কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে বড় পদক্ষেপের পথে পশ্চিমবঙ্গ? প্রযুক্তির আগামী বিপ্লবে কি জায়গা করে নেবে বাংলা

Photo: Representational Image

দীর্ঘদিন শিল্পে স্থবিরতার অভিযোগে জর্জরিত পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই নতুন করে বিনিয়োগের আবহ তৈরি হয়েছে। একের পর এক দেশি-বিদেশি সংস্থার রাজ্যে বিনিয়োগে আগ্রহ, শিল্প প্রকল্প নিয়ে আলোচনা এবং উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেত্রেও উদ্যোগের খবর সামনে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার কোয়ান্টাম কম্পিউটিং প্রযুক্তি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ইঙ্গিত মিলেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর পর প্রযুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় এখন কোয়ান্টাম কম্পিউটিং। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন আগামী প্রজন্মের কম্পিউটিং প্রযুক্তি, যা শুধু কম্পিউটারের গতি বাড়াবে না, বরং এমন সব জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারবে, যা আজকের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটারের পক্ষেও কার্যত অসম্ভব। সেই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র, চিন, ব্রিটেন, জাপান, কানাডা, ফ্রান্স-সহ বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলি এই প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গেও কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের ইঙ্গিত মিলেছে।

নবান্ন সূত্রের খবর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রযুক্তি সংস্থার প্রতিনিধিরা শীঘ্রই রাজ্যে এসে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও ওই সংস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য হবে রাজ্যে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং প্রযুক্তির সম্ভাবনা, গবেষণা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং ভবিষ্যতের বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা। এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক চুক্তি না হলেও, এই উদ্যোগ সফল হলে পশ্চিমবঙ্গের প্রযুক্তি-মানচিত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


কোয়ান্টাম কম্পিউটিং আসলে কী? সাধারণ কম্পিউটার যেখানে ‘বিট’ ব্যবহার করে কাজ করে এবং একটি বিট এক সময়ে হয় ০, নয়তো ১ হতে পারে, সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার ‘কিউবিট’ ব্যবহার করে। কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী একটি কিউবিট একই সঙ্গে ০ এবং ১—দুই অবস্থাতেই থাকতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় ‘সুপারপজিশন’।

আবার একাধিক কিউবিট এমনভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে যে, একটির পরিবর্তন অন্যটিকেও প্রভাবিত করে। একে বলা হয় ‘এনট্যাঙ্গেলমেন্ট’। এই দুই বৈশিষ্ট্যের কারণেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার একই সময়ে অসংখ্য সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে এমন সব জটিল অঙ্ক বা তথ্য বিশ্লেষণ সম্ভব হয়, যা বর্তমানের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটারের পক্ষেও অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ।

এই প্রযুক্তির ধারণার সূচনা আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার দশক আগে। ১৯৮১ সালে নোবেলজয়ী পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান প্রথম কোয়ান্টাম কম্পিউটারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। পরে ডেভিড ডয়েচ সেই ধারণাকে তাত্ত্বিক ভিত্তি দেন। ১৯৯৪ সালে পিটার শরের অ্যালগরিদম বিশ্বকে বুঝিয়ে দেয়, ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম কম্পিউটার বর্তমানের প্রচলিত এনক্রিপশন ব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। এরপর ২০১৯ সালে গুগল ‘কোয়ান্টাম সুপ্রিমেসি’ অর্জনের দাবি করে। বর্তমানে

আইবিএম, গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, আইওএনকিয়ু, রিগেটি, কিয়ুয়েরা-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা এই প্রযুক্তিকে আরও পরিণত করার লক্ষ্যে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং শুধু কম্পিউটারের গতি বাড়ানোর প্রযুক্তি নয়; এটি আগামী দিনের অর্থনীতি ও বিজ্ঞানের ভিত্তিই বদলে দিতে পারে। ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রে জটিল আর্থিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ, প্রতারণা রোধ এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা আরও নির্ভুল হবে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে নতুন ওষুধ আবিষ্কার, ক্যানসারের মতো রোগের গবেষণা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসায় এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

কৃষিক্ষেত্রে আরও নির্ভুল আবহাওয়ার পূর্বাভাস, মাটির গুণমান বিশ্লেষণ, জল ব্যবস্থাপনা এবং ফসল উৎপাদনের পরিকল্পনা উন্নত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রতিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা, মহাকাশ গবেষণা, পরিবহণ এবং শিল্প উৎপাদনেও এই প্রযুক্তি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।

 

ভারতও এই প্রযুক্তির দৌড়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। ২০২৩ সালে কেন্দ্র সরকার ‘ন্যাশনাল কোয়ান্টাম মিশন’ চালু করে, যার জন্য ছয় হাজার কোটিরও বেশি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। আইআইটি, আইআইএসসি, টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ, সি-ড্যাক-সহ একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই কোয়ান্টাম প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। বেঙ্গালুরুর কিউপিআইএআই, কিউএনইউ ল্যাবস, ট্যাকবিট ল্যাবসের-এর মতো ভারতীয় স্টার্টআপও এই ক্ষেত্রে দ্রুত এগোচ্ছে। প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা  ডিআরডি-ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে।

বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এখনও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে সবচেয়ে এগিয়ে। আইবিএম, গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, আইওএনকিয়ু, রিগেটি, কিয়ুয়েরা-এর মতো সংস্থাগুলি হার্ডওয়্যার ও সফ্টওয়্যার—দুই ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব দিচ্ছে। চিনও সরকারি বিনিয়োগে দ্রুত অগ্রগতি করেছে। পাশাপাশি ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াও এই প্রযুক্তিকে আগামী দিনের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখছে।

এই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেই পশ্চিমবঙ্গের উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যদি মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে গবেষণা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কিংবা ভবিষ্যতের বিনিয়োগের পথ খুলে যায়, তাহলে রাজ্যে উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। কলকাতার তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমও তার সুফল পেতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এখনও পুরোপুরি বাণিজ্যিক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। প্রযুক্তিটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এখনও বহু গবেষণা বাকি। কিন্তু ভবিষ্যতের প্রযুক্তি যে এই দিকেই এগোচ্ছে, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রায় কোনও দ্বিমত নেই।

সেই কারণেই বিশ্বের বড় বড় দেশ যখন আগামী দিনের প্রযুক্তির দৌড়ে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত, তখন পশ্চিমবঙ্গও যদি এই যাত্রার অংশ হতে পারে, তবে তা শুধু একটি নতুন প্রযুক্তির আগমন হবে না; বরং রাজ্যের শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প ও অর্থনীতির জন্যও খুলে যেতে পারে এক নতুন দিগন্ত। এখন দেখার, নবান্নের এই প্রাথমিক উদ্যোগ ভবিষ্যতে কতটা বাস্তব রূপ পায়।