সুব্রত সরকার
ছোটকার বন্ধু এসেছে আলিপুরদুয়ার থেকে। রঙিনের খুব মজা। ছোটকার বন্ধু মানেই তো কাকু। কিন্তু এই কাকুর নামের আগে একটা ডুয়ার্স জুড়ে গিয়ে হয়েছে ‘ডুয়ার্সের কাকু’।
Advertisement
ডুয়ার্স কাকে বলে রঙিন জানতো না। ছোটকা বারোমাস জঙ্গলে বেড়াতে যায়। সবচেয়ে বেশি যায় ডুয়ার্সে। তাই ছোটকার মুখে ডুয়ার্স নামটা শুনে শুনে ওর ভালো লেগে গেছে। ছোটকা ওকে একদিন খুব সহজ করে বুঝিয়ে বলেছিল, ‘ডুয়ার্স হলো পাহাড়, জঙ্গল, চা বাগান আর নদীর দেশ। শিলিগুড়ি ছাড়িয়ে নিউমাল থেকে আলিপুরদুয়ার পর্যন্ত ডুয়ার্স।’
Advertisement
ছোটকার বন্ধু আলিপুরদুয়ার থেকে এসেছে। তাই রঙিন খুব আবদার করে বলেছিল, ‘তোমার ডুয়ার্সের বন্ধুর কাছে অনেক গল্প শুনব কিন্তু।’
‘শুনবি। অবশ্যই শুনবি। ও খুব ভালো গল্প বলতে পারে। ছোটদের নিয়ে সারাবছর ক্যাম্প করে। বার্ড ওয়াচিং ক্যাম্প, বাটারফ্লাই ক্যাম্প, নেচার স্টাডি ক্যাম্প। তাই ওর কাছে অনেক গল্প জমা হয়ে থাকে।’
‘কী মজা! তাহলে তো শুনতেই হবে জঙ্গলের গল্প।’ রঙিন হেসে হেসে বলেছিল।
ডুয়ার্সের কাকু এখন ক্যামেরা নিয়ে বসেছে। কালকেই ছোটকা ও ডুয়ার্সের কাকু নতুন ক্যামেরাটা কিনে এনেছে ধর্মতলার এক দোকান থেকে। এই দোকানটা নাকি ক্যামেরার জন্য বিখ্যাত। ছোটকার খুব চেনা দোকান। ছোটকাই নিয়ে গিয়েছিল ডুয়ার্সের কাকুকে। নতুন ক্যামেরাটা কিনতেই ডুয়ার্সের কাকু কলকাতায় এসেছে। ক্যামেরাটা অনেক দামী এবং একদম লেটেস্ট মডেলের।
রঙিনকে দেখে ডুয়ার্সের কাকু বলল, ‘যাবে নাকি জঙ্গলে বেড়াতে?’
‘হ্যাঁ যাব।’ রঙিন হেসে বলল, ‘তুমি নিয়ে যাবে জঙ্গলে? আমার জঙ্গল দেখতে খুব ভালো লাগে।’
‘ভয় পাবে না তো?’
‘কীসের ভয়?’
‘জঙ্গলে তো অনেক জন্তু জানোয়ার থাকে।’
‘ডুয়ার্সের জঙ্গলে নাকি অনেক হাতি আছে?’
‘আছে তো? ডুয়ার্সের জঙ্গল হাতিদেরই জঙ্গল। ওরা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে গ্রামে, শহরেও চলে আসে।’
‘তাই! কেন আসে? তখন কী হয়?’
‘খাবারের জন্য ওরা লোকালয়ে চলে আসে। ফরেস্টের লোকেরা এসে আবার ওদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় জঙ্গলে?’
‘হাতিরা ওদের কথা শোনে?’
‘কেন শুনবে না! হাতিরা খুব বুদ্ধিমান।’
‘তাই? কী করে তুমি জানলে?’
ডুয়ার্সের কাকু এবার জমিয়ে গল্প বলার মত করে বলতে শুরু করল, ‘তাহলে তো তোমাকে একটা সত্যি গল্প শোনাতেই হয়।’
‘গল্প আবার সত্যি হয় নাকি?’ রঙিন প্রশ্ন করে।
‘সব গল্প সত্যি হয় না। কিন্তু এই গল্পটা একদম সত্যি!’
‘তাই! বলো বলো সত্যি গল্পটা বলো।’
ডুয়ার্সের কাকু নতুন ক্যামেরাটা সাবধানে সরিয়ে রেখে বলল, ‘বেশ তাহলে শোন এই গল্পটা।’
রঙিন হাঁটুমুড়ে বসে তাকিয়ে থাকে ডুয়ার্সের কাকুর দিকে। কাকু বলতে শুরু করে গল্প, ‘জানো তো আমাদের ওখানে অনেক জঙ্গল আছে। গভীর জঙ্গল। রাজাভাতখাওয়া, জয়ন্তী, চিলাপাতা, মেন্দাবাড়ি, হলং, মাদারিহাট। এগুলো সব ঘন জঙ্গল এরিয়া। হাতি আছে অনেক। একবার এমন এক জঙ্গল থেকে হাতির দল গ্রামে ঢুকে মানুষের জমির পাকা ধান, ভুট্টা সব খেতে শুরু করেছে। গ্রামের লোকেরা তো চিৎকার করে, পটকা ফাটিয়ে, টিন পিটিয়েও হাতিগুলোকে তাড়াতে পারছে না। বন দফতরে খবর চলে যায়।’
‘বন দফতর কী, কাকু?’
‘ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট। ওখান থেকে অনেক বনকর্মীদের নিয়ে রেঞ্জার সাহেব চলে আসেন।’
‘রেঞ্জার সাহেব কী?’
‘ফরেস্ট অফিসার। এই অফিসার ছিলেন আবার খুব সাহসী।’
‘তাই! কী করলেন তখন?’
‘ওরা হাতিগুলোকে ধীরে ধীরে ভূট্টাখেত থেকে জঙ্গলের পথে ঠিক নিয়ে এসেছে, এমন সময় একটা হাতি হঠাৎ কেমন রেগে গিয়ে তেড়ে আসে ওদের দিকে। সবাই ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। সাহসী রেঞ্জার পালাতে পারেননি। হাতির সামনে পড়ে যান। হাতি তখন মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে…’
‘ওরে বাবা… কী হলো তখন…’
‘হাতি তাকিয়ে থাকে রেঞ্জারের দিকে। কিন্তু এগিয়ে আসে না। রেঞ্জারও থমকে দাঁড়িয়ে থাকেন। পালিয়ে যান না।’
‘তারপর কী হলো?’
‘এবারই তো আসল গল্প!’
‘বলো কাকু, বলো তাড়াতাড়ি।’
‘বলছি তো… এই গল্পটা বলতে আমার খুব ভালো লাগে। আমি সব ক্যাম্পে এই গল্পটা শোনাই।’
রঙিন ছটফট করছে গল্পটা শোনার জন্য। ডুয়ার্সের কাকু এবার বলল, ‘রেঞ্জার হঠাৎ হাতজোড় করে বলেছিল, ‘আমরা তো তোমাদের নিতেই এসেছি। চলো জঙ্গলে ফিরে চলো।’
‘সত্যি বলেছিল?’
‘হ্যাঁ, সত্যি বলেছিল।’
‘তারপর কী হলো?’
ডুয়ার্সের কাকু সুন্দর হেসে হেসে বলল, ‘সেই হাতিটা ওদের লিডার ছিল। শুঁড় তুলে একটা আওয়াজ করেছিল জোর। সেই আওয়াজ শুনে বাকি সব হাতিরা কী সুন্দর দলবেঁধে জঙ্গলের দিকে চলে গেল। রেঞ্জার সাহেব তখন শুধু দাঁড়িয়েই রইলেন। শেষ হাতিটা যখন জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গেল, চারপাশ থেকে লোকজন, বনকর্মীরা ছুটে এসে রেঞ্জারকে ঘিরে ধরে আনন্দ করতে শুরু করেছে। খুব আনন্দ। সকলেই জানতে চাইছিল, স্যার আপনি কী বললেন?’
‘এই গল্পটাই বলেছিল রেঞ্জার সাহেব তখন?’ কাকুর দিকে চেয়ে রঙিন বলল।
ডুয়ার্সের কাকু মুচকি হেসে তখন বলল, ‘না।’
রঙিন অবাক হয়ে বলে, ‘তাহলে কী বলেছিল রেঞ্জার সাহেব?’
রেঞ্জার সাহেব ওদের তখন বলেছিল, ‘আমি হাতিটাকে বললাম, তোমরা জঙ্গলে চলে যাও। আমরা তোমাদের খাবার পৌঁছে দেব এখনই।’
‘ওমা তাই!… রঙিন অবাক হয়ে বলল, ‘রেঞ্জার সাহেব মিথ্যে কথা কেন বললেন?’
‘কখনো কখনো কিছু মিথ্যে কথা সত্যি কথার চেয়েও শক্তিশালী হয়।’ রঙিন ডুয়ার্সের কাকুর এই কথাটা ঠিক বুঝতে না পেরে চেয়েই থাকে কাকুর দিকে। কাকু তখন হেসে বলল, ‘এই কথাটা শুনে গ্রামের কত লোক হাতিদের জন্য চালতা, কলাগাছ, লাটোর গাছের পাতা, ফল, গাছের শেকড়, লতাপাতা, ঘাস সব এনে দিয়েছিল রেঞ্জার সাহেবকে। সাহেব তখন গাড়ি বোঝাই করে সেই সব খাবার নিয়ে জঙ্গলে ছড়িয়ে ছড়িয়ে দিয়েছিল। ওরা তো জানে, হাতিরা কোথায় কোথায় এসে বসে, জল খায়। খাবারগুলো সব ওখানে রেখে দেওয়া হয়েছিল।’
‘বাহ্ এ তো দারুণ সত্যি গল্প, কাকু।’
‘তোমার ভালো লেগেছে?’
‘খুব ভালো লেগেছে।’
ডুয়ার্সের কাকুকে এবার রঙিন আবদার করে বলল, ‘কাকু আমি আরও এমন গল্প শুনতে চাই।’
‘বলব তো!.. ‘কাকু হেসে বলল, ‘আজ স্কুল যাবে না?’
‘যাব তো। কটা বাজে!.. ও!.. যাই যাই।’ বলেই দৌড় লাগায় রঙিন, ‘স্কুল থেকে এসে আবার কিন্তু শুনব তোমার গল্প।’
ডুয়ার্সের কাকু রঙিনের এভাবে দৌড়ে যাওয়াটা দেখে খুব মজা পেল। আর মনে মনে ভাবল, এবার শীতে ওকে নেচার স্টাডি ক্যাম্পে নিয়ে
যেতেই হবে!
Advertisement



