৩৮ লক্ষ ১০ হাজার আপিল, নিষ্পত্তি মাত্র ৮৩ হাজার! এসআইআর-এ ভোটাধিকার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে বিস্ফোরক তথ্য

File Photo

পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য। ট্রাইব্যুনালে মোট ৩৮ লক্ষ ১০ হাজার আপিল জমা পড়লেও এখনও পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র প্রায় ৮৩ হাজার। এর মধ্যে বাদ পড়া ভোটারদের পক্ষ থেকে দায়ের করা আপিলের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৭ লক্ষ। বাকি বিপুল সংখ্যক আপিল এসেছে ভোটার তালিকায় কারও নাম অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের তরফে।

এই তথ্য শুনে কার্যত উদ্বেগ প্রকাশ করেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী। তাঁর বক্তব্য, কোনও ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া মানেই তাঁর ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া। তাই বাদ পড়া ভোটারদের আপিলের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রয়োজন। মামলার শুনানিতে প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ট্রাইব্যুনালে কতগুলি আপিল বিচারাধীন বা নিষ্পত্তি হয়েছে, সেই তথ্য প্রকাশ্যে নেই।

৩১টি বিধানসভা কেন্দ্রের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘মুছে দেওয়া ভোটারদের মধ্যে অনেকের ক্ষেত্রে জয়ের ব্যবধানের থেকেও বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বেশি। সামনে পুরসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচন। ফলে নাম বাদ যাওয়া ভোটাররা ভোট দিতে পারবেন না।’ এরপরেই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট করে দেন, আদালত শুধু ৩১টি কেন্দ্রের মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখবে না। সব কেন্দ্রের পরিস্থিতিই বিবেচনায় নেওয়া হবে। আবেদন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। প্রয়োজন হলে আরও ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথাও ভাবা হবে।


অন্যদিকে, প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণ আরটিআই-এর মাধ্যমে পাওয়া তথ্য আদালতে তুলে ধরে জানান, এখনও পর্যন্ত প্রায় ৮৩ হাজার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তাঁর দাবি, ট্রাইব্যুনাল না থাকলে তাঁদের অনেকেই ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন। জলপাইগুড়ির উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, সেখানে ৬৬৫ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

গোপাল শঙ্করনারায়ণ আরও বলেন, বাদ পড়া ভোটারদের ৭ লক্ষ আপিলকে আগে শুনতে হবে। তাঁর যুক্তি, অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতাকারীদের জন্য আইনে অন্য প্রতিকার রয়েছে। তাই ভোটাধিকার হারানো মানুষদের আপিলকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘একজনকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া মানে তাঁর ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া।’ ফলে অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যও বাদ পড়া ভোটারদের আপিল আগে বিবেচনার দাবি জানান।

নির্বাচন কমিশনের পক্ষের আইনজীবী নাইডু জানান, ট্রাইব্যুনালের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনালের প্রয়োজন রয়েছে। তবে আদালতের তরফে জানতে চাওয়া হয়, যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ঠিক কতগুলি অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজন? শুনানিতে উঠে আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সময়সীমা। ডিসেম্বরে কলকাতা ও হাওড়া পুরসভার নির্বাচন হতে পারে। ফলে বাদ পড়া ভোটারদের আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি আরও জোরালো হয়। গোপাল শঙ্করনারায়ণ বলেন, ‘৭ লক্ষ আপিলের মধ্যে কলকাতা ও হাওড়া এলাকার আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।’

শেষে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে নোটিশ দিয়ে জানায়, ট্রাইব্যুনালগুলিতে কতগুলি আপিল এখনও বিচারাধীন, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে। সেই সঙ্গে আলাদা করে জানাতে হবে কতগুলি আপিল বাদ পড়া ভোটারদের, কতগুলি অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা সংক্রান্ত এবং কতগুলি ক্রস-আপিল। অতিরিক্ত কতগুলি ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজন তাও জানাতে হবে কমিশনকে।

আরও পড়ুন: মেয়ো রোডে কাউকেই অনুমতি নয়, ২৮ আগস্ট দুই তৃণমূলের পৃথক সভায় অনুমতি হাইকোর্টের

শুনানিতে এসআইআরের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে একাধিক আইনজীবী নানা উদাহরণ তুলে ধরলেও প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আদালত আপাতত যে বিষয়গুলি সামনে রয়েছে, তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।’ ফলে এসআইআর-এ বাদ পড়া ভোটারদের আপিলের দ্রুত নিষ্পত্তি, বিশেষত কলকাতা-হাওড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ পুরনির্বাচনী এলাকার ক্ষেত্র এখন সুপ্রিম কোর্টের নজরের কেন্দ্রে। প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়িয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শুনানি শেষ করার পথও কার্যত খুলে দিল শীর্ষ আদালত।