জগন্নাথদেব স্নানঘাট ময়দানে সভার অনুমতি নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেই বড় স্বস্তি কালীঘাট তৃণমূল কংগ্রেসের। শ্রীরামপুর কোর্ট ময়দানে ২৬ সেপ্টেম্বর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভা করার অনুমতি দিল কলকাতা হাইকোর্ট। তবে একাধিক শর্তও বেঁধে দিয়েছেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য। সভায় সর্বাধিক ১০০০ জনের জমায়েত করা যাবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কর্মসূচি শেষ করতে হবে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ২৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টে থেকে ৬টা পর্যন্ত সভা করা যাবে। শব্দবিধি মেনে সভা করতে হবে। কোনও অপ্রীতিকর বা উসকানিমূলক মন্তব্য করা যাবে না। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সভার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ১০ জন স্বেচ্ছাসেবকের নাম ও মোবাইল নম্বর পুলিশকে দিতে হবে।
সভামঞ্চও নির্দিষ্ট মাপের মধ্যে রাখতে হবে। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর ডেকরেটর ও বিদ্যুৎ সংক্রান্ত সমস্ত পরিকাঠামো দ্রুত খুলে সরিয়ে ফেলতে হবে। শ্রীরামপুর থানার আইসিকে সভা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এর পাশাপাশি হুগলি জেলা বিচারককেও সভা আয়োজনে যাতে কোনও সমস্যা না হয়, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
সভায় কত মানুষ জমায়েত হতে পারবেন, তা নিয়েই শুনানিতে কার্যত দরকষাকষির পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাজ্যের তরফে ৭০০ জনের জমায়েতের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে রাজ্যের বক্তব্য ছিল, ১৫০০ মানুষের জমায়েত হলে পদপিষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আদালত শেষ পর্যন্ত ১০০০ জনের জমায়েতের অনুমতি দেয়। রাজ্যের তরফে সেই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করা হয়।
রাজ্যের আইনজীবীর বক্তব্য ছিল, শ্রীরামপুর কোর্ট ময়দানে ৫০০-৭০০ জনের বেশি জমায়েত হলে নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এর পাশাপাশি জেড ক্যাটাগরির নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা সম্ভব নয় বলেও আদালতে জানানো হয়। তৃণমূলের তরফে এই প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, অতীতে একই এলাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রায় ২০০০ মানুষের জমায়েত হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক সভায় মাত্র ৭০০ জনের সীমা বেঁধে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয় বলে তিনি দাবি করেন।
রাজ্যের তরফে দিল্লি রোড, জলকল ময়দান এবং শ্রীরামপুর কোর্টের বিকল্প ব্যবস্থার কথা আদালতে জানানো হয়। জলকল ময়দানে অন্যদিন সভা করা যেতে পারে বলেও জানায় রাজ্য। কিন্তু কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাঁরা অন্য কোনও জায়গায় যেতে চান না। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেন, আদালত সভার অনুমতি দিতে প্রস্তুত। তবে জগন্নাথদেব স্নানঘাট ময়দানের জমির মালিক অনুমতি দিতে অস্বীকার করায় সেখানে সভা করা সম্ভব নয়। প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের নির্দেশ অনুযায়ী, ওই জমি সংক্রান্ত ১০ সেপ্টেম্বরের নির্দেশ পুনর্বিবেচনার বিষয়টিও শুনানিতে উঠে আসে।
বিচারপতির বক্তব্য, আদালত কখনই রাজনৈতিক দলের অধিকার বা আন্দোলনের অধিকার খর্ব করতে চাইছে না। বরং নিরাপত্তা ও জমির মালিকের সম্মতির বিষয়টি মাথায় রেখে বিকল্প জায়গায় সভা করার পথ খোলা রাখা হচ্ছে। শুনানিতে রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও উঠে আসে। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, শ্রীরামপুরের জিটি রোড ধরে বিজেপি ও কংগ্রেসের মতো বিরোধী দলগুলিও বিভিন্ন সময়ে সভা-মিছিল করেছে। অথচ তৃণমূলের কর্মসূচির ক্ষেত্রে কেন অনুমতি নিয়ে সমস্যা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এরপর বিচারপতি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করেন, গত ১৫ বছরে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালীন বিরোধী দলগুলির সভা, মিছিল ও রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমতি কীভাবে দেওয়া হত? শুনানির এক পর্যায়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল বিল্লদল ভট্টাচার্যের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে দু’পক্ষের মধ্যে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও মন্তব্য-পাল্টা মন্তব্য শুরু হয়। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য দু’পক্ষকেই থামানোর চেষ্টা করেন।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রীরামপুর থানার আইসির আচরণ নিয়েও অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, ওই পুলিশ আধিকারিকের ভূমিকা নিয়ে তাঁদের আপত্তি রয়েছে। এমনকী স্বেচ্ছাসেবকদের নাম ও মোবাইল নম্বর পুলিশকে দেওয়ার নির্দেশ নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, তালিকায় থাকা স্বেচ্ছাসেবকদের বিরুদ্ধে পুলিশ পরে ব্যবস্থা নিতে পারে।
এদিকে মহেশ জগন্নাথদেব স্নানঘাট কর্তৃপক্ষের ১০ সেপ্টেম্বরের পুনর্বিবেচনার আবেদন আদালত গ্রহণ করেছে। ফলে ওই ময়দানে কালীঘাট তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সভা করার অনুমতি থাকছে না। সেই সঙ্গে শ্রীরামপুর থানার পুলিশের করা পুনর্বিবেচনার আবেদনও মঞ্জুর হয়েছে।
আরও পড়ুন: বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, উত্তর-দক্ষিণে কেমন থাকবে আবহাওয়া?
প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক ও মামলাকারী অসিত মজুমদারের করা মামলায় আদালত অবশ্য জানিয়েছে, শ্রীরামপুর কোর্ট ময়দানে সভা আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রশাসনের তরফে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে হবে। ফলে আপাতত জগন্নাথদেব স্নানঘাট নয়, শ্রীরামপুর কোর্ট ময়দানেই ২৬ সেপ্টেম্বরের সভার পথ খুলল। তবে ১০০০ জনের জমায়েত, দুই ঘণ্টার সময়সীমা, শব্দবিধি এবং একাধিক প্রশাসনিক শর্ত সব মিলিয়ে আদালতের নির্দেশেই বাঁধা থাকছে কালীঘাট তৃণমূলের কর্মসূচি।