দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে কমিটির মধ্যে বিবাদ, প্রশাসনের অনুমতি এবং পুজোর অধিকার নিয়ে একের পর এক মামলা গড়াল কলকাতা হাইকোর্টে। কল্যাণী, নিউটাউন থেকে শিয়ালদহ বিভিন্ন এলাকার পুজো কমিটির বিবাদে আদালতের পর্যবেক্ষণে বারবার উঠে এসেছে একটি বিষয়। তা হল দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী পুজো কোনওভাবেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে না।
কল্যাণী সেন্ট্রাল পার্কে পুজো নিয়ে বিবাদ
কল্যাণী সেন্ট্রাল পার্ক শ্রী শ্রী দুর্গাপুজো কমিটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে দুই গোষ্ঠীর বিরোধ। গত ২১ জুলাই এসডিও অমিত পানসারি একটি কমিটি গঠন করে দেন। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর নিবেদিতা বসুর স্বামী।
মামলায় পুজো কমিটির হয়ে সওয়াল করেন আইনজীবী ফিরদৌস শামীম। আদালতে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই দুর্গাপুজো হোক। যে গ্রুপই করুক, পুজো বন্ধ হওয়া উচিত নয়। দীর্ঘদিনের একটি পুজো বন্ধ হয়ে যেতে পারে না। এর সঙ্গে পাড়ার মানুষের আবেগ এবং ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে।’
এই বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে আদালতও জানায়, কোনওভাবেই দুর্গাপুজো বন্ধ করা যাবে না। সহজ পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এসপি, এসডিও, স্টেট ম্যানেজার এবং দুই গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করে পুজো নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে আদালত। একটি পুজো হবে নাকি দুই গোষ্ঠীকে পুজোর সুযোগ দেওয়া হবে, বৈঠকের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে আসে, ট্রাস্টের নাম করে সাতজন মিলে পাড়ার পুজো নিজেদের দখলে নিতে পারেন না। দুর্গাপুজো করার অধিকার রয়েছে সংশ্লিষ্ট মানুষের।
১৯৬৩-র পুজো ঘিরেও টানাপড়েন
কল্যাণী লেক পল্লি সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির মামলাতেও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ১৯৬৩ সাল থেকে ওই এলাকায় পুজো হয়ে আসছে। কমিটির অভ্যন্তরেও তৈরি হয়েছে দুই গোষ্ঠী। এই মামলায় এসডিও-কে সশরীরে আদালতে হাজিরার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি কৃষ্ণা রাও। বুধবার তাঁকে হাজির হতে হবে।
মামলার শুনানিতে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দুর্গাপুজো করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুমতিপত্র আদালতে পেশ করতে বলা হলেও তা করতে পারেনি রাজ্য। পরে রাজ্যের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অন্য একটি কমিটিকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
সেই সময়তেই প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি। আদালত জানতে চায়, গত জুন মাসে প্রবহণ নাথ আবেদন করেছিলেন। তাহলে অন্য একটি কমিটিকে কীভাবে অনুমতি দেওয়া হল? বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে আদালত।
নিউটাউন সিসি ব্লকে পুজো কার?
নিউটাউন সর্বজনীন সিসি ব্লক পূজা সমিতির দাবি, গত ১৫ বছর ধরে তারাই পুজো করে আসছে। অন্যদিকে, নিউটাউন সিসি ব্লক রেসিডেন্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধে জোর করে পুজোর দখল নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এনকেডিএ অবশ্য পুজো করার অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কমিটির বৈধ নথি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে আদালতে।
শেষ পর্যন্ত পুজো নিয়ে বিবাদ মেটাতে অভিনব পথ বলেছে আদালত। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, লটারির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কোন গোষ্ঠী পুজো করবে। সেই লটারি করবে এনকেডিএ। রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল বিল্বদল ভট্টাচার্য শুনানিতে দুই পক্ষকেই পুজোর সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তাঁর প্রস্তাব ছিল, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী এবং নবমীতে এক গোষ্ঠী। অন্য সময় অন্য গোষ্ঠী পুজোর দায়িত্ব নেবে। তবে আদালত সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি।
এর আগেও ২০২৩ সালে একই ধরনের একটি মামলায় বিচারপতি অমৃতা সিনহা দুই পক্ষকেই পুজো করার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
প্রকৃতিবান্ধব সমিতি বনাম শিবালয়
শিবালয়ের পক্ষের আইনজীবী অরুণ কুমার মাইতি ও আইনজীবী অনিন্দ সুন্দর দাস মঙ্গলবার আদালতে জানান, অন্য কোনও পুজো কমিটিকে আটকে তাদের সংগঠন পুজো করতে রাজি নয়। দুর্গাপুজো সকলের। তাই এক সঙ্গে নিজ নিজ জায়গায় পুজো করার অনুমতি দেওয়া হোক। এমনটাই আবেদন জানান আদালতে।
নিউটাউনে প্রকৃতিবান্ধব সমিতি এবং শিবালয় ট্রাস্টকে ঘিরেও পুজোর অধিকার নিয়ে বিবাদ আদালতে পৌঁছেছে। প্রকৃতিবান্ধব সমিতিকে পুজো করতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। আইনজীবী অমিতাভ বসু এবং আইনজীবী রাজনীল মুখার্জি মামলায় সওয়াল করেন। এনকেডিএ-র একটি রিপোর্ট আদালতে পেশ করে জানানো হয়, প্রকৃতিবান্ধব সমিতি পুজো করতে পারবে। এর পাশাপাশি শিবালয় ট্রাস্টের পক্ষ থেকেও তাদের পুজোয় বাধা দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়।
শিয়ালদহে ৭৮ বছরের পুজো বন্ধ নয়
শিয়ালদহের নেতাজি সুভাষ ইনস্টিটিউশন মাঠে রেলওয়ে অ্যাথলেটিক ক্লাবের দুর্গাপুজো নিয়েও আদালতে মামলা হয়েছে। এই পুজোর ইতিহাস ৭৮ বছরের। অভিযোগ, অন্য একটি পুজো কমিটি টাকা দিয়ে রেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একই মাঠে পুজোর অনুমতি নিয়েছিল। পুরনো পুজো হিসেবেই শিয়ালদহের ডিআরএম রেলওয়ে অ্যাথলেটিক ক্লাবকে অনুমতি দিয়েছিলেন বলে মামলায় উঠে আসে।
অন্যদিকে, নতুন পুজো কমিটিকে খুঁটিপুজোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল এবং তারা সেই অনুযায়ী খুঁটিপুজোও করে। কিন্তু মণ্ডপ তৈরির কাজ শুরু হওয়ার পর রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স বা আরপিএফ তাদের পুজোর অনুমতি দিতে অস্বীকার করে।
মামলা গড়ায় কলকাতা হাইকোর্টে। শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও নির্দেশ দেন, নতুন পুজো কমিটির কাছ থেকে শিয়ালদহের ডিআরএম যে টাকা নিয়েছিলেন, তা ফেরত দিতে হবে। সেই সঙ্গে ৭৮ বছরের পুরনো পুজো যাতে বন্ধ না হয়, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রেল কর্তৃপক্ষকে।