‘মাতৃভাষাকে যেন আমরা কখনও ভুলে না যাই’, শব্দলোকের উদ্বোধনে বার্তা শাহের, সঙ্গ দিলেন শুভেন্দুও

HM Amit Shah Kolkata Photo-SNS

দেশের ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে নতুন অধ্যায় শুরু হলো কল্লোলিনী কলকাতায়। রবিবার জাতীয় গ্রন্থাগারে উদ্বোধন হলো দেশের প্রথম ভাষা ভিত্তিক জাদুঘর ‘শব্দালোক’। আর এই জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ভাষার ইতিহাস, বিবর্তন এবং ভারতের বহুভাষিক ঐতিহ্যকে এক ছাদের তলায় নিয়ে আসতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য মোট ৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই জাদুঘর তৈরির কথা ঘোষণা করেছিলেন। ৯টি গ্যালারি নিয়ে গঠিত এই জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণ ‘ভাষার সময়রেখা’। যা দেশের সবচেয়ে বড় গ্যালারি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এখানে। মূলত ২২টি ভারতীয় ভাষার বিবর্তনের ইতিহাস এই সংগ্রহশালায় তুলে ধরা হয়েছে। আর বাংলা যে পাঁচ দশক এগিয়ে থেকে ভারতকে নেতৃত্ব দিয়েছে, শব্দলোকের উদ্বোধন করে এভাবেই বাংলার সংস্কৃতির ভূয়সী প্রশংসা করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

এদিকে জাতীয় গ্রন্থাগারে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই শুভেন্দু অধিকারী জানান, বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি এবং তার ব্যবহার আরও বিস্তৃত করার বিষয় নিয়ে তাঁকে চিঠি দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে সেই চিঠিতে ঠিক কী লেখা রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘বিধানসভার অধিবেশন চলায় সোমবার বিধানসভাতেই ওই চিঠি নিয়ে বিস্তারিত বলব।’ আর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশে সংকীর্ণতার কোনও জায়গা নেই। সংকীর্ণতা ভারতীয় সংস্কৃতির চিহ্ন হতে পারে না। আমরা কারও বিচারধারায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারি না। আজ সব স্কুলে বন্দেমাতরম পুরো গান গাওয়া হয়। এর থেকে বড় বছর আর কিছুই হতে পারে না। আর এই বিশেষ বছরেই এই মিউজিয়াম তৈরি হলো।’

অন্যদিকে মাতৃভাষাকে যেন কেউ ভুলে না যায় থেকে শুরু করে এখন সোনার বাংলা তৈরি হয়েছে-সহ নানা বিষয় উত্থাপন করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলা যে পাঁচ দশক এগিয়ে থেকে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছে সে কথাও তুলে ধরেন তিনি। অমিত শাহের দাবি, ‘বাংলা পাঁচ দশক এগিয়ে থেকে ভারতকে নেতৃত্ব দিয়েছে। মানুষ ভাষাকে নয়, ভাষা মানুষকে তৈরি করেছে। কোনও দেশের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি ভাষা ছাড়া সম্ভব নয়। ভাষা থেকেই সংস্কৃতির উৎপত্তি। শব্দ-ভাষা ছাড়া সংস্কৃতি অসম্পূর্ণ। মাতৃভাষাকে যেন আমরা কখনও ভুলে না যাই। আজ বাংলা আবার সোনার বাংলা হয়েছে। বাংলাই এমন জায়গা যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মেছেন। ঋষি অরবিন্দের ব্যাপারে না পড়লে কখনও ভারতকে বোঝা যাবে না। এখন বাংলায় যা হচ্ছে সবকিছুর উপর কেন্দ্র নজর রাখা হচ্ছে।’


এখানেই শেষ নয়, বাংলা ভাষার ঐতিহ্য ও গুরুত্বের কথা তুলে ধরা হয়। বাংলাকে শাস্ত্রীয় ভাষার মর্যাদা থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাঁর স্বপ্নপূরণ করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একইসঙ্গে অমিত শাহের বক্তব্য, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাকে শাস্ত্রীয় ভাষার মর্যাদাও দিয়েছেন। বাংলা সবসময় পাঁচ দশক এগিয়ে থেকে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছে। আমার মনের একটা কথা আমি শুভেন্দুকে চিঠিতে লিখে জানিয়েছি। আমার বিশ্বাস, শুভেন্দু আমার সেই স্বপ্ন নিশ্চয়ই পূরণ করবে। আজ দেশের সংস্কৃতির বড় দিন। এই শব্দের জাদুঘর সেটাই করবে। দেশের সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার করবে। পরিবারের ভাষাই শিশুর প্রথম পাঠশালা হওয়া উচিত। মায়ের কাছ থেকে শেখা ভাষাই শিশুর মনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে শুধু অনুবাদ বা কপি করার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে মৌলিক চিন্তাভাবনা তৈরির মূল কেন্দ্র হয়ে উঠতে হবে। দেশের প্রত্যেকটি ভারতীয় ভাষাকে এআই প্রযুক্তি সক্ষম এবং ডিজিটাইজ করতে হবে, যাতে সেগুলির আয়ু আরও অন্তত ১০০০ বছর বৃদ্ধি পায়। লাইব্রেরি ও মিউজিয়াম যেন শুধু চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ না থাকে। সেটা যুবসমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বিশেষ অভিযান চালাতে হবে।’

তাছাড়া অমিত শাহের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বেশ কিছু কথা বলেছেন শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই বাংলার মাটিই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে। একই সঙ্গে এই মাটি ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের জন্ম দিয়েছে, যা দেশের জাতীয় চেতনাকে নতুন শক্তি জুগিয়েছিল। এই বাংলার মাটিতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বাংলা গদ্যকে সহজ, সরল এবং আধুনিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়। বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতির এই ঐতিহ্যকে আগামী দিনেও সংরক্ষণ এবং সমৃদ্ধ করার দায়িত্ব বিজেপি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উন্নয়নের পাশাপাশি ঐতিহ্য রক্ষার যে ভাবনা, সেই লক্ষ্য নিয়েই রাজ্য সরকার এগোচ্ছে।’