জইশ জঙ্গি হামিম মণ্ডলকে শুক্রবার বর্ধমান থেকে গ্রেপ্তার করেছিল বেঙ্গল এসটিএফ। এবার তদন্তকারীরা গ্রেপ্তার করল জঙ্গি হামিমের সুন্দরী বান্ধবী। লাস্যময়ী এই যুবতী হানিট্র্যাপের কাজ করত বলেই জানতে পেরেছে এসটিএফ। ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ থেকে অর্পিতা সরকার নামে ওই যুবতীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনিবার তাঁকে বর্ধমান হয়ে নিয়ে আসা হয়েছে কলকাতায়। এই মামলায় এটি দ্বিতীয় গ্রেপ্তার। হামিমের ফোনের সূত্র ধরেই এবং ফোনের টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করেই ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ থেকে অর্পিতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হামিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল অর্পিতার। আর হানিট্র্যাপের মাধ্যমে অপহরণ করার ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ পেত অর্পিতা সরকার। এদের নিয়ে একটি সংগঠিত চক্র গড়ে উঠেছিল বলে জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা।
এদিকে বর্ধমানের রেনেসাঁ আবাসনে অভিযান চালিয়ে জঙ্গি হামিমকে আগেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সে পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদের সক্রিয় সদস্য বলেই তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে এসটিএফ। হামিমকে জেরা করে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে তদন্তকারীরা বলে সূত্রের খবর। বর্ধমানে বসেই হামিম নতুন একটি জঙ্গি মডিউল তৈরির কাজ করছিল। বান্ধবী অর্পিতাকে ব্যবহার করত ‘হানিট্র্যাপ’ হিসেবে। সমাজমাধ্যমে প্রেমের ফাঁদ পেতে প্রথমে ঘনিষ্ঠতা বাড়াত অর্পিতা। তারপর মগজ ধোলাই করে ‘টার্গেটকে’ কবজা করত সে। লাস্যময়ী যুবতীর ফাঁদে পা দিলেই খেলা শেষ। এভাবে গোপন তথ্য হাতানো অথবা জঙ্গি দলে টেনে আনার কাজ চলত। এটাই ছিল অর্পিতার কাজ।
অন্যদিকে শাহজাদ গোষ্ঠী থেকে শুরু করে পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-সহ পাকিস্তানের নানা জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে অর্পিতা সরকারের সরাসরি যুক্ত থাকার প্রমাণ মিলেছে। সমাজমাধ্যমেই যোগাযোগ করা হতো অর্পিতার সঙ্গে পাকিস্তান থেকে। হানিট্র্যাপ করে নানা ব্যক্তিদের অপহরণের অ্যাসাইনমেন্ট অর্পিতাকে দেওয়া হয়েছিল। এই নিয়ে তদন্তের গতি বাড়িয়েছে এসটিএফ। হামিম মণ্ডলকে আপাতত ১৪ দিনের এসটিএফ হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সুতরাং হামিম-অর্পিতাকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করতে পারেন তদন্তকারীরা। সেখান থেকে উঠে আসতে পারে আরও গোপন তথ্য। অর্পিতা আমলা এবং গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিকদের যৌনতার ফাঁদে ফেলে গোপন তথ্য জেনে নিত। আর তা পাচার করে দিত পাকিস্তানে বলে সূত্রের খবর। হামিমই এই তথ্য জেরায় স্বীকার করেছে বলে এসটিএফ সূত্রে খবর।
তাছাড়া কাদের ফাঁদে ফেলার ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ অর্পিতা সরকারকে দেওয়া হয়েছিল এবং সে তার লক্ষ্যে সফল হয়েছিল কিনা সেটা তদন্ত করে দেখছেন বেঙ্গল এসটিএফের অফিসাররা। হামিম মণ্ডল এবং অর্পিতা সরকারকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করা হতে পারে বলে সূত্রের খবর। অডিও ক্লিপিং, অ্যাপ ব্যবহার করে পাকিস্তান থেকে আসা নির্দেশ পালন করত হামিম-অর্পিতা। নানা জায়গার রেইকি করা থেকে শুরু করে নানা ব্যক্তিত্বদের খবর পাঠানো হতো পাকিস্তানে। এদের সঙ্গে আরও কারা জড়িত সেটা জানতে হামিমকে দফায় দফায় জেরা করা হচ্ছে। হামিম মণ্ডল পুলওয়ামা হামলার অন্যতম মূলচক্রী সাজ্জাদ ভাটের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তার দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলে এসটিএফ সূত্রে খবর। বর্ধমানের ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়ার আগে হামিম মণ্ডল কলকাতার নিউটাউন এলাকার একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকছিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিউটাউনের বাসভবনে যাতায়াতের জন্য যে রাস্তা ব্যবহার করতেন, সেখানে এই জঙ্গি রেইকি করেছিল।
সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাই-সহ আরও ভিআইপিরা টার্গেট ছিল। কাশ্মীরে জইশ-ই-মহম্মদের শীর্ষ হ্যান্ডলারদের সঙ্গে হামিম-অর্পিতা নিয়মিত কথাবার্তা বলত। তাদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত ডিভাইস, মোবাইল এবং নানা সংবেদনশীল নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অর্পিতাকে দেওয়া হানিট্র্যাপের দায়িত্ব। হামিমের বাড়ি পূর্ব বর্ধমান জেলার কুসুমগ্রামে। হাওড়ার পিলখানা এলাকায় একটি রেডিমেড জামাকাপড় তৈরির কারখানায় বারকোড লাগানোর কাজ করত জঙ্গি হামিম। তবে এই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। আন্তর্জাতিক যোগ মিলেছে। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছে। এসটিএফ তদন্ত করছে। ধৃতের মোবাইল-সহ তার নানা ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে কী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে সেটা খতিয়ে দেখছে এসটিএফ। যা বলার এসটিএফই বলবে।’