NEP রূপায়ণে রাজ্যে টাস্ক ফোর্স, চার বছরের স্নাতক থেকে শিল্পমুখী পাঠ্যক্রমে জোর

Image: ANI

জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) -কে উচ্চশিক্ষায় কার্যকর করতে বিশেষ টাস্ক ফোর্স গড়ল রাজ্য সরকার। ২০ আগস্ট উচ্চশিক্ষা দপ্তর থেকে একটি নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। সেই নির্দেশিকা অনুসারে ‘স্টেট-লেভেল NEP ২০২০ ইমপ্লিমেন্টেশন টাস্ক ফোর্স’ (Task Force)-কে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে সংস্কারের মূল সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের ৩১টি স্টেট-এইডেড বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৫০০-র বেশি সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজে NEP রূপায়ণের ক্ষেত্রে এই টাস্ক ফোর্স (Task Force) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে মনে করা হচ্ছে।

শুধু পাঠ্যক্রম বদল নয়, উচ্চশিক্ষাকে আরও বহুমুখী, নমনীয় এবং কর্মমুখী করে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। চার বছরের স্নাতক পাঠক্রম, পড়াশোনায় একাধিক বার প্রবেশ ও বেরিয়ে আসার সুযোগ, ‘অ্যাকাডেমিক ব্যাঙ্ক অফ ক্রেডিট’ (ABC), শিল্প সংস্থার সঙ্গে ইন্টার্নশিপ এবং এক বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ার অন্য প্রতিষ্ঠানে ক্রেডিট স্থানান্তরের মতো ব্যবস্থাকে বাস্তবায়িত করবে টাস্ক ফোর্স (Task Force)।

টাস্ক ফোর্সের (Task Force) উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন NEP ২০২০-এর রিভিউ কমিটির চেয়ারম্যান এবং আইআইএম কলকাতার বোর্ড অফ গভর্নর্সের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জগদেশ কুমার। একাডেমিক নেতৃত্বে রয়েছেন ন্যাশনাল এডুকেশনাল টেকনোলজি ফোরামের চেয়ারম্যান অধ্যাপক অনিল ডি সাহস্রবুদ্ধে, NIEPA-র উপাচার্য অধ্যাপক শশীকলা ওয়াঞ্জারি, নীতি আয়োগের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ড. রাজীব কুমার সেন, আইআইটি খড়্গপুরের ডিরেক্টর অধ্যাপক সুমন চক্রবর্তী-সহ কলকাতা, প্রেসিডেন্সি, কল্যাণী এবং মাকাউট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যেরা।


চার বছরের স্নাতক

স্নাতক স্তরে চার বছরের কাঠামোকে আরও সুসংহত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে টাস্ক ফোর্সকে(Task Force)। পড়ুয়ারা যাতে নির্দিষ্ট পর্যায়ে কোর্স ছেড়ে বেরিয়ে গেলেও স্বীকৃত যোগ্যতা পান এবং পরে ফের পড়াশোনায় ফিরতে পারেন, সেই ‘মাল্টিপল এন্ট্রি-মাল্টিপল এক্সিট’ ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে বিভিন্ন কলেজে পাঠ্যক্রমের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে অভিন্ন মাল্টিডিসিপ্লিনারি ইলেকটিভের ব্যবস্থা এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাঠক্রমের মধ্যে সংযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। ক্রেডিট ট্রান্সফারের মাধ্যমে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়ার ভর্তি আরও সহজ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

পড়াশোনার সঙ্গে শিল্পের সরাসরি যোগ

উচ্চশিক্ষাকে চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। টাস্ক ফোর্সে (Task Force) শিল্পমহলের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেঞ্চুরি প্লাইবোর্ডসের চেয়ারম্যান পদ্মশ্রী সাজ্জন ভজনকা, সেনকো গোল্ডের ডিরেক্টর সুবঙ্কর সেন এবং বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির শিক্ষা ও আইটি কমিটির সদস্য তথা উইজারটেক ইনফরমেটিক্সের সিইও ড. চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য রয়েছেন এই অংশে।

আরও পড়ুন: নিউ মার্কেটের হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে মৃত আরও ২ বাংলাদেশির পরিচয় শনাক্ত

শিল্প সংস্থার সঙ্গে ইন্টার্নশিপের জন্য সমঝোতা, শিক্ষানবিশিকে ক্রেডিটের আওতায় আনা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতি চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী পাঠ্যক্রম বদলের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, শুধু ডিগ্রি নয়, পড়াশোনা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে ঢোকার জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব দক্ষতা তৈরিই হবে অন্যতম লক্ষ্য।

বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ছোট কলেজের ‘মেন্টরশিপ’

রাজ্যের তুলনায় পিছিয়ে থাকা বা ছোট কলেজগুলিকে এগিয়ে নিতে ‘ইনস্টিটিউশনাল মেন্টরিং’-এর পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রিমিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলি ছোট রাজ্য কলেজের সঙ্গে মেন্টর-ম্যান্টি সম্পর্ক তৈরি করবে। গবেষণা পরিকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ, প্রশাসনিক দক্ষতা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং NAAC/NBA-র প্রস্তুতির মতো ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। শিক্ষকদের নতুন ধরনের ক্রেডিট-ভিত্তিক ও ফলাফল-কেন্দ্রিক শিক্ষাপদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

চারটি ওয়ার্কিং গ্রুপ

টাস্ক ফোর্সের (Task Force)সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য চারটি স্থায়ী ওয়ার্কিং গ্রুপ তৈরি করা হবে—

কারিকুলাম অ্যান্ড ক্রেডিট ফ্রেমওয়ার্ক, টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন, ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারশিপ অ্যান্ড ইন্টার্নশিপস এবং ইনস্টিটিউশনাল মেন্টরিং অ্যান্ড ফ্যাকাল্টি ডেভেলপমেন্ট।

প্রথমটির মূল কাজ হবে মাল্টিডিসিপ্লিনারি পাঠ্যক্রম, ABC এবং একাধিক প্রবেশ-বহির্গমনের নিয়ম তৈরি করা। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ারিং ও পলিটেকনিক পাঠ্যক্রমের সঙ্গে দক্ষতা-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষানবিশির সংযোগ ঘটানো হবে। শিল্প-ভিত্তিক গ্রুপ ইন্টার্নশিপ ও শিক্ষানবিশির কাঠামো তৈরি করবে। আর মেন্টরিং গ্রুপের লক্ষ্য হবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সক্ষমতা বাড়ানো।

তিন ধাপে NEP রূপায়ণ

NEP বাস্তবায়নের কাজ এক ধাক্কায় না করে তিনটি পর্যায়ে করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে-

প্রথম পর্যায়ে ‘ফাউন্ডেশন’— বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি ও আইনগত কাঠামোর প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজে চার বছরের স্নাতক কাঠামো চালু এবং সচিবালয় ও ওয়ার্কিং গ্রুপ তৈরি।

দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘এক্সপ্যানশন’— পাঠ্যক্রম সংশোধন, মাল্টিডিসিপ্লিনারি ইলেকটিভ, শিল্পমুখী পাঠক্রম, ইন্টার্নশিপ-ক্রেডিটের নিয়ম এবং রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ABC চালুর উপর জোর।

তৃতীয় পর্যায়ে ‘কনসলিডেশন’— পড়ুয়ার ক্রেডিটের পূর্ণাঙ্গ আন্তঃপ্রতিষ্ঠানিক চলাচল, মেন্টরশিপ কর্মসূচির ফলাফল পর্যালোচনা এবং NAAC/NBA-র প্রস্তুতি যাচাই।

আরও পড়ুন: সোমালিয়া-ইয়েমেন উপকূলে জলদস্যুর হামলা, ৬ ভারতীয় নাবিক-সহ ১০ জন অপহৃত

নজরে থাকবে বাস্তবায়নের বাধাও

NEP বাস্তবায়নে রাজ্যের সব প্রতিষ্ঠান সমান ভাবে প্রস্তুত নয়— সেই বিষয়টিও নির্দেশিকায় স্পষ্ট ভাবে স্বীকার করা হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নতুন ক্রেডিট-ভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতিতে অভ্যস্ত না হওয়া, ক্রেডিট স্বীকৃতি নিয়ে জটিলতা, শিল্প সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি, প্রশাসনিক সমস্যা এবং বাজেটের সীমাবদ্ধতার মতো সম্ভাব্য বাধা চিহ্নিত করে তার মোকাবিলার ব্যবস্থাও করবে টাস্ক ফোর্স।

এই টাস্ক ফোর্সকে (Task Force) প্রয়োজন অনুযায়ী আরও উপ-কমিটি তৈরি এবং অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞকে যুক্ত করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। বছরে অন্তত চার বার বৈঠক করার কথা রয়েছে। উচ্চশিক্ষা দপ্তর টাস্ক ফোর্সকে(Task Force) প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও লজিস্টিক সহায়তা দেবে এবং টাস্ক ফোর্স (Task Force)নিয়মিত অগ্রগতির রিপোর্ট ও সুপারিশ রাজ্য সরকারের কাছে জমা দেবে।

ফলে, রাজ্যে NEP ২০২০ বাস্তবায়ন এবার শুধু নীতিগত ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, প্রশাসন এবং শিল্পমহলকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে ধাপে ধাপে তা কার্যকর করার উদ্যোগ নিল রাজ্য সরকার।

দেখুন: অটো-ট্যাক্সি চালকদের মারাঠি শেখাতে অভিযান, বিনামূল্যে ক্লাসের ব্যবস্থা মহারাষ্ট্র সরকারের