পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় উল্লেখ পর্বে শাসক-বিরোধী উভয়পক্ষের বিধায়কদের তোলা বিষয়ের উত্তর সাতদিনের মধ্যে দেওয়ার জন্য মন্ত্রীদের সময়সীমা বেঁধে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এমনকী নিজে সেই বিষয়গুলির উপর নজর রাখবেন এবং প্রত্যেক তিন মাস অন্তর কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট পাঠানোর ঘোষণাও করেন তিনি। সোমবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী। বিধায়কদের আর্জি বা এলাকার কোনও সমস্যা নিয়ে মন্ত্রীদের ফাইল আর দিনের পর দিন লাল ফিতের ফাঁসে আটকে থাকবে না। বিধায়কদের করা আবেদনের নিষ্পত্তি করতে হবে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বলে বিধানসভয় দাঁড়িয়ে জানিয়ে দিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। যার প্রশংসা করলেন বিদ্রোহী শিবিরের বিধায়ক ফিরহাদ হাকিম।
এদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্য বিধানসভায় ঘোষণা করেন, উল্লেখ পর্বে বিধায়করা যেসব বিষয় উত্থাপন করেছেন সেসব নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সেগুলির উত্তর দিতে হবে। তিনি নিজেও এই বিষয়গুলির উপর নজর রাখবেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণায় রীতিমতো শোরগোল পড়ে যায় বিধানসভায়। শাসক-বিরোধী, উভয় পক্ষের বিধায়করাই টেবিল চাপড়ে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘বিধানসভার উল্লেখ পর্বে বিধায়কদের জানানো দাবি স্পিকার যেন নির্দেশ দেন আগামী সাতদিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠাতে হবে। দপ্তর সেইসব দাবি খতিয়ে দেখবে। তারপর সাতদিনের মধ্যেই বিধানসভায় উত্তর দিতে হবে। এমনকী সংশ্লিষ্ট বিধায়ককে জানাতে হবে।’
অন্যদিকে বিধায়কদের যেসব আর্জি তৎক্ষণাৎ সমাধান করা যাবে না তার জন্য সময় নিয়ে নিতে হবে। এই পথও দেখিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। আর তাই শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় বলেন, ‘যা করা সম্ভব সেটা করতে হবে। আর যেটা সম্ভব নয় তার কারণ জানাতে হবে অথবা প্রয়োজনে বাড়তি সময় চেয়ে নিতে হবে। বিধায়কদের তোলা যে কোনও আবেদনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর দপ্তরকে একসপ্তাহের মধ্যে সেই বিধায়ককে লিখিতভাবে রাজ্য সরকারের অবস্থান জানিয়ে দিতে হবে। মন্ত্রীরা যখন বিধায়ককে চিঠি পাঠাবেন তখন, শুধু ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বললেই চলবে না। কাজটা ঠিক কতদিনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব, সেটার নির্দিষ্ট সময়সীমাও জানাতে হবে। আর যদি কোনও কারণে কাজটি করা সম্ভব না হয়, তবে তার স্পষ্ট কারণও ব্যাখ্যা করতে হবে। যে দাবি বিধায়ক তুলেছেন সেই কাজ করতে পারলে করতে হবে। না করতে পারলে কেন করা যাচ্ছে না, কেন দপ্তর করতে পারছে না, সেটাও জানাতে হবে। যদি সেই কাজ করতে গিয়ে দেরি হয় সেটাও বলতে হবে। দেরি হওয়ার কারণও জানাতে হবে।’
তাছাড়া মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, বিধানসভার সচিবালয় থেকে সংশ্লিষ্ট তালিকা তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারির কাছে পাঠাতে হবে এবং মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয় থেকে সেটা মনিটরিং করা হবে। তিনি নিজে প্রত্যেক তিন মাস অন্তর কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট পাঠাবেন বলেও জানান। শুভেন্দু অধিকারীর কথায়, ‘বিধানসভার সচিবালয় যেন চিফ মিনিস্টার অফিসে তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারির কাছে ওই সব দাবির তালিকা পাঠান। যা বিধানসভায় বিধায়করা তুলেছেন। তিনিও সেগুলি খতিয়ে দেখবেন। ৩ মাস অন্তর কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট দেবেন। কারণ বিধানসভা মানুষের দাবিদাওয়া পূরণের জায়গা।’ আর স্পিকার রথীন্দ্র বসুকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি সচিব মহোদয়কে নির্দেশ দিন। উল্লেখ পর্বে যে বিষয়গুলি বিধায়করা উল্লেখ করেছেন, সাতদিনের মধ্যে সেগুলি যেন সরকারি দপ্তরে পৌঁছয়।’ এরপরই স্পিকারের কাছে সময় চেয়ে বসেন ঋতব্রত শিবিরের বিধায়ক ফিরহাদ হাকিম। সময় পেতেই ফিরহাদ প্রশংসা করে বলেন, ‘নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করলেন মুখ্যমন্ত্রী। এর আগে আমিও বিরোধী এমএলএ ছিলাম। কিন্তু এভাবে বিধায়কদের সম্মান দিয়ে, আমরা যেটা বলছি সেটার অ্যাকশন কী হচ্ছে, সেটা এর আগে বিধানসভার ইতিহাসে হয়নি। মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা শুধু বিগত ১৫ বছর নয়, তার আগেও কখনও এই বিধানসভায় দেখা যায়নি। এটি একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা। এটা যদি হয় নিশ্চিতভাবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে। তাই তার জন্য ধন্যবাদ।’