‘আশ্রয়’ নাকি শিশুশ্রম? ‘মিনি ট্রায়াল’ করতে নারাজ হাইকোর্ট

File Photo

পরিবারের অসহায় পরিস্থিতিতে ১৫ বছরের কিশোরীকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল নাকি সেই অসহায়তার সুযোগ নিয়ে তাকে গৃহকর্মে নিযুক্ত করা হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর এখনই খোঁজা সম্ভব নয়। কারণ, কিশোরীর বয়ানেই রয়েছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। তাই মামলার একেবারে গোড়াতেই অভিযুক্ত দম্পতিকে দায়মুক্তি দিতে নারাজ কলকাতা হাইকোর্ট। আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য, এই টানাপড়েনের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে হাইকোর্ট ‘মিনি ট্রায়াল’ করতে পারে না। বিষয়টি বিচারপর্বেই নির্ধারিত হবে।

টেকনো সিটি থানায় দায়ের হওয়া মামলায় ১৫ বছরের ওই কিশোরীকে বাড়িতে রেখে গৃহস্থালির কাজ করানোর অভিযোগ উঠেছিল এক দম্পতির বিরুদ্ধে। তাঁদের ফ্ল্যাট থেকে ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ চাইল্ডলাইন কর্মীরা কিশোরীকে উদ্ধার করেন। অভিযোগ, দম্পতির সন্তানদের দেখাশোনা-সহ বাড়ির নানা কাজ করানো হত তাকে। বিনিময়ে মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা, খাবার ও থাকার ব্যবস্থা দেওয়ার কথা ছিল। এরপর পুলিশ তদন্ত করে চার্জশিট দেয়। তদন্তে কিশোরীর ১৬১ এবং ১৬৪ ধারায় বয়ানও নেওয়া হয়। সেই বয়ানেই তৈরি হয় মামলার জটিলতা।

অভিযুক্ত দম্পতির দাবি, তাঁরা কোনও শিশুকে চাকরি দেননি। পারিবারিক সমস্যায় পড়া ওই কিশোরীকে মানবিক কারণেই আশ্রয়, খাবার ও থাকার জায়গা দিয়েছিলেন। কোনও টাকা দিয়ে থাকলে তা ছিল সাহায্য, মজুরি নয়। কিন্তু তদন্তের নথিতে কিশোরীকে গৃহস্থালির কাজ ও শিশুদের দেখাশোনার বিনিময়ে টাকা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে আদালতের সামনে প্রশ্ন ওঠে, ‘অসহায় একটি শিশুকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, নাকি সেই অসহায়তাই পরিণত হয়েছিল বেআইনি শিশুশ্রমে?’


বিচারপতি উদয় কুমারের পর্যবেক্ষণ, মামলার নথিতে কিশোরীর কাছ থেকেই পরিস্থিতি সম্পর্কে ‘দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য’ উঠে এসেছে। সেই বিরোধ মেটানো এই পর্যায়ে সম্ভব নয়। অভিযুক্তদের তরফে কেরল হাইকোর্টের একটি রায়ের উপর নির্ভর করে দাবি করা হয়েছিল, শুধুমাত্র গৃহকর্মে শিশুকে নিয়োগ করলেই জুভেনাইল জাস্টিস আইনের ৭৫ ধারা প্রযোজ্য হয় না। নির্যাতন, মানসিক বা শারীরিক অত্যাচার কিংবা জোরপূর্বক শ্রমের মতো উপাদানও প্রয়োজন।

তবে সেই যুক্তিকে মামলার প্রাথমিক পর্যায়ে ‘ঢাল’ হিসেবে মেনে নিতে চাননি বিচারপতি। আদালতের মতে, ১৬১ ও ১৬৪ ধারার বয়ানের মধ্যে অসঙ্গতি, কিশোরীকে উদ্ধারের পরিস্থিতি এবং বাড়ির প্রকৃত পরিবেশ—সবকিছুই বিচারপর্বে প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। আদালত আরও জানায়, ৪৮২ ধারায় মামলা খারিজের সময় হাইকোর্ট অভিযুক্তের পক্ষে থাকা যুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করে প্রমাণ করতে পারে না। তাহলে কার্যত বিচার শুরুর আগেই বিচার হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন: নিয়ম না মানলেই জরিমানা, রাস্তা পরিষ্কার রাখতে ১ সেপ্টেম্বর থেকে মানতে হবে নিষেধাজ্ঞা

‘চ্যারিটি’ না ‘শিশুশ্রম’, এই বিতর্কের নিষ্পত্তি হবে ট্রায়াল কোর্টেই। প্রাথমিকভাবে মামলাটি চালানোর মতো যথেষ্ট উপাদান রয়েছে বলে মনে করে দম্পতির আবেদন খারিজ করেছে কলকাতা হাইকোর্ট। দ্রুত আইন মেনে বিচার শেষ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে নিম্ন আদালতকে। তবে কলকাতা হাইকোর্ট স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তার পর্যবেক্ষণের কোনওটিই যেন বিচারপর্বে প্রভাব না ফেলে।