বৃদ্ধের সম্পত্তি রক্ষার আইনি লড়াই, আইনজীবীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা খারিজ হাইকোর্টে

Image: AI নির্মিত

বৃদ্ধের সম্পত্তি রক্ষার আইনি লড়াইয়ে পাশে দাঁড়ানোর কথা ছিল আইনজীবীর। কিন্তু সেই সম্পত্তিরই মালিকানা হস্তান্তর ঘিরে উঠেছিল প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ। শেষ পর্যন্ত সেই মামলাতেই বড় স্বস্তি পেলেন অভিযুক্ত আইনজীবী। সম্পত্তির মালিকানা ও দলিলের বৈধতা নিয়ে দেওয়ানি আদালতে মামলা চলার মধ্যে একই অভিযোগে ফৌজদারি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া অনভিপ্রেত এবং আইনের প্রক্রিয়ার অপব্যবহার। এই পর্যবেক্ষণ করে আইনজীবীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআর, চার্জশিট-সহ গোটা ফৌজদারি মামলা খারিজ করে দিল কলকাতা হাইকোর্ট।

বিচারপতি উদয় কুমার তাঁর নির্দেশে জানান, দেওয়ানি বিরোধ মেটানোর জন্য ফৌজদারি আইনের আশ্রয় নেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষত, যখন সম্পত্তির মালিকানা, দলিলের বৈধতা এবং আর্থিক লেনদেনের মতো বিষয় দেওয়ানি আদালতের বিচারাধীন, তখন একই অভিযোগে সমান্তরাল ফৌজদারি বিচার চলতে দেওয়া বিচারপ্রক্রিয়ার অপব্যবহারের কারণ হতে পারে।

মামলার সূত্রপাত উত্তর ২৪ পরগনার চণ্ডীবেড়িয়া, নিউ আদর্শপল্লির একটি বাড়িকে কেন্দ্র করে। প্রায় দুই কাঠা জমির উপর দোতলা বাড়িটির মালিক ছিলেন ৭৭ বছরের এক বৃদ্ধ। অভিযোগ, ছেলে ও পুত্রবধূর অত্যাচারে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। কলকাতায় মেয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার পর নিজের সম্পত্তির দখল ফিরে পেতে এক আইনজীবীর সাহায্য চান। সেই সূত্রেই আদালতের দ্বারস্থ হন বৃদ্ধ। ২০২১ সালের ১৫ জুলাই পুলিশি সহায়তায় সম্পত্তির দখলও ফিরে পান তিনি।


কিন্তু অভিযোগ, এরই মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে অন্য সমীকরণ তৈরি হয়। বৃদ্ধের বয়সের কথা উল্লেখ করে আদালত ও থানায় বারবার যাতায়াতের অসুবিধার যুক্তি দেখিয়ে ২০২১ সালের ২৪ মার্চ আইনজীবীর এক সহ-অভিযুক্ত সহযোগীর নামে রেজিস্ট্রি করা জেনারেল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তৈরি হয়। পরদিন, ২৫ মার্চ সেই অ্যাটর্নি হোল্ডার রেজিস্ট্রি করা বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তি আইনজীবীর নামে হস্তান্তর করেন।

পরে ঝাড়খণ্ড থেকে নাতনির বিয়ের অনুষ্ঠান সেরে ফিরে বৃদ্ধ অভিযোগ করেন, বাড়ির তালা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ভেঙে ফেলা হয়েছে ভাড়ার চারটি ঘর ও একটি বাথরুম। তাঁর আরও অভিযোগ, জোর করে সম্পত্তির দখল নেওয়া হয়েছে। এরপরেই প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, অনধিকার প্রবেশ, ভাঙচুর, হুমকি ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে এফআইআর দায়ের হয়। তদন্তের পরে পুলিশ চার্জশিটও জমা দেয়।

অন্যদিকে, সম্পত্তির অধিকার ও দলিলের বৈধতা নিয়ে বারাসতের দেওয়ানি আদালতে মামলা করেন আইনজীবী। ২০২৩ সালের ৩ মার্চ অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞার আবেদন বিবেচনা করে দেওয়ানি আদালত জানায়, সেই পর্যায়ে প্রতারণার প্রাথমিক প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সম্পত্তির দখল রক্ষায় নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়।

হাইকোর্টে আইনজীবীর দাবি ছিল, রেজিস্ট্রি করা দলিল, ব্যাঙ্কের মাধ্যমে লেনদেন এবং অর্থপ্রাপ্তির রসিদ রয়েছে। ফলে সম্পত্তির লেনদেনকে সরাসরি প্রতারণা বলে চিহ্নিত করা যায় না। পাল্টা অভিযোগকারীর পক্ষের বক্তব্য ছিল, আইনি সহায়তা নিতে আসা এক প্রবীণের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর সম্পত্তি নিজের নামে করিয়ে নেওয়া হয়েছিল। বিক্রয়মূল্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।

দুই পক্ষের বক্তব্য ও নথিপত্র বিবেচনা করে হাইকোর্ট জানায়, দেওয়ানি ও ফৌজদারি প্রতিকার একে অপরের বিকল্প নয়। একই ঘটনায় দুই ধরনের দায় তৈরি হতে পারে। তবে প্রতারণার অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে লেনদেনের শুরু থেকেই অসৎ উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ। দেওয়ানি বিরোধকে ফৌজদারি মামলার মাধ্যমে চাপ তৈরির হাতিয়ার করা যায় না।

আরও পড়ুন: রাজধানীকে টপকে ধোঁয়াশায় মুখ ডুবিয়েছে মায়ানগরী! বাড়ছে উদ্বেগ

শেষ পর্যন্ত বিচারপতি উদয় কুমার আইনজীবীর আবেদন মঞ্জুর করে বারাসতের মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচারাধীন সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি মামলা-সহ এফআইআর ও চার্জশিট খারিজ করেন। তবে এই নির্দেশকে সম্পত্তির চূড়ান্ত মালিকানা নির্ধারণের রায় হিসেবে দেখা যাবে না।