কলকাতার ভাঙা রাস্তা, জলযন্ত্রণা ও বিপজ্জনক উড়ালপুল নিয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা

Image: AI নির্মিত

বৃষ্টিতে ডুবে যায় রাস্তা। জলের নীচে লুকিয়ে থাকে মরণফাঁদ। কোথাও হাঁটুসমান জল তো কোথাও আবার বিশাল গর্ত। ভাঙা রাস্তা এড়াতে গিয়ে যানজট, দুর্ঘটনা, গাড়ির ক্ষতি। আর তার মধ্যে স্কুলপড়ুয়া, প্রবীণ, রোগী, অফিসযাত্রী থেকে জরুরি পরিষেবার গাড়ি প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে শহরবাসীকে। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার এই দীর্ঘস্থায়ী নাগরিক দুর্ভোগ এবার পৌঁছেছে কলকাতা হাইকোর্টের দরজায়।

কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী পুর এলাকাগুলির রাস্তা, উড়ালপুল, সেতু এবং নিকাশি ব্যবস্থার বেহাল দশা নিয়ে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। মামলাকারীর বক্তব্য, বিষয়টি নিছক নাগরিক দুর্ভোগ বা রাস্তার গর্তের সমস্যা নয়। নিরাপদে চলাচল এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকারও এর সঙ্গে জড়িত। সেই কারণে বিষয়টি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১-এ সুরক্ষিত জীবনের অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলেই দাবি করা হয়েছে।

মামলার নথিতে ৩ অগস্ট ২০২৫ সালের প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, উত্তর দমদম পুর এলাকার জলমগ্ন পরিস্থিতিতে পাঁচ মাসের এক শিশুর মৃত্যু ঘটে। বৃষ্টির জল জমে থাকার কারণে একটি বাড়ির ভিতরেই ঘটে সেই মর্মান্তিক ঘটনা।


মামলাকারীর বক্তব্য, একটি শিশুর মৃত্যু কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলে জলনিকাশি, রাস্তার অবস্থা এবং নাগরিক পরিকাঠামোর দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা একসঙ্গে মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

ইএম বাইপাস থেকে ডায়মন্ড হায়বার রোড, বিশ্ব বাংলা সরণী থেকে বিটি রোড মামলায় একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ, বহু জায়গায় রাস্তার উপর গভীর গর্ত, ভাঙা পিচ, জল জমে থাকা এবং বারবার ব্যর্থ হওয়া জোড়াতালির মেরামতি এখন নিত্যদিনের চিত্র।

মামলায় বিশেষভাবে ইএম বাইপাসের ভিআইপি বাজার, রুবি, চিৎকালিকাপুর, অজয়নগর, হাইল্যান্ড পার্ক এবং আম্বেদকর ব্রিজ-এর সংলগ্ন অংশের কথা বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে আনন্দপুর, মুকুন্দপুর, পূর্বালোক, নেতাই নগর, কালিকাপুর ও মাদুরদহ-সহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তার দুরবস্থার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগ, কোথাও মেরামতির কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ফের গর্ত তৈরি হচ্ছে। বর্ষার জলে সেই গর্ত ঢাকা পড়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বাড়ছে।

কলকাতার তথ্যপ্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডর নিউ টাউন থেকে সেক্টর ৫, চিংড়িঘাটা, ইএম বাইপাস ও গড়িয়ার পথ নিয়েও মামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মামলার নথি অনুযায়ী, বৃষ্টি হলে বিশ্ব বাংলা গেট থেকে নবদিগন্ত ফ্লাইওভার পর্যন্ত একাধিক জায়গায় জল ও গর্তের কারণে যানবাহনের গতি কার্যত থমকে যায়। সায়েন্স সিটি, পি. সি. চন্দ্র গার্ডেন্স, হাইল্যান্ড পার্ক ও চিংড়িঘাটা অঞ্চলেও জল জমে রাস্তার গর্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

এর প্রভাব শুধু যানজটে সীমাবদ্ধ নয়। অফিস থেকে রাতের শিফট শেষে বাড়ি ফেরার পথে বহু মানুষকে দীর্ঘ সময় রাস্তায় আটকে থাকতে হয়। এমন অভিযোগও মামলায় উঠে এসেছে। ডায়মন্ড হারবার রোড-এর মমিনপুর-খিদিরপুর অংশের কথাও মামলায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ, রাস্তার গর্ত, খোলা ম্যানহোল, বৃষ্টির জল এবং ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে স্কুলপড়ুয়াদের প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

মামলাকারীর বক্তব্য, যে রাস্তায় প্রতিদিন শিশুদের স্কুলে যাওয়া-আসা, সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের মৌলিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। শুধু মাটির রাস্তা নয়, একাধিক উড়ালপুল ও সেতুর অবস্থাও মামলায় তুলে ধরা হয়েছে। ঢাকুরিয়া ব্রিজ, যাদবপুর-আনওয়ার শাহ কনেক্টর, গড়িয়াহাট ফ্লাইওভার, শিয়ালদহ ব্রিজ এবং এজেসি বোস রোড ফ্লাইওভার-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

মামলার অভিযোগ, কোথাও পিচ উঠে গিয়ে গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও মেরামতির পরও দ্রুত রাস্তা ফের ভেঙে পড়েছে। ফলে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে। কলকাতার পাশাপাশি হাওড়ার রাস্তার অবস্থাও মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ডবসন রোড, জিটি রোড, হাওড়া ময়দান, পঞ্চাননতলা রোড, আন্দুল রোড, শিবপুর রোড, লিলুয়া এবং কোনা এক্সপ্রেসওয়ে-সহ একাধিক এলাকার রাস্তার দুরবস্থার অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলাকারীর দাবি, বারবার সাময়িকভাবে রাস্তা সারানোর বদলে দীর্ঘস্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রাস্তা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, বর্ষার সময় রাস্তা মেরামতের ক্ষেত্রে শুকনো আবহাওয়ার অপেক্ষা, বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং দায়িত্বের বিভাজনের কারণে সমস্যা আরও জটিল হচ্ছে।

রাস্তা, উড়ালপুল ও নিকাশি ব্যবস্থার দায়িত্ব বিভিন্ন সরকারি ও পুর সংস্থার মধ্যে বিভক্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষের অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তিও অনেক সময় হচ্ছে না। এমন অভিযোগ মামলায় করা হয়েছে। মামলাকারীর বক্তব্য, নাগরিকের প্রশ্ন হওয়া উচিত গর্ত তৈরি হওয়ার পর শুধু তা ভরাট করা হবে, নাকি গর্ত তৈরি হওয়ার কারণটিও চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধান করা হবে?

জনস্বার্থ মামলায় মূল আইনি প্রশ্নগুলির মধ্যে রয়েছে, নিরাপদ ও চলাচলের উপযোগী রাস্তা বজায় রাখতে সরকারি সংস্থার ব্যর্থতা নাগরিকের সংবিধান-প্রদত্ত জীবনের অধিকারের লঙ্ঘন কি না। এর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পুর আইন ও অন্যান্য বিধির অধীনে প্রশাসনের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে কি না। জনসম্পদের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কি না এবং দীর্ঘদিন অভিযোগের পরেও ব্যবস্থা না নেওয়া প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করে কি না, সেসব বিষয়ও আদালতের সামনে তোলা হয়েছে।

মামলাকারীর আবেদন কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার রাস্তা, উড়ালপুল এবং নিকাশি ব্যবস্থার জন্য একটি বৈজ্ঞানিক, স্বচ্ছ এবং সময়বদ্ধ রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করা হোক। সেই সঙ্গে কোন রাস্তা কোন সংস্থার অধীনে? কোথায় কী ধরনের মেরামতি প্রয়োজন? কত দিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে এবং ভবিষ্যতে রাস্তার অবস্থা কীভাবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে? তার একটি সুসংহত ব্যবস্থা তৈরিরও দাবি জানানো হয়েছে।

কলকাতার নাগরিকের কাছে রাস্তা শুধুই একটি পিচ ঢালা পথ নয়। সেই রাস্তা দিয়েই শিশুরা স্কুলে যায়।  রোগী হাসপাতালে পৌঁছন। শ্রমিকেরা কর্মস্থলে যান। অ্যাম্বুল্যান্স ছুটে যায় এবং বৃদ্ধ মানুষ বাড়ি থেকে বের হন।