বিচ্ছেদের পর দু’একবার কাছে আসা মানেই ‘ক্ষমা’ নয়, দাম্পত্যে নির্যাতনের ক্ষত মুছে যায় না: হাইকোর্ট

Photo: বিচ্ছেদের পর দু’একবার কাছে আসা মানেই ‘ক্ষমা’ নয় (AI)

বিচ্ছেদের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দু’-একবার সহবাস বা ফের একসঙ্গে থাকার ঘটনা থাকলেই আগের মানসিক নির্যাতনকে ‘ক্ষমা করে দেওয়া’ হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপড়েনকে বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনার নিরিখে নয়, সামগ্রিক পরিস্থিতির ভিত্তিতেই বিচার করতে হবে। এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ কলকাতা হাইকোর্টের।

মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে স্বামীর পক্ষে দেওয়া বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেছিলেন স্ত্রী। সেই আবেদন খারিজ করে বিবাহবিচ্ছেদের রায় বহাল রাখল বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য ও সুপ্রতিম ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চ। আদালতের বক্তব্য, বিচ্ছেদের পর কোনও কোনও সময়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সহবাস বা একসঙ্গে থাকা ঘটলেও, পরবর্তী সময়ে নির্যাতনমূলক আচরণ চলতে থাকলে শুধু সেই কয়েকটি ঘটনাকে নির্যাতন ক্ষমা করে দেওয়ার প্রমাণ বলা যায় না।

২০০৯ সালে বিশেষ বিবাহ আইনে তাঁদের বিয়ে। ২০১৩ সালে তাঁদের সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যত আলাদা হয়ে যান দু’জন। দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর ধরে আলাদা থাকা, একাধিক মামলা এবং আদালতের উদ্যোগে মধ্যস্থতাও শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক জোড়া লাগাতে পারেনি।


স্ত্রীর অভিযোগ ছিল, শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতন, গর্ভপাত করাতে বাধ্য করা, গয়না আটকে রাখা এবং স্বামীর হাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি। অন্যদিকে স্বামীর অভিযোগ, মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য স্ত্রী চাপ দিতেন, তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করার হুমকি দিতেন এবং ব্যবসার জায়গায় গিয়ে তাঁকে প্রকাশ্যে অপমান ও হেনস্থা করতেন।

দু’পক্ষের বক্তব্য ও নথি খতিয়ে দেখে বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, গুরুতর কিছু অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট সমর্থন বা সমসাময়িক প্রমাণ মেলেনি। বরং একাধিক ঘটনায় স্ত্রীর বক্তব্যে অসঙ্গতিও রয়েছে। স্বামীর বিরুদ্ধে করা একটি ফৌজদারি মামলাতেও পর্যাপ্ত সাক্ষ্য ও চিকিৎসা-প্রমাণের অভাবে তিনি খালাস পান।

আদালত মনে করেছে, একক কোনও ঘটনা নয়, দীর্ঘদিন ধরে চলা অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, প্রকাশ্য অপমান এবং সম্পর্কের তিক্ততার ধারাবাহিকতাই এই দাম্পত্যকে কার্যত ভেঙে দিয়েছে। আদালতের ভাষায়, মানসিক নির্যাতন এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর পক্ষে আর স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।

সুপ্রিম কোর্টের একটি মামলার নীতির উল্লেখ করে বেঞ্চ জানায়, দীর্ঘ বিচ্ছেদ ও ক্রমাগত তিক্ততার মধ্যে একটি কার্যত ভেঙে যাওয়া দাম্পত্যকে জোর করে টিকিয়ে রাখা দু’পক্ষের জন্যই অন্যায় হতে পারে।

ফলে ৩০ ডিসেম্বর ২০২১-এ কলকাতা ফ্যামিলি কোর্টের দেওয়া বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি বহাল রাখল হাই কোর্ট। তবে একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেছে, এই রায় স্ত্রীকে আইন অনুযায়ী স্থায়ী খোরপোষ চাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে না।

অর্থাৎ, সম্পর্কের ইতি টানলেও তাঁর আর্থিক অধিকারের দরজা বন্ধ হচ্ছে না,বিচ্ছেদ মানেই একজনের সমস্ত অধিকার শেষ হয়ে যাওয়া নয়, সেই মানবিক দিকটিও আদালত তার রায়ের মধ্যে স্পষ্ট করেছে।