এক বাটি দইয়ে ফ্যাটের পরিমাণ কম ছিল। সেই অভিযোগেই প্রায় ২৬ বছর ধরে চলেছে আইনি লড়াই। নিম্ন আদালতের সাজা, তার পর আপিল আদালতের রায়—সব পেরিয়ে অবশেষে কলকাতা হাইকোর্টে মিলল স্বস্তি। শুধু দইয়ে ফ্যাট কম থাকার রিপোর্ট দেখিয়ে কোনও খাবারকে ভেজাল প্রমাণ করা যায় না। পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া এমন অভিযোগে সাজা বহাল রাখা যায় না, স্পষ্ট জানিয়ে ২৬ বছরের পুরনো সেই দণ্ড খারিজ করে দিল হাইকোর্ট।
বিচারপতি চৈতালি চট্টোপাধ্যায় (দাস) নদিয়ার মিষ্টির দোকানের মালিক ভগীরথ ঘোষের দায়ের করা ফৌজদারি পুনর্বিবেচনার আবেদন মঞ্জুর করেছেন। একই সঙ্গে নিম্ন আদালত ও আপিল আদালতের দেওয়া সাজা খারিজ করে তাঁকে সংশ্লিষ্ট বেল বন্ড থেকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৯৭ সালের ১৬ মে। নদিয়ার একটি মিষ্টির দোকানে তল্লাশি চালান মহকুমা খাদ্য পরিদর্শক। দোকানে মাটির হাঁড়িতে প্রায় ৮ কেজি দই রাখা ছিল। সেখান থেকে ১৫ টাকা দিয়ে ৬০০ গ্রাম দইয়ের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নিয়ম মেনে সেই নমুনা তিন ভাগ করা হয়। একটি পাঠানো হয় সরকারি খাদ্য বিশ্লেষকের কাছে। বাকি দু’টি পাঠানো হয় সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে।
এর পরেই আসে বিশ্লেষকের রিপোর্ট। সেখানে বলা হয়, দইয়ে ফ্যাটের পরিমাণ নির্ধারিত মানের তুলনায় কম। সেই কারণেই দইটিকে ভেজাল বলে উল্লেখ করা হয়। ওই রিপোর্টের ভিত্তিতেই মামলা শুরু হয়। ২০০০ সালে ভগীরথ ঘোষকে ছ’মাসের কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানা করে নিম্ন আদালত। ২০০৪ সালে আপিল আদালতও সেই সাজা বহাল রাখে।
এর পর মামলাটি পৌঁছয় হাইকোর্টে। সেখানেই মূল প্রশ্ন ওঠে—শুধু ফ্যাটের পরিমাণ কম, এই তথ্য কি কোনও খাবারকে ভেজাল প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট?
আদালতের পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষকের রিপোর্টে এমন কোনও তথ্য নেই, যাতে প্রমাণ হয় ওই দই মানবস্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর ছিল, খাওয়ার অযোগ্য ছিল অথবা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। দইটি নোংরা, পচা, দুর্গন্ধযুক্ত, পচনশীল কিংবা মানুষের খাওয়ার অনুপযুক্ত—এমন কোনও প্রমাণও মামলায় পাওয়া যায়নি।
শুধু তাই নয়, নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়েও একাধিক প্রশ্ন তুলেছে আদালত। কখন নমুনাটি সরকারি খাদ্য বিশ্লেষকের কাছে পাঠানো হয়েছিল, তার নির্দিষ্ট তথ্য মামলার নথিতে নেই। নমুনা বহনকারী ব্যক্তিকেও আদালতে হাজির করা হয়নি। এমনকি যে খাদ্য বিশ্লেষক রিপোর্ট দিয়েছিলেন, তাঁকেও সাক্ষ্য দেওয়ানো হয়নি। স্বাস্থ্য দফতরে পাঠানো বাকি নমুনাগুলি নিয়েও সংশ্লিষ্ট কোনও আধিকারিকের সাক্ষ্য পাওয়া যায়নি।
ফলে শুধুমাত্র বিশ্লেষকের রিপোর্টের একটি তথ্যের ভিত্তিতে ভগীরথ ঘোষকে দোষী সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে হাইকোর্ট। বিচারপতি চট্টোপাধ্যায় (দাস) স্পষ্ট জানান, শুধু দইয়ে ফ্যাটের পরিমাণ কম রয়েছে—এই রিপোর্টের ভিত্তিতে সেটিকে ভেজাল ধরে নিয়ে সাজা দেওয়া আইনসম্মত নয়। খাদ্যে ভেজাল সংক্রান্ত আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় দোষ প্রমাণের জন্য যে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি প্রতিষ্ঠা করা দরকার ছিল, তা যথেষ্টভাবে প্রমাণ করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ।
এই মামলার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক অবশ্য সময়ের হিসাব। ২০০৪ সালে হাইকোর্টে পুনর্বিবেচনার মামলা দায়ের হওয়ার পরই সাজা স্থগিত হয়েছিল। বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকে। ২০১৯ সালে শুনানির সময় আবেদনকারীর পক্ষে কেউ হাজির না থাকায় মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। পরে ২০২৫ সালে তা পুনরায় চালু হয়। শেষ পর্যন্ত প্রায় ২৬ বছরের আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটল হাইকোর্টের রায়ে।
নিম্ন আদালত এবং আপিল আদালতের দেওয়া দণ্ড বাতিল করে ভগীরথ ঘোষকে সংশ্লিষ্ট বেল বন্ড থেকে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। অর্থাৎ, দইয়ে ফ্যাট কম থাকার অভিযোগে যে মামলা শুরু হয়েছিল, দীর্ঘ ২৬ বছর পর সেই মামলাতেই মিলল দোকানির আইনি স্বস্তি।