দুর্গাপুজোর পাশ দুর্নীতি কাণ্ডে প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ নগদ জমা পড়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ওই টাকা আবার পরে তোলাও হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ নগদ কেন জমা পড়ল ইন্দ্রনীলের অ্যাকাউন্টে? সেটাই খুঁজছেন সিটের অফিসাররা। আবার তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেন তদন্তকারীদের জেরায় জানিয়েছেন, আর্থিক বিষয়টি সংস্থার পদাধিকারি ধ্রুবজ্যোতি বসু দেখতেন। এভাবেই বিষয়টি পাশ কাটানোর চেষ্টা করলেও দুর্গাপুজোর পাশ বিক্রি কাণ্ডের তদন্তে নেমে ইন্দ্রনীল সেনের অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা ঢোকার নথি পেয়েছেন তদন্তকারীরা। আর্থিক অনিয়ম হয়েছিল মণ্ডপের বাইরে লাগানো এলইডি স্ক্রিন এবং তাতে সম্প্রচারিত বিজ্ঞাপন নিয়েও বলে অভিযোগ।
যে নির্দিষ্ট ২৪টি দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শো নিয়ে ইউনেস্কোর নাম ভাঙিয়ে ডোনার পাস বিক্রি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ সেটার টেন্ডারেও গরমিল রয়েছে বলে তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। ইন্দ্রনীল সেন পর্যটনমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর ঘনিষ্ঠ তিন কোম্পানিকে টেন্ডার দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। সেখানে দেখা যাচ্ছে ২৪টি মণ্ডপের বাইরে এলইডি স্ক্রিনে মহালয়া থেকে টানা ১২ দিন বিজ্ঞাপন চলত। আর সেখানেও নানা গরমিল আছে। এই নিয়ে অভিযোগকারী-সহ কয়েকজনের বয়ান রের্কড করেছে লালবাজার বলে জানা গিয়েছে। এমনকী তাঁর মেয়ের কোম্পানির অ্যাকাউন্ট থেকেও টাকা ঢুকেছে প্রাক্তন বিধায়কের অ্যাকাউন্টে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের নথি ঘেঁটে অফিসাররা জেনেছেন, শুধু অ্যাকাউন্ট থেকে অ্যাকাউন্টেই টাকা লেনদেন হয়েছে এমন নয়, প্রায় রোজই বিপুল পরিমাণ নগদ জমা পড়েছে তাঁর একাধিক অ্যাকাউন্টে।
পুলিশ সূত্রে খবর, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁর দপ্তর থেকে ইন্দ্রনীল তিন ঘনিষ্ঠ সংস্থাকে এলইডি স্ক্রিনগুলির টেন্ডার দিতেন। ওই তিন সংস্থা আবার অন্য এক সংস্থাকে বরাত দিত। যাতে একাধিক বিজ্ঞাপন ওই স্ক্রিনে চলে। কোন মণ্ডপে, কোন বিজ্ঞাপন কতক্ষণ চলবে সেটা এই সংস্থাটিই ঠিক করত। তার জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া নানা সংস্থা থেকে মোটা টাকা নেওয়া হতো। এই নানা সংস্থার মাধ্যমে হাত বদলে ওই বিজ্ঞাপনের টাকা আসত ইন্দ্রনীল এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের কাছে। মণ্ডপের বাইরে গেটের কাছে এলইডি বোর্ডের জন্য দুর্গাপুজোর উদ্যোক্তা ক্লাবগুলিকে দেওয়া হতো দেড় থেকে দু’লক্ষ টাকা বলে তথ্য মিলেছে। এভাবেই মুনাফার মোটা অংশ চলে যেত ইন্দ্রনীল-সহ তাঁর ঘনিষ্ঠদের কাছে। অনুষ্ঠানের বরাত পাইয়ে দিয়ে তার বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ কাটমানি পেতেন তিনি। ওই টাকাই নানা সময়ে নগদে জমা পড়েছে তাঁর অ্যাকাউন্টে। অবৈধ অর্থের উৎস গোপন করতেই নগদে টাকা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু কে বা কারা এই টাকা জমা করলেন সেটা ব্যাঙ্কের সিসি ক্যামেরা ফুটেজ থেকে পাওয়া এখন সম্ভব নয়। তাই টেন্ডার পাওয়া তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ডেকে বিষয়টি জানতে চাওয়া হবে।
তাছাড়া অভিযোগকারী জয়দীপ মুখোপাধ্যায় জানান, মণ্ডপের বাইরে এলইডি স্ক্রিনে বেসরকারি সংস্থার বিজ্ঞাপন যদি ২৫ শতাংশ চলত, তাহলে বাকিটা থাকত সরকারি বিজ্ঞাপন। স্ক্রিনের বিজ্ঞাপনের টাকা ঘুরপথে ইন্দ্রনীল এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের কাছে পৌঁছে যেত। এখান থেকেও মোটা টাকা আত্মসাৎ করেছেন ইন্দ্রনীল-সহ তাঁর ঘনিষ্ঠরা। তবে ইন্দ্রনীলের আইনজীবী বলেন, ‘সব অভিযোগই ভিত্তিহীন।’ আর জেরায় ইন্দ্রনীল সেন দাবি করেছেন, সবটাই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এসেছে। তাই এখানে দুর্নীতির কোনও জায়গা নেই। স্বচ্ছ রোজগারের বাইরে বাড়তি কোনও অর্থ তাঁর অ্যাকাউন্টে ঢোকেনি। নগদের বিষয়টি তাঁর জানা নেই।