দলের নাম-প্রতীক ফ্রিজ হওয়ার পর শনিবার প্রথম কলকাতার বাইরে জেলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনসভা হয়। শ্রীরামপুরে মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের ওই জনসভায় ভিড়ের পরিসংখ্যান তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একইসঙ্গে সিপিএম, তৃণমূল এবং কংগ্রেসকে তুলোধনা করলেন তিনি। রবিবার সাংবাদিক বৈঠক করে এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে ক্লিনচিট দিলেন তিনি। সদ্য একটি ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্রে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেশজুড়ে তোলপাড় হয়ে গিয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেওয়া হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। তাতে ভোট চুরি হয়েছে বলেই কার্যত সিলমোহর পড়েছে।
এই ইস্যুতে এখন বিরোধীরা এককাট্টা হয়ে গিয়েছে। দেশজুড়ে নানা প্রান্তে আন্দোলন শুরু হয়েছে। এমনকী খোদ সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি চিঠি লেখেন ও ফোন করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীও ফোন করেন তৃণমূলনেত্রীকে। আর এবার গোটা বিষয়টি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর তোপ, ‘শ্রীরামপুর কোর্ট ময়দানে সর্বসাকুল্যে ৫০০ লোক হয়েছে। তার সিংহভাগই পুলিশ ও মিডিয়ার লোক। তৃণমূল-সিপিএমের ভালবাসা, যে তৃণমূলের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সিপিএমের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য। সেই সিপিএমের সঙ্গে বিধানসভার ভিতর থেকে শুরু করে গতকাল ওদের সর্বভারতীয় সম্পাদকের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলা, পত্রালাপ করা, যৌথভাবে আন্দোলন করতে হবে বলা হয়েছে। আমি বলব আপনারা যৌথভাবে কেরলেও আন্দোলন করুন। শুধু পশ্চিমবঙ্গ আর বিহারে কেন করবেন? কেরলে রাহুল গান্ধী, এমএ বেবি আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেন একসঙ্গে থাকবেন আশা করি।’
এখানেই শেষ নয়, একের পর এক বাক্যবাণে এই তিন দলকে বিধেঁছেন মুখ্যমন্ত্রী। অতীতের নানা কথা টেনে এনেছেন। গুন্ডা দমন বিল নিয়ে চলা গুজব এবং এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়েও সুর চড়িয়েছেন তিনি। এদিন শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘গত বিধানসভা নির্বাচনে আমরা ২০৮টি আসন জিতেছি। ওরা দুই পক্ষ মিলিয়ে ৮০টা আসন জিতেছে। প্রায় দুই কোটি ৪৭ লক্ষের বেশি ভোট পেয়েছে। তাঁরা এই নির্বাচনকে অস্বীকার করেছে। আর নির্বাচনী ব্যবস্থায় এসআইআর, ফর্ম ৬ সবটা নিয়ে অনেকগুলি প্রশ্ন তুলেছে ওই সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ। কিছু কিছু চ্যানেল বিজেপির জয় নিতে পারছে না। তারাও তাদের সঙ্গ দেওয়ার কাজ করেছে। যখন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, তখন কংগ্রেস থেকে ঘাড় ধাক্কা খেয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই রাজ্যে কমিউনিস্ট শাসনকে শেষ করার জন্য ওনাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন অটলজি। ৩৪ বছরের সিপিএমের অত্যাচার, অবিচার, সীমাহীন মানবাধিকার লঙ্ঘন, নন্দীগ্রাম থেকে নেতাই পর্যন্ত, তার উপরে দাঁড়িয়ে। সিপিএম এখন ওঁদের বন্ধু হয়েছে। সেই বন্ধুত্ব আমরা কিছুদিন আগে বিধানসভার ভিতরেও দেখেছি। অধ্যাপক সংক্রান্ত বিলে সমর্থন না করে ওয়াকআউট করলেন, সেদিন আমরা দেখলাম ১৫টি ভোট পড়েছিল। তার মধ্যে মমতা তৃণমূলও ছিল, ডোমকলের বিধায়কও ছিলেন। যে তৃণমূল সিপিএমের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, সেই মমতা তৃণমূল সিপিএমের সঙ্গে হাত মেলালেন।’
এদিন সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও ধুয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে নাম নেননি। সেখানেই গুন্ডাদমন বিলের প্রসঙ্গ তুলে আনেন। শুভেন্দু অধিকারীর কটাক্ষ, ‘একটি বিল নিয়ে কিছু সংবাদমাধ্যম এবং ডায়মন্ডহারবারের সাংসদের এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করার মধ্য দিয়ে যা করেছিলেন, সেটাও গতকাল পিআইবি মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়েছে। শনিবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনারদের যৌথভাবে বসায় প্রমাণ হয়েছে এসআইআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এককভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের এক্সট্রা অর্ডিনারি পাওয়ার ব্যবহার করে আর্টিক্যাল ১৪২-তে জজদের নিয়োগ করে ৬০ লক্ষ লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির মধ্যে ২৭ লক্ষ নাম বাতিল করা, তার দায়ভার কেন্দ্র-রাজ্য সরকারের কোনও আধিকারিক বা বিজেপির নয়। আপনাদের করা মামলাতে সুপ্রিম কোর্ট ও জুডিশিয়ারির সিদ্ধান্ত এটা পরিষ্কার করে বলে দিতে চাই।’
তাছাড়া তৃণমূলের বিরুদ্ধে চুরি-দুর্নীতি নিয়ে অভিযান যত তীব্র হচ্ছে তত ভয় পাচ্ছে। তার উপর জনরোষের মুখে পড়তে হচ্ছে। এই দুর্নীতির কারণে তৃণমূলের লোকেরা নিজেরাই রাস্তায় বেরোতে ভয় পাচ্ছেন বলে দাবি মুখ্যমন্ত্রীর। এখানেই তীব্র ভাষায় শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, ‘ক্ষয়িষ্ণু মহাশূন্যে বিচরণ করা সিপিএম, আর সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়াই করা মমতা তৃণমূল কংগ্রেস একে অপরের হাত ধরে গত কদিন ধরে সাংবাদিক সম্মেলন, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, কার্যত জনশূন্য শ্রীরামপুর কোর্ট ময়দানের সভাতে ১৫০ জন লোক ছিল। ১৭০ পুলিশ ছিল। তার মধ্যেই উনি ঘণ্টা চারেক যে ভাষায় কথা বলে গিয়েছেন, ঠিক একই ভাষায় রেজিনগরে গিয়ে কথা বলেছেন একাধিক নির্বাচনে হারা সেলিম সাহেব। বারবার হেরেছেন। এবারের নির্বাচনে লড়ার রিস্ক নেননি। তিনিও একই ভাষায় কথা বলেছেন।’