মায়ের আরাধনায় ভিআইপি তকমা নয়, এক ছাতার তলায় ৭৭৮ পুজো

Photo: মায়ের আরাধনায় ভিআইপি তকমা নয় (AI)

দুর্গাপুজো শুধু উৎসব নয়। বাঙালির আবেগ, পরম্পরা এবং মায়ের প্রতি শ্রদ্ধার এক গভীর সামাজিক বন্ধন। সেই ঐতিহ্যকে সামনে রেখে বড় বাজেটের চাকচিক্যের বাইরে গিয়ে পরম্পরাকে মেনে যে সমস্ত পুজো বছরের পর বছর ধরে মাতৃ আরাধনা করে আসছে, তাদের এক ছাতার তলায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হল।

এই উদ্যোগে ইতিমধ্যেই ৭৭৮টি দুর্গাপুজো যুক্ত হয়েছে বলে উদ্যোক্তাদের দাবি। কলকাতার পাশাপাশি জেলার বারোয়ারি পুজো, প্রত্যন্ত এলাকার পুজো এবং ভবিষ্যতে দেশের অন্য প্রান্ত ও বিদেশের পুজোকেও এই পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, এখানে কোনও পুজোকে ‘ভিআইপি’ বা ‘নন-ভিআইপি’ তকমায় ভাগ করা হবে না। মায়ের কাছে সকলেই সমান। অনুষ্ঠানে সমিতির বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য সভাপতি রুদ্রনীল ঘোষ, চেয়ারম্যান কার্তিক মহারাজ, জেনারেল সেক্রেটারি প্রসেনজিৎ সাহা, চিফ অ্যাডভাইজর ভাস্কর, সায়ক রাজ, প্রীতম সরকার-সহ অন্যরা। মুখ্য উপদেষ্টা হিসেবে মানব গুহ, দেবাশিস ধর ও বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও উঠে আসে।


অনুষ্ঠানেই সমিতির লোগো ও ওয়েবসাইটের উদ্বোধন করা হয়। উদ্যোক্তাদের আশা, ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আরও বেশি পুজো কমিটি সহজে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। কোথায় কোন পুজো হচ্ছে, কোন এলাকার পুজো কীভাবে চলছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের পুজোগুলির সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ তৈরি করা যায় সেই ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

রুদ্রনীল ঘোষ বলেন, কলকাতার এমন কিছু পুজো রয়েছে যেগুলিকে এতদিন নির্দিষ্ট কিছু ধারণার মধ্যে আটকে রাখা হয়েছিল। তাঁদের উদ্দেশ্য বিগ বাজেটের পুজোকে সামনে আনা নয় বরং পরম্পরা মেনে যেখানে মা আসছেন, সেই পুজোগুলিকে একত্রিত করা। তাঁর কথায়, জেলার পুজো, বারোয়ারি পুজো সবেতেই এই উদ্যোগে জায়গা দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘মায়ের কাছে ভিআইপি বলে কিছু হয় না।‘ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পুজোর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত দমকল, পুলিশ এবং জীবনরক্ষাকারী কাজে থাকা ব্যক্তিদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। পুজোর আনুষঙ্গিক কাজ যাতে নির্বিঘ্নে হয়, সেই ব্যবস্থার দিকেও নজর দেওয়া হবে।

শিল্পী ভাস্কর বলেন, ‘দুর্গাপুজোর আসল অর্থকে সামনে আনা প্রয়োজন। মাতৃ আরাধনা ও সম্মানের মধ্য দিয়েই পুজোর প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব।‘ তাঁর বক্তব্য, সময়ের সঙ্গে পুজোর অর্থ ও চরিত্র বদলে যাওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তার পরিবর্তে ফের মাতৃ আরাধনার মূল আবেগকে সামনে আনা দরকার।

এই প্রসঙ্গে কলকাতার বালিগঞ্জ কালচারাল, বোসপুকুর, শ্যাম স্কোয়ার, চোরবাগান সার্বজনীন, রাজডাঙ্গা নবউদয় সংঘ-সহ বিভিন্ন পুজোর নাম উঠে আসে। দুর্গাপুজোকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নীতিন প্যাটেলের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়। বিধায়ক মানব গুহ বলেন, ‘আগামী ৯ সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে এগোনোর পরিকল্পনা রয়েছে।‘ তাঁর বক্তব্যে পুজোর কার্নিভাল নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তাঁর দাবি, আগে কার্নিভালকে ঘিরে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রচারই বেশি গুরুত্ব পেত। সেই জায়গায় চন্দননগরের আদলে অন্য কোনও সাংস্কৃতিক মডেল করা যায় কি না, তা নিয়েও ভাবা হচ্ছে। পুজোকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিকীকরণের পরিবর্তে উৎসবের নিজস্ব চরিত্র বজায় রাখার কথাই তিনি বলেন।

ভিআইপি পাস নিয়েও আপত্তির কথা জানান মানব গুহ। তাঁর প্রশ্ন, ‘পুজোয় ভিআইপি কিসের?’ তাঁর মতে, বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে শ্রেণিবিন্যাসের বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে নির্ধারিত হতে পারে, কিন্তু মায়ের আরাধনায় সাধারণ মানুষকে আলাদা করে দেখার প্রবণতা থাকা উচিত নয়। দেবাশিস ধর বলেন, ‘ভিআইপি ব্যবস্থা প্রশাসন নির্ধারণ করে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের গ্রিন করিডর দেওয়ার প্রয়োজন হয়।‘ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভিআইপির বিষয়টি অনেক সময় অন্য মাত্রা পেয়েছে। ইতিমধ্যেই যাঁরা উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তাঁদের অ্যাকাউন্ট খুলে রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, জেলার পুজোগুলিকে লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, অতীতে অনুদানের সঙ্গে কার্নিভালের মতো কিছু আয়োজনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছিল বলে যে অভিযোগ রয়েছে, তার বদলে পুজোর নিজস্ব সাংস্কৃতিক চরিত্রকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ভবিষ্যতে পুজোর শেষে একসঙ্গে প্রতিমা নিরঞ্জনের ব্যবস্থা এবং প্রতিটি জেলায় বিজয়া সম্মেলনীর আয়োজন নিয়েও তিনি মত প্রকাশ করেন।

উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, কলকাতার সঙ্গে জেলার পুজোর যোগাযোগ আরও নিবিড় করা জরুরি। বড় কিংবা ছোট প্রতিটি পুজোই এই উদ্যোগের অংশ হতে পারে। ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য রাজ্য এবং বিদেশে অনুষ্ঠিত দুর্গাপুজোকেও একই পরিসরে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। অনুষ্ঠানে কেয়ার পক্ষ থেকেও উঠে আসে মানবিক আবেদন ‘মাকে মায়ের মতো রাখুন’। এই বক্তব্য যেন গোটা উদ্যোগের মূল আবেগকেই স্পর্শ করে, উৎসবের বাহ্যিক আড়ম্বরের বাইরে গিয়ে মায়ের আরাধনাকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করা।

ধর্মীয় পরিচয় ও উৎসবের চরিত্র নিয়েও অনুষ্ঠানে মতামত প্রকাশ করেন মানব গুহ। তিনি দুর্গাপুজোকে হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, উৎসবের ধর্মীয় চরিত্রকে অন্য কোনও ধর্মীয় প্রসঙ্গ দিয়ে পরিবর্তন করা উচিত নয়। এটি তাঁর ব্যক্তিগত বক্তব্য হিসেবে অনুষ্ঠানে উঠে আসে।

আরও পড়ুন: বিদ্যাসাগরের জন্মবার্ষিকীতে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর, বরাদ্দ ১২০০ কোটি টাকা

সব মিলিয়ে, ৭৭৮টি পুজোকে সঙ্গে নিয়ে এই উদ্যোগের লক্ষ্য, শহরের আলো থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের মাটির মণ্ডপ পর্যন্ত দুর্গোৎসবের বৈচিত্র্যকে একই পরিসরে তুলে ধরা। ভিআইপি পরিচয়ের বদলে পুজোর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, প্রশাসনিক সহযোগিতা, শিল্প-সংস্কৃতি এবং দীর্ঘদিনের পরম্পরাকে সামনে রেখেই এগোনোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। দশভুজার আগমনের আগে তাই একটাই আহ্বান ‘মায়ের মণ্ডপে দূরত্ব নয়, থাকুক মিলন; প্রতিযোগিতা নয়, থাকুক পরম্পরার প্রতি সম্মান’।