন যদি শেলটনের পাশে থাকে, তা হলে ইতিহাসের দরজা তাঁর জন্য খুলে যেতেই পারে।
‘ছ’বছর আগের সেই ক্ষত আর নেই! বদলে গিয়েছে সব কিছুই’
ছ’বছর আগে যে মঞ্চে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল, সেই ইউএস ওপেনের (US Open) ফাইনালে আবার ফিরলেন আলেকজান্ডার জেভেরেভ। তবে এ বার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। ২০২০-র সেই তীব্র হতাশা পেরিয়ে ২০২৬-এ প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের স্বাদ পেয়েছেন জার্মান তারকা। ফরাসি ওপেন জয়ের পর উইম্বলডনে রানার্স। আর এ বার নিউ ইয়র্কে ফের ফাইনাল। তাই জেভেরেভের নিজের কথাতেই, ‘সব কিছুই বদলে গিয়েছে’।
শুক্রবার সেমিফাইনালে (US Open)রাশিয়ার কারেন খাচানভকে ৬-৩, ৭-৬ (৯-৭), ৭-৬ (৮-৬) হারিয়ে ফাইনালের টিকিট কাটেন শীর্ষবাছাই জ়ভেরেভ। প্রায় তিন ঘণ্টার লড়াইয়ে খাচানভ তাঁকে যথেষ্ট চাপে ফেলেছিলেন। বিশেষ করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সেটের টাইব্রেকারে ম্যাচের রাশ বদলে যেতে পারত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মাথা ঠান্ডা রেখে জয় তুলে নেন জ়ভেরেভ।
এ বারের জেভেরেভকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০২০-তে। কোভিডের কারণে দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে ডমিনিক থিয়েমের বিরুদ্ধে ফাইনালে প্রথম দুই সেট জিতে গিয়েও হেরে গিয়েছিলেন তিনি। সেই হার দীর্ঘ দিন তাঁকে তাড়া করে বেরিয়েছে। কিন্তু তার পর কেটে গিয়েছে ছ’বছর। খেলেছেন একাধিক বড় ফাইনাল। ২০২১ টোকিও অলিম্পিকে সোনা জিতেছেন। চলতি বছরে অবশেষে ফরাসি ওপেন জিতে প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম ট্রফিও হাতে তোলেন।
আরও পড়ুন: ৪৩ বলে হাফ সেঞ্চুরি, ৯ ছক্কা! এডজবাস্টনে রজাউল্লাহর ঝড়ে পিছলো ইংল্যান্ডের চুনকাম
তাই ২০২০-এর সেই জেভেরেভ আর ২০২৬-এর জেভেরেভ এক নন। নিজেই বলছেন, ‘অনেক কিছুই ঘটেছে। তার পর আমি অনেক ফাইনাল খেলেছি, অনেক বড় ম্যাচ খেলেছি। তখন সেটা ছিল আমার প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনাল। আমি অভিজ্ঞ ছিলাম না। সব কিছুই আলাদা। এখন সব কিছুই বদলে গিয়েছে’। শুধু অভিজ্ঞতাই নয়, মানসিক দৃঢ়তাতেও বদল এসেছে বলে মনে করছেন জেভেরেভ।
এবারের ইউএস ওপেনের (US Open) শুরুটা কিন্তু মোটেই মসৃণ ছিল না। প্রথম দুই রাউন্ডে তাঁকে পাঁচ সেটের কঠিন ম্যাচ খেলতে হয়েছে। এমনকি একটা সময় নিজের টুর্নামেন্ট নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার পর টানা চারটি ম্যাচ জিতেছেন একটিও সেট না হেরে।
এ বার ফাইনালে তাঁর সামনে আমেরিকার বেন শেলটন। জেভেরেভের সামনে আরও একটি বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে—ঘরের দর্শকদের বিপুল সমর্থন নিয়ে খেলবেন শেলটন। ২০২০-র ফাইনাল খেলেছিলেন কার্যত নীরব স্টেডিয়ামে। কোভিডের কারণে দর্শক ঢোকার অনুমতি ছিল না। এ বার ছবিটা সম্পূর্ণ উল্টো। আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়াম থাকবে কানায় কানায় পূর্ণ।
জেভেরেভ বলছেন, ‘আমি নিশ্চিত, রবিবার পরিবেশটাও একেবারেই অন্য রকম হবে। দর্শকে ভর্তি আর্থার অ্যাশ-এ ফাইনাল খেলার অনুভূতি অসাধারণ হবে। খালি স্টেডিয়ামে ফাইনাল খেলার চেয়ে এটা অনেক বেশি আনন্দের’।
ছ’বছর আগে যেখানে চোখের জলে শেষ হয়েছিল জ়ভেরেভের ইউএস ওপেন অভিযান, সেখানেই এ বার নতুন গল্প লেখার সুযোগ। ফরাসি ওপেনের পর দ্বিতীয় গ্র্যান্ড স্ল্যাম? নাকি নিউ ইয়র্কে ফের শেষ মুহূর্তে স্বপ্নভঙ্গ? উত্তর মিলবে রবিবার।
দেখুন: ব্রিকস দেশগুলির হাতে বিশ্বের ৪০ শতাংশ বেশি জিডিপি, জি৭-এর অবদান মাত্র ২৯শতাংশ: পুতিন