‘প্রশাসক কি পুরসভার মালিক?’ ওয়ার্ড ভাগে রাজ্যকে তুলোধোনা হাইকোর্টের

Photo: Statesman

নির্বাচিত পুরবোর্ড নেই, রাজ্য নিয়োগ করেছে প্রশাসক। আর সেই প্রশাসকের সুপারিশেই বদলে যাবে কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ডের সীমানা? পুরসভার নির্বাচিত কর্পোরেশনকে পাশ কাটিয়ে প্রশাসকের সুপারিশে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের এই প্রক্রিয়া নিয়েই রাজ্যকে কার্যত তুলোধোনা করল কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ।

আদালতের কড়া পর্যবেক্ষণ, প্রশাসক কখনও নির্বাচিত কর্পোরেশনের বিকল্প হতে পারেন না। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন আর কর্পোরেশনের আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগ এক বিষয় নয়। তাই প্রশাসকের সুপারিশকে কর্পোরেশনের সুপারিশ বলে চালানো যায় না। আদালতের কথায়, এই ধরনের ‘পুতুলনাচ’ কলকাতা পুর আইন মেনে নিতে পারে না।

বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য এবং বিচারপতি অর্জুন রায় মুখোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালের সংশোধিত ওয়ার্ড বিন্যাসের ভিত্তিতে কলকাতা পুরসভার নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারবে না রাজ্য নির্বাচন কমিশন। মূল মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। অর্থাৎ, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত মামলার আইনি জট না কাটলে নতুন সীমানার ভিত্তিতে পুরভোটের পথে এগোনো কার্যত অসম্ভব।


মামলাটি ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের পদ্ধতি। মামলাকারীর অভিযোগ, ভৌগোলিক সংলগ্নতা, জনসংখ্যার ভারসাম্য কিংবা প্রশাসনিক সুবিধার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে গুরুত্ব না দিয়ে অতীতের নির্বাচনী ফল এবং ভোটার তালিকাকে সামনে রেখে ওয়ার্ডের সীমানা বদল করা হয়েছে। এর পিছনে শাসকদলকে নির্বাচনী সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন মামলাকারী দীপু দাসের পক্ষের আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য আইনজীবী শামিম আহমেদ এবং আইনজীবী আম্বিয়া খাতুন।

কিন্তু ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণে মামলার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে ওঠে প্রশাসকের এক্তিয়ার। কলকাতা পুর আইনের ৬০১ নম্বর ধারায় রাজ্য সরকার নিজের উদ্যোগে পুর আইনের বিভিন্ন তফসিল সংশোধন করতে পারে। আবার কর্পোরেশন সুপারিশ করলে সেই সুপারিশ মেনে পরিবর্তন করতে রাজ্য বাধ্য। অর্থাৎ, নির্বাচিত কর্পোরেশনের সুপারিশের একটি স্বতন্ত্র আইনি গুরুত্ব রয়েছে।

আদালতের বক্তব্য, ৮ জুন ২০২৬ সালে নির্বাচিত পুরবোর্ড ভেঙে দিয়ে পুর কমিশনারকে প্রশাসক নিয়োগ করেছিল রাজ্য। কিন্তু পুর আইনের ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং রাজ্য মনোনীত সদস্যদের নিয়েই কর্পোরেশন গঠিত হয়। প্রশাসক সেই কর্পোরেশন নন। তিনি সাময়িকভাবে পুরসভার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন মাত্র। কর্পোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনগত কিংবা আধা-আইন প্রণয়নমূলক ক্ষমতা তাঁর হাতে তুলে দেওয়া যায় না।

বেঞ্চের যুক্তি, প্রশাসককে যদি কর্পোরেশনের সমতুল্য বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হবে। কারণ প্রশাসককে নিয়োগ করে রাজ্য সরকারই, তাঁর ক্ষমতা ও দায়িত্বও নির্ধারণ করে রাজ্য। ফলে প্রশাসকের সুপারিশকে কর্পোরেশনের সুপারিশ বলে গণ্য করলে কার্যত রাজ্য নিজের কাছেই নিজের সুপারিশ পাঠানোর পরিস্থিতি তৈরি করবে। তাতে কর্পোরেশনের স্বতন্ত্র আইনগত অস্তিত্ব এবং আইনের উদ্দেশ্যই অর্থহীন হয়ে পড়বে।

শুধু ক্ষমতার প্রশ্নেই নয়, গোটা ঘটনাক্রমের সময় নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে আদালত। ৫ আগস্ট প্রথম খসড়া ওয়ার্ড বিন্যাস প্রকাশ করে জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য রাখা হয়। অথচ তার মাত্র দু’দিন পর, ৭ আগস্ট সংশোধনী বিল বিধানসভায় পেশ করা হয়। ২০ আগস্ট সংশোধনী আইন গেজেটে প্রকাশিত হয়। ২১ আগস্ট রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে ই-মেল পাঠানো হয়। পরের দিনই প্রশাসক নতুন ওয়ার্ড সংক্রান্ত তথ্য রাজ্যকে জানান। একই দিনে ফের খসড়া প্রকাশ করা হয়।

এত অল্প সময়ের মধ্যে একের পর এক পদক্ষেপ কেন, তার পিছনে কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছে ডিভিশন বেঞ্চ। যদিও এখনই ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের পিছনে আইনি অসৎ উদ্দেশ্য বা শাসকদলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা প্রমাণিত বলে ঘোষণা করেনি আদালত। বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, গোটা ঘটনায় স্বেচ্ছাচারিতা এবং আইনের মূল উদ্দেশ্য লঙ্ঘনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে মূল মামলার শুনানিতে।

অন্যদিকে, সংবিধানের ২৪৩-জেডজি অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে রাজ্যের এডভোকেট জেনারেল সুরজিৎ নাথ মিত্রের দাবি ছিল, নির্বাচনী এলাকার সীমানা সংক্রান্ত বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। সেই যুক্তিও আপাতত ধোপে টেকেনি। ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, এখানে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরুর আগেই রাজ্য সরকারের নির্বাহী ক্ষমতায় পুর আইনের ৬০১ নম্বর ধারায় নেওয়া একটি সিদ্ধান্তের বৈধতাকে। তাই এই পর্যায়ে হাইকোর্টের সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগে ওই অনুচ্ছেদ বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

এমনকী খসড়া ওয়ার্ড বিন্যাস প্রকাশের পর কোনও নাগরিক আপত্তি না জানালেও পরবর্তী সময়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার অধিকার হারান না বলে স্পষ্ট করেছে বেঞ্চ। সরকারি সিদ্ধান্তের গোড়াতেই যদি আইনি ত্রুটি থাকে, তাহলে কোনও ভোটারই তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। সব মিলিয়ে ২৯ অক্টোবরের একক বেঞ্চের নির্দেশ পুরোপুরি খারিজ না করেও তার সংশোধন করে ডিভিশন বেঞ্চের এই নির্দেশ কলকাতা পুরভোটের প্রস্তুতিতে নতুন করে আইনি অনিশ্চয়তা তৈরি করল।

আরও পড়ুন: সরকারি প্রকল্পের তথ্য বোর্ডে ব্যবহার হবে বাংলা ভাষা, নির্দেশ নবান্নের

এখন নজর মূল মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির দিকে। তার আগে নতুন ওয়ার্ড বিন্যাসের ভিত্তিতে ভোটের বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারবে না কমিশন। নির্বাচিত কর্পোরেশনের ক্ষমতা কি প্রশাসকের সুপারিশে প্রতিস্থাপিত হতে পারে? আপাতত সেই প্রশ্নেই রাজ্যের সামনে বড় আইনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল হাইকোর্ট।