মহালয়ার পুণ্যলগ্নে শনিবার কলকাতা ইডেন গার্ডেন্সে সরকারিভাবে দুর্গাপুজোর বোধন করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গান-বাজনা থেকে বাংলার লোকসংস্কৃতি, সব মিলিয়ে ইডেনের এই মেগা ইভেন্টে বর্ণাঢ্য আগমনী অনুষ্ঠানের সাক্ষী ছিল গোটা রাজ্য। রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি এবং পর্যটন দপ্তরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রদীপ জ্বালিয়ে উদ্বোধন করেন রাজ্যপাল আর এন রবি। মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপাল ছাড়াও এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার, রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য, মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল, জুন মালিয়া, স্বপন দাশগুপ্ত, সুখেন্দুশেখর রায়, তসলিমা নাসরিন-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
এদিন বিকেলে ঢাকের বোল, আদিবাসী নাচ ও গানের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। রেড রোড থেকে ইডেন গার্ডেন্স পর্যন্ত বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পা মেলান ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত-সহ অভিনেতা-অভিনেত্রী, ক্রীড়াবিদ ও পদ্ম সম্মানপ্রাপকেরা। শনিবারের এই অনুষ্ঠানে দার্জিলিং থেকে পুরুলিয়া, রাজ্যের ২৩টি জেলার ২৩ রকমের নাচ এবং ছৌ, বাউল ও ভাওয়াইয়ার মতো লোকসংস্কৃতি অনুষ্ঠানে জায়গা করে নেয়। অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন শান, লগ্নজিতা, কৌশিকী চক্রবর্তী ও অন্তরা মিত্র। ছিল বাংলা ব্যান্ড দোহার, শান্তনু মৈত্র ও তাঁর দলের পরিবেশনা এবং দেবর্ষি ভট্টাচার্য-সহ অন্যদের যন্ত্রসংগীত।
এদিনের অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল প্রায় তিন হাজার ড্রোনের প্রদর্শনী। ড্রোনের আলোয় আকাশে ফুটিয়ে তোলা হয় দেবী দুর্গার আগমনের ছবি। পাশাপাশি তিন হাজার ঢাকির বাদ্যি এবং এক হাজার মহিলার উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনির আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনের মাধ্যমে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম তোলার কথা জানানো হয়। মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের শংসাপত্র। প্রায় ৪০ দর্শকের উপস্থিতিতে ইডেনের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উৎসবের আবহ তৈরি হয়।
অনুষ্ঠান থেকে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এবার থেকে পঞ্জিকা ও শাস্ত্র মেনেই পুজো হবে। ধর্মীয় ভাবাবেগ ও সনাতনী ঐতিহ্যের সঙ্গে কোনও আপস করা হবে না। তাঁর দাবি, রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন ও রাষ্ট্রবাদী সরকার সনাতনী ঐতিহ্যকে সম্মান করে। এর পাশাপাশি পুজো কমিটিগুলোকে রবিবার থেকেই এক লক্ষ টাকা করে অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে শহরের বড়ো পুজো কমিটিগুলো এই অনুদান নিতে অস্বীকার করেছে এবং সেই অর্থ গ্রামীণ ও মহিলা পরিচালিত পুজো কমিটিগুলোকে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। পাশাপাশি, পুজো উপলক্ষ্যে বিদ্যুতের শুল্ক এবং দমকলের অনুমোদন ফি মকুবের কথাও জানিয়েছেন তিনি। কলকাতায় সিএসসি এবং রাজ্যের অন্যত্র ডব্লিউবিএসইডিসিএল বিদ্যিতের জন্য কোনও অর্থ নিচ্ছে না বলেও দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী।
ইডেনের অনুষ্ঠান ছাড়াও দুর্গাপুর, শিলিগুড়ি, কৃষ্ণনগর, কোচবিহার, মালদহ, বহরমপুর ও দিঘায় মহাসপ্তমী পর্যন্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, এবছর পুজোর অনুমতি পেতে কাউকে হাই কোর্টে যেতে হয়নি। আগামী বছরের জন্য ১২, ৪০০ টি নতুন দুর্গাপুজোকে অনুমোদন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে কলকাতা পুলিশের অধীনে ৪০০টি পুজো ও রাজ্য পুলিশের আওতায় নতুন ১২ হাজার নতুন পুজোর আয়োজন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রশাসনের তরফে আগামী ২৪ অক্টোবরের মধ্যে দুর্গা প্রতিমা নিরঞ্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সেরা প্রতিমা, সেরা পুজো এবং পরিবেশ সচেতনতার জন্য বিশেষ পুরস্কারও দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন তিনি। দুর্গাপুজোয় ইউনেস্কোর স্বীকৃতির জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ২০২৩ সালে ভিক্টোরিয়ায় পুজোর উদ্বোধনের জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
দেবী বন্দনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানেন শুভেন্দু অধিকারী। মন্ত্রোচ্চারণের পর তিনি দেশ গঠনের বার্তা দিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত গড়ে তোলার জন্য শক্তি প্রার্থনা করছেন তিনি। ভারতবিরোধী শক্তিকে পরাস্ত করার প্রার্থনার পাশাপাশি রাজ্যবাসীকে দুর্গাপুজোর শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এদিনের এই মেগা অনুষ্ঠানের জন্য স্ট্র্যান্ড রোড-সহ একাধিক রাস্তায় পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ ছিল। কলকাতা ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে শনিবার ভোর চারটে থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছিল।