বয়স তিনকুড়ি দশ পেরোলেও ভুবনমোহনের রাতে ঘুমের ওষুধ লাগে না। এক ঘুমেই রাত কাবার হয়ে যায়। বাড়ির পাশেই হালে ছোটদের একটা স্কুল হয়েছে। সকাল থেকেই রিক্সো আর গাড়ির ঐকতানে পাড়া সরগরম হয়ে ওঠে। আশালতা ঘুমের ওষুধ খায় রোজ। মতির মা বেল না দেওয়া পর্যন্ত আশালতার ঘুম ভাঙে না। কয়েক বছর হলো ভুবনমোহন বাড়ি বদলেছেন নতুন পাড়া, নতুন পাড়াপড়শি। ভুবনমোহনের এই প্রথম বাড়ি বদলানো। আসার সময় কিছু বই সঙ্গে নিয়েছিলেন যার মধ্যে রমাপদবাবুর ‘বাড়ি বদলে যায়’ বইটাও ছিল। দরজায় তালা দেওয়ার সময় পুরোন ল্যান্ড ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠেছিল ধরা হয়নি।
ভুবনমোহনের সকালে হাঁটার অভ্যেস নেই। কিছুটা এলোমেলো চিন্তা শেষ হতে না হতেই সকাল বেশ জাঁকিয়ে বসে। ভুবনমোহন রোজই থোলে হাতে বাজারে যান। ভুবনমোহন অন লাইনে এখনও তেমন রপ্ত হতে পারেননি। দূর দূরান্ত থেকে বেচাকেনা করতে আসে একদল মানুষ। একটা অলিখিত আত্মীয়তা গড়ে ওঠে। মুখচেনা থেকে এক সময় তারা হয়ে ওঠে চেনামুখ। চোখের সামনে কত যে পরিবর্তন হয়ে গেল। সুকুর চায়ের দোকানে সব খবর পাওয়া যায়। পৃথিবীটা ছোট হতে হতে বোকাবাক্সয় নয়, আসলে চায়ের দোকানে বন্দি।
নতুন বাড়ির অদূরেই একটি রেল স্টেশন। দক্ষিণের এই লাইনটি ঢাকুরিয়া লেকের পাশ দিয়ে গঙ্গার দিকে চলে গিয়েছে। এই সেই ঢাকুরিয়া লেক ফেলুদার ইংলিশ চ্যানেল। লাইনটার একটা ইতিহাস আছে। দিগ্বিজয়ী বিবেকানন্দ একদিন এই রেলপথ ধরেই শহরে প্রবেশ করেছিলেন। কত তার রোমাঞ্চকর বিবরণী। ভুবনমোহন fictionalized history র বড় ভক্ত।
ভুবনমোহন গাড়িতেই যাতায়াত করেন। ওভারব্রিজ পেরিয়ে সাদার্ন এভিনিউয়ের চৌমাথার অতিব্যস্ত মোড়টা পার হওয়া খুব সোজা নয়। এই চৌমাথাতেই ভুবনমোহনের এক নতুন অভিজ্ঞতা হলো। ভুবনমোহন যাতায়াতের পথে ভালোভাবে লক্ষ্য করেছেন। অনেকগুলো পরিবারের অস্থায়ী ঠিকানা এই চৌমাথা। প্রহরে প্রহরে এদের ঘর বদল হয়। সকালে পশ্চিমপ্রান্তে তো বিকেলে পূর্বপ্রান্তে। আধুনিক যাযাবর। ভুবনমোহন নিশ্চিত যে ‘বাড়ি বদলে যায়’ লেখার সময় রমাপদবাবু এঁদের দেখেননি।
এদের দেখতে দেখতে ভুবনমোহনের বাড়ি বদলের দুঃখ এখন অনেকটা বিলাসে পরিণত হয়েছে। চৌমাথায় বাস করা পরিবারগুলোর বৈচিত্রও কম নয়। সদ্যজাত থেকে অতিবৃদ্ধ নানান বয়সের সদস্যদের নিয়ে এক চলমান সংসার। এঁদের সঙ্গে অদ্ভুত এক সহাবস্থানে আছে আবার একদল বৃহন্নলা। ভুবনমোহনের মনে পরে যায় মহাভারতের অর্জুনের সেই কাহিনি। লাল আলোয় গাড়ি দাঁড়ালেই এরা দল বেঁধে ছুটে আসে। নয় জানলায় হাতপাতা, না হলে বন্ধ কাচে টোকা দেওয়া। দিনের শেষে হয়তো মেলাতে বসে চাওয়া-পাওয়ার হিসেব।
ভুবনমোহন রোজই এসব লক্ষ্য করেন। দিনে দিনে পরিবারগুলো যেন কেমন আপন হয়ে উঠছে তাঁর। প্রথম বছর থেকেই এদের পুজোর সময় জামাকাপড় দেওয়া শুরু করেছেন। বাচ্চাগুলোর সঙ্গে ভুবনমোহনের বেশ ভাব হয়ে গেছে। একটি লাবণ্যময়ী কিশোরী এদের সামলায়। নামটি যে শকুন্তলা সেটা ওর মার ডাকাডাকিতেই জেনে গেছেন। বিত্তের মাঝে জন্ম নিলে আজ বেণী দুলিয়ে তার স্কুলে যাওয়ার কথা। মেটান বলেই ভুবনমোহনের কাছে সে মাঝেমাঝেই নানান দাবি জানিয়ে যায়। দেখতে দেখতে আবার পুজো এসে গেলো।
ভুবনমোহন ক’দিন ধরে ভালো করে বাচ্চাগুলোকে দেখতে থাকেন। বাড়ন্ত বয়েস। জামার সাইজগুলো ভালো করে দেখে নিতে হবে। শকুন্তলা রোজই এসে একবার করে দাঁড়ায়। শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মুখে চোখেও একটা যেন পরিবর্তন হয়েছে। সলজ্জ হাসিটা একটু অন্যরকম। ভুবনমোহন অনুমান করেন বয়ঃসন্ধি। শকুন্তলা আর কিশোরী নেই। ক’দিন ধরে ভুবনমোহন দেখছেন মেয়েটি কী যেন বলতে চায়। পথচলতি এই দাদুই বোধহয় তাঁর একান্ত আপনজন। পর পর কয়েকটা দিন কেটে গেল। রোজই ভুবনমোহন জিজ্ঞেস করেন, ‘কী রে কিছু বলবি?’ রোজই উত্তর শোনার আগেই সবুজ আলোয় গাড়ি ছুটতে থাকে।
সেদিন ছিল শনিবার। ভুবনমোহন আজ হাঁটাপথে রেললাইন পার হয়ে কালিবাড়ি যাবেন। চৌমাথার কাছে আসতেই শকুন্তলা তাকে দেখতে পেয়েছে। ছুট্টে রাস্তা পার হয়ে চলে আসে পূবদিকে। ভুবনমোহন শকুন্তলাকে দেখে খুশি হলেন। শকুন্তলা চুপ করে দাঁড়িয়ে। কী যেন বলবে। ভুবনমোহন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী রে? কিছু বলবি?’ শকুন্তলা বললো, ‘শোনো না দাদু, আমাকে এবার পুজোয় জামা দিতে হবে না। আগের বারেরটা বড় ছিল। মা রেখে দিয়েছে। এবার পরবো’। ভুবনমোহন বললেন, ‘তুই এটা বলার জন্যে দৌড়ে এলি?’ শকুন্তলা মাথা নাড়লো।
তারপর বললো, ‘আমাকে একটা জিনিস কিনে দেবে?’ ভুবনমোহন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী জিনিস রে?’ শকুন্তলা বারবার তাকাচ্ছে আর চোখ নামিয়ে নিচ্ছে। ভুবনমোহন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী চাই বল?’ শকুন্তলা মুখ তুললো না। আস্তে আস্তে বললো, ‘প্রতিমাসে আমার খুব কষ্ট হয়। জানোতো সারাদিন আমায় কত দৌড়দৌড়ি করতে হয়। ‘ভুবনমোহন বললেন, ‘সে তো তুই ছোট বেলা থেকেই করছিস।’ শকুন্তলা এবার মুখ তুলে তাকালো, ‘দূর তুমি কিছু বোঝ না। আমি বড় হয়ে গেছি না! ওই সময়ে আমার খুব অসুবিধে হয়। দাওনা দাদু আমাকে একটা ওই প্যাকেট কিনে। ওই ওষুধের দোকানে পাওয়া যায়।’ ভুবনমোহন মুহূর্তকাল চুপ করে রইলেন।
শকুন্তলা কী চাইছে তিনি আন্দাজ করতে পারলেন। ভুবনমোহন শকুন্তলার কাঁধে একটা হাত রেখে বললেন, ‘মাকে বলিসনি কেন কিনে দিতে?’ শকুন্তলা ছিটকে উঠে একটু পিছিয়ে গেল তুমি কি পাগল? মা মেরে ফেলবে আমায়। দাও না দাদু একটা কিনে। সতুপিসি বলেছে ওর বাক্সে রেখে দেবে।’ ভুবনমোহন তাঁর দীর্ঘ জীবনে এমন পরিস্থিতিতে কখনও পড়েননি। শকুন্তলার মাথায় একটা টোকা মেরে তিনি চৌমাথার দিকে এগিয়ে গেলেন। নাঃ, আজ আর মহাকালীর পুজো দেওয়া হবে না। আকস্মিক এই নিত্যকালীর আবির্ভাবে তার সব হিসেব যেন তালগোল পাকিয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা,পর্ব ৬: রবীন্দ্রনাথের ‘মাল্যদান’ এবং টেস্টটিউব চিঠির গল্প
ভুবনমোহন হাঁটতে হাঁটতে চৌমাথাটা পেরিয়ে গেলেন। পেট্রোল পাম্পটার পরেই একটা ওষুধের দোকান। ভুবনমোহন দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালেন। একবার আড়চোখে ভিতরটা দেখে নিলেন কেউ আছে কী না। না, তেমন কেউ নেই। কাউন্টারে একটা কম বয়সি ছেলে দাঁড়িয়ে মোবাইল দেখছে। ভুবনমোহন নিশ্চিন্ত হয়ে দুটো সিঁড়ি ভেঙে দোকানে প্রবেশ করলেন। এতখানি বয়স হলো – সেই কবে থেকে কতজনের জন্যে যে পুজোর উপহার কিনেছেন তার ঠিক নেই। পুজোর উপহার কিনতে জীবনে আজ প্রথম তিনি কোন ওষুধের দোকানে ঢুকলেন। একটু হাসিও পেল। সংসার সত্যিই অতীব বিচিত্র।
ভুবনমোহন দেরি করলেন না একবার র্যাকগুলোর ওপর দিকে তাকিয়ে টিভির বিজ্ঞাপনে দেখা একটা পরিচিত নাম সহজেই বলে ফেললেন। ছেলেটি কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে চট করে পেছন ফিরে সরু কাঠের সিঁড়ি বেয়ে তরতরিয়ে ওপরে উঠে গেল। ভুবনমোহনের বাঞ্ছিত জিনিসটা চটজলদি একটা প্যাকেটে পুরে এগিয়ে দিতে দিতে বললো, ‘বিল লাগবে?’ ভুবনমোহন টাকা হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিলেন। বললেন, ‘না।’ ফেরতের টাকাটা কোনও রকমে হাতে নিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে ভুবনমোহন দোকান থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি জানেন ছেলেটা তাঁর দিকে এখনও নিশ্চয়ই তাকিয়ে আছে। তিনি পা চালিয়ে চৌমাথার মোড়ে চলে এলেন।
বড্ড ব্যস্ত মোড়। গাড়িগুলো দ্রুত গতিতে বেরিয়ে যাচ্ছে। একটু ফাঁকা হতেই ভুবনমোহন সামনে তাকালেন। চৌমাথার পূর্বদিকে চোখ পরতেই দেখলেন শকুন্তলা তার হাতের প্যাকেটের দিকেই হাসিমুখে তাকিয়ে। ভুবনমোহন তাঁর অজান্তেই প্যাকেট সমেত হাতটা একবার ওপরে তুলে আবার নামিয়ে নিলেন। আকাশে তখন নিম্নচাপের ভ্রুকুটি। ভুবনমোহন একবার আকাশের দিকে তাকাতেই তাঁর বাইফোকাল চমশার দূরে দেখার কাচের ওপর দু’ফোঁটা জল এসে পড়লো। আবার একবার সামনে তাকালেন। জল পড়ে দূরের জিনিস কেমন ঝাপসা দেখাচ্ছে। আবছা আলোয় দেখলেন আধুনিক শকুন্তলা ততক্ষণে তার ভাইকে কোলে নিয়ে একটা বড় গাড়ির বন্ধ জানলায় টোকা দিচ্ছে।
দেখুন:<iframe width=”560″ height=”315″ src=”https://www.youtube.com/embed/uyo957E6CjI?si=gvtYgB-XBXOzqWZA” title=”YouTube video player” frameborder=”0″ allow=”accelerometer; autoplay; clipboard-write; encrypted-media; gyroscope; picture-in-picture; web-share” referrerpolicy=”strict-origin-when-cross-origin” allowfullscreen></iframe>