রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা, পর্ব ৪: স্নেহলতার আত্মহত্যা, রবীন্দ্রনাথের ‘স্ত্রীর পত্র’ এবং একটা ভিজে ডায়েরির গল্প

Image: AI নির্মিত

লিডস শহরের পুরনো কবরস্থানটায় এসে বসে বই পড়ে স্নেহা| আগাছায় জড়ানো ভাঙ্গাচুরা তোবড়ানো কবরে সে কি খোঁজে নিজের পূর্বজন্মের নাম? পূর্বজন্ম যেন পূর্বরাগ, কবিতা গানের মত ছন্দ হয়ে ভেসে আসা জীবন প্রবাহ| জীবন মৃত্যু সেখানে ঘটনা মাত্র, দিন বদলের ঋতুর মতো। অফিসের কাজের ফাঁকে ডাইরির পাতায় রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন চরিত্রতে শান্তি খুঁজে পায় সে| পুরনো কাগজ হাতড়ানোর মত খুঁজতে খুঁজতে সমুদ্র মন্থনে উঠে এলো ‘মৃণাল’ (Mrinal)!

সায়নকে যে কথাগুলো বলতে চেয়েও বলতে পারেনি স্নেহা, মৃণালের (Mrinal) আত্মকথনে তা ব্যক্ত| ভৌগলিক দূরত্বের অছিলায় কি মনের দূরত্ব ঢেকে রাখা যায়? আত্মমগ্ন স্নেহার কাছে রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) বটবৃক্ষের মতো | মনের নিমগ্নতায় ছায়া দেয় অবিরাম| মৃণাল যা পেরেছিল, স্নেহা কি পারবে? সায়নের বাড়ির ঐশ্বর্যের প্রাচুর্যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আতিশয্যে ঢেকে না পড়া মুখোশ উপরে ফেলে মনস্তাত্ত্বিক দৈনতাকে প্রকট করতে? বিবাহ কেবল শারীর স্পর্শ করে না, মনেরও যে মিলন দাবি করে! স্নেহা আর সায়নের গল্পের আগে শতাব্দী প্রাচীন রবীন্দ্র কাহিনীতে চলুক তার প্রেক্ষাপট অন্বেষণ| সমাজ যে আজও বদলায়নি, তাদের না বলা গল্প সে কথাই মনে করিয়ে দেয়……

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (Rabindranath Tagore) ‘স্ত্রীর পত্র’ রচনার পটভূমি বুঝতে গেলে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার বাংলার একটি মর্মান্তিক ঘটনার দিকে ফিরে তাকানো প্রয়োজন। ১৯১৪ সালের জানুয়ারিতে কলকাতায় স্নেহলতা মুখোপাধ্যায় নামে এক কিশোরীর আত্মহননের ঘটনা তৎকালীন সমাজে গভীর আলোড়ন তুলেছিল। বিবাহের যৌতুকের বিপুল দাবি মেটাতে গিয়ে তাঁর পরিবার আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছিল। পরিবারের সেই অসহায় পরিস্থিতি এবং বাবার দুরবস্থার কথা ভেবেই স্নেহলতা নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন বলে সমকালীন সংবাদপত্র ও পরবর্তী গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ঔপনিবেশিক বাংলার বিবাহপ্রথা, যৌতুকের নিষ্ঠুরতা এবং নারীর অসহায় সামাজিক অবস্থান নিয়ে বিস্তৃত বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। ব্যথিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ!


এই ঘটনার অভিঘাত বাংলা সাহিত্য ও বুদ্ধিজীবী মহলেও অনুভূত হয়েছিল। রবীন্দ্র গবেষণায় প্রেক্ষাপট অন্বেষণ ইতিহাস এবং দর্শনের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন| স্নেহলতার মৃত্যুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ১৯১৪ সালে রচিত ‘স্ত্রীর পত্র’, ‘হৈমন্তী’ ও ‘অপরিচিতা’ গল্পগুলির বিষয়গত সম্পর্ক রবীন্দ্রনাথের সমাজ চেতনাকে স্পষ্ট করে। বিশেষত ‘স্ত্রীর পত্র’-এর বিন্দুর মর্মান্তিক পরিণতির সঙ্গে স্নেহলতার জীবনের শেষ অধ্যায়ের একটি তাৎপর্যপূর্ণ সাদৃশ্য রয়েছে। তবে বিন্দু স্নেহলতার সরাসরি প্রতিরূপ, কিংবা এই একটি ঘটনাই গল্পটির একমাত্র প্রেরণা, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো অকাট্য প্রমাণ নেই। বরং বলা যায়, সমকালীন সমাজে নারীর জীবনকে ঘিরে যে বৈষম্য, নির্যাতন ও অসহায়তা প্রকট হয়ে উঠেছিল, স্নেহলতার ঘটনা তারই এক মর্মস্পর্শী প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

Image: AI নির্মিত

এই ঐতিহাসিক পটভূমিতে মৃণাল ও বিন্দুর সম্পর্ককে নতুন তাৎপর্যে উপলব্ধি করা যায়। বিন্দুর জীবনে, নারীর ইচ্ছা, নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদার চেয়ে পারিবারিক সম্মান এবং প্রচলিত বিধিনিষেধকে বেশ প্রকট বলে মনে হয়। তার জীবনের বিপর্যয় মৃণালকে নিজের অবস্থান সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। বিন্দুর যন্ত্রণা প্রত্যক্ষ করে মৃণাল উপলব্ধি করে, যে সংসারকে এতদিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য পরিসর বলে মেনে নিয়েছিল, সেই সংসারই নারীর স্বাধীন সত্তাকে অস্বীকার করতে পারে। হয়তো মৃণালের চরিত্রের মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ স্নেহলতার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নিজের প্রতিবাদী সত্তাকেই ফুটিয়ে তুলেছেন।

‘স্ত্রীর পত্র’ তাই হয়ে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের সময়ের সামাজিক সংকটের বিরুদ্ধে এক সাহিত্যিক প্রতিবাদ। স্নেহলতার মর্মান্তিক পরিণতি এবং বিন্দুর ট্র্যাজেডির মধ্যে যে ঐতিহাসিক ও মানবিক যোগসূত্র দেখা যায়, তা গল্পটির তাৎপর্যকে আরও গভীর করে। রবীন্দ্রনাথ মৃণালের কণ্ঠে এমন এক নারীর আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছেন, যে অন্যায়কে নিয়তি বলে মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্বের স্বাধীন মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথ বেছে নেয়।মৃণালের সংসারিক পরিচয়ে সে মেজোবউ হলেও তার অস্তিত্ব সেই পরিচয়ের গন্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সমাজের অংশ হয়ে উঠেছে। তার নিজস্ব প্রতিভা, চিন্তা ও অনুভূতির জগৎ রয়েছে, যা পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে রয়ে গিয়েছে চির অজ্ঞাত। কবিতার জগৎ তাকে সেই স্বাধীনতা দিয়েছে, যা বাস্তব সংসারে সে কখনোই সম্পূর্ণভাবে অর্জন করতে পারেনি। ফলে তার কবিসত্তা হয়ে উঠেছে আত্মমুক্তির প্রতীক।

আরও পড়ুন: রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা, পর্ব ৩: সুন্দরী ইন্দ্রাণীর ‘প্রতিহিংসা’

স্বাধীন বুদ্ধি ও কবিপ্রবণতার পাশাপাশি মৃণালের মধ্যে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার সাহস। প্রচলিত সামাজিক মতামতকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা তার স্বভাব নয়। সে নিজের বিচারবোধের উপর আস্থা রাখে এবং সেই বিশ্বাস থেকেই পরিবারের বিরোধিতা সত্ত্বেও বিন্দুকে আশ্রয় দেয়। বিন্দুর জীবনের সঙ্গে মৃণালের এই সংযোগ গল্পের মূল বক্তব্যকে আরও গভীর করে তুলেছে।বিন্দু এক অসহায়, নিরাশ্রয় মেয়ে। বিধবা মায়ের মৃত্যুর পর আত্মীয়দের অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে সে আশ্রয় নিয়েছিল দিদির বাড়িতে।

কিন্তু সেখানে তার উপস্থিতিও যেন পরিবারের কাছে এক অনাকাঙ্ক্ষিত বোঝা। মৃণাল এই অবহেলার মধ্যে উপলব্ধি করেছিল আশ্রয়হীনতার যন্ত্রণা। তার বক্তব্য, ‘বিধবা মার মৃত্যুর পরে আমার বড়ো জায়ের বোন বিন্দু তার খুড়তুতো ভাইদের অত্যাচারে আমাদের বাড়িতে তার দিদির কাছে এসে যেদিন আশ্রয় নিলে, তোমরা সেদিন ভাবলে, এ আবার কোথাকার আপদ। আমার পোড়া স্বভাব, কী করব বলো—দেখলুম, তোমরা সকলেই মনে মনে বিরক্ত হয়ে উঠেছ; সেইজনেই এই নিরাশ্রয় মেয়েটির পাশে আমার সমস্ত মন যেন একেবারে কোমর বেঁধে দাঁড়ালো। পরের বাড়িতে পরের অনিচ্ছাতে এসে আশ্রয় নেওয়া—সে কত বড়ো অপমান। দায়ে পড়ে সেও যাকে স্বীকার করতে হলো তাকে কি এক পাশে ঠেলে রাখা যায়।’

বিন্দুর জীবন ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ নারীর সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে এক গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। মৃণাল বিন্দুর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়েছে ভালোবাসার স্বাভাবিক প্রবণতায়| এই ভালোবাসা কোনও সামাজিক অচলায়তন মানে না। বিন্দুর দুর্দশা তাকে বুঝিয়েছে, সামাজিক বিধিনিষেধের নামে নারীর জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা কতটা নির্মম হতে পারে। ফলে বিন্দুর কাহিনি মৃণালের আত্মোপলব্ধিকে আরও তীব্র করেছে এবং তার বিদ্রোহকে দিয়েছে মানবিক গভীরতা।

Image: Social Media

শেষ পর্যন্ত ‘স্ত্রীর পত্র’ গল্পে একটি নারীর স্বাতন্ত্র সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে । মৃণালের ব্যক্তিত্ব, কবিসত্তা, যুক্তিবোধ এবং বিন্দুর প্রতি তার মমত্ববোধ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নারীমুক্তির এক সুস্পষ্ট ধারণা নির্মাণ করেছে। তার প্রতিবাদে ব্যক্তিগত অভিমান যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে বৃহত্তর সমাজের প্রতি প্রশ্ন। কেন? নারীর প্রতি সমাজের কেন এই বৈষম্য মূলক আচরণ? এই কারণেই মৃণালের বিদ্রোহ হয়ে ওঠে সেই সমস্ত নারীর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রতীক, যাদের জীবনকে সমাজ দীর্ঘকাল ধরে অবহেলা ও নিয়ন্ত্রণের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখতে চেয়েছে।

আরও পড়ুন: রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা, পর্ব ২: ‘সুভা’র চুপকথা

এতদুর লিখে ডায়রির পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা দেখে থামল স্নেহা| মনের কোন জটিল সমীকরণে মন খারাপ হলে সে প্রবন্ধ লেখে| হোয়াইট কলার কর্পোরেট জব, এই মোড়কে সে ঢেকে ফেলতে চায় আসল কারণ| সব থাকলে কি কিছু চাইতে নেই? অর্থ নয়, ক্ষমতার দাম্ভিক প্রকাশ নয়, সে চায় একটা পরিচয়| বাড়ির মেজো বউ হয়ে বেঁচে থাকার জন্য জীবনে এতগুলো সাপ লুডোর সিঁড়ি পেরিয়ে আসেনি সে| তাই পরিচয়কে আঁকড়ে ঘর বাঁধবে বলেই ঘর ছেড়েছে সে| এই কবরখানায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মৃত সৈনিকদের কবর রয়েছে|

এরমধ্যে হাতরে হাতরে মহিলা মেডিকদের নাম খোঁজে স্নেহা| কবরগুলো ভেঙে চুরে দুমড়ে গিয়েছে| চোরাচালানকারীরা মাটি খুড়ে পাশ দিয়ে মৃতদেহগুলো হয়তো কবে বিক্রি করে দিয়েছে এনাটমির ক্লাসে| পরিচয় জানানো নামের ফলকগুলো ধুলিস্যাৎ করেছে সময় | তবু খুঁজতে থাকে স্নেহা| দেশের গৌরব রক্ষায় যারা প্রাণ দিল, তাদের মধ্যে নারী সেনাদের পরিচয় কেউ লেখে না! তাই রবীন্দ্রনাথের মৃণাল সেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে চিৎকার করে বলতে চায়, প্রগতির এই এই যাত্রায় শরীক আমরাও! শুনতে পাচ্ছো সায়ন? তোমাদের পদবীর ভাগীদার হয়েছি আমিও, স্বেচ্ছায় | আমাকে আমার পরিচয় নিয়ে বাঁচতে দাও!…..

‘হ্যালো, বলো স্নেহা!সব ঠিক আছে তো? ওষুধ খেয়েছো? অফিসে না বাড়িতে?’

যন্ত্র মানবের মতো কথা বলে যায় সায়ন | যেমন সূর্য উঠে প্রতিদিন পূর্ব পরিকল্পনা মতো পূর্বেই!

‘কাঁদছো কেন? শরীর ঠিক আছে?’

বৃষ্টি নামল ঝমঝমিয়ে| ডাইরি ব্যাগে পুরে ছুটে গিয়ে কাছেই একটা কফি শপে আশ্রয় নিল স্নেহা| ঝাপসা চোখ ঢেকে গেল অসময়ের বৃষ্টিতে| ফোনে তখনও বাড়ির কর্তা তাদের মেজো বউকে খুঁজে চলেছে|

দেখুন:<iframe width=”560″ height=”315″ src=”https://www.youtube.com/embed/WBXPWleJUWk?si=v2WRxrWnVanLcmt6″ title=”YouTube video player” frameborder=”0″ allow=”accelerometer; autoplay; clipboard-write; encrypted-media; gyroscope; picture-in-picture; web-share” referrerpolicy=”strict-origin-when-cross-origin” allowfullscreen></iframe>