জলবায়ু পরিবর্তনের দায় নিয়ে ফের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের পার্থক্যের কথা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর বক্তব্য, গোটা বিশ্বের কার্বন নিঃসরণের দায় প্রায়ই ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলির ঘাড়ে চাপানো হয়। অথচ মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের হিসাবে ভারত এখনও বিশ্বের গড়ের অর্ধেকেরও কম। উন্নত দেশগুলির মাথাপিছু নিঃসরণ ভারতের তুলনায় প্রায় ৬ গুণ বেশি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। শনিবার দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে ‘দ্য ফিউচার অফ এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ক্লাইমেট ডায়নামিক্স’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধন করেন নরেন্দ্র মোদী।
ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল বা জাতীয় পরিবেশ আদালতের উদ্যোগে দু’দিন ধরে এই সম্মেলন হচ্ছে ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর। ১৭টি দেশের বিচারপতি ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, সরকারি আধিকারিক এবং বিভিন্ন পরিবেশ সংস্থার প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নিয়েছেন। সম্মেলনে মোদী বলেন, ‘কার্বন নিঃসরণের দায় প্রায়ই ভুলভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলির উপর চাপানো হয়।’ তাঁর কথায়, ঐতিহাসিক বাস্তবতা হল, আজও ভারতের মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ বিশ্ব গড়ের অর্ধেকেরও কম। তাই জলবায়ু সমস্যার মোকাবিলায় দায়বদ্ধতার প্রশ্নে উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির পরিস্থিতি এক করে দেখা উচিত নয়।
কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে চিন ও আমেরিকার কথাও উঠে আসে। বিশ্বে মোট কার্বন নিঃসরণের বড় অংশ আসে এই দুই দেশ থেকে। চিনের মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ প্রায় ৯.২৪ টন এবং আমেরিকার ক্ষেত্রে তা প্রায় ১৩.৮৩ টন। সেখানে ভারতের মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ প্রায় ২.০৭ টন। বিপুল জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও ভারতের মাথাপিছু নিঃসরণের পরিমাণ যে তুলনামূলকভাবে কম, সেই বিষয়টিই তুলে ধরতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ভারতের পরিবেশ বিষয়ক পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, গত ১২ বছরে পরিবেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে সৌরশক্তি-সহ পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ১২ বছর আগে ভারতে সৌরবিদ্যুতের ক্ষমতা ছিল প্রায় ২ গিগাওয়াট। এখন তা ১৬০ গিগাওয়াটেরও বেশি। সেই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানি ছাড়া অন্য শক্তি, যেমন সৌরশক্তি, জলবিদ্যুৎ, পারমাণবিক শক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং অন্যান্য পরিবেশবান্ধব শক্তির ক্ষেত্রেও অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন তিনি।
মোদীর বক্তব্যে আসে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির প্রসঙ্গও। মোদীর দাবি, জি-২০ দেশগুলির মধ্যে ভারতই একমাত্র দেশ, যারা ২০১৫ সালের প্যারিস সম্মেলনে (কপ-২১) দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি নির্ধারিত সময়ের আগেই পূরণ করেছে। পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে দেশের উন্নয়নকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষেও সওয়াল করেন তিনি। তাঁর কথায়, ভারতের উন্নয়ন যেমন দ্রুত, তেমনই টেকসই হওয়া দরকার।
তবে শুধু একটি বা কয়েকটি দেশের পক্ষে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয় বলেও বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিশ্বব্যাপী সমস্যার মোকাবিলায় সব দেশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে বলে জোর দেন তিনি। সম্মেলনের লক্ষ্যও সেই যৌথ উদ্যোগের পথ খোঁজা। পরিবেশ ও জলবায়ু সংক্রান্ত নীতি, তার প্রয়োগ এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচার নিয়ে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময় করা।
আরও পড়ুন: খরস্রোতা নালায় পড়ল পুণ্যার্থীদের গাড়ি, ৩ শিশু-সহ মৃত ৮
শনিবার উদ্বোধনী অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব, অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরামণি এবং এনজিটি-র চেয়ারপার্সন বিচারপতি প্রকাশ শ্রীবাস্তব। এনজিটি-র মতে, এই সম্মেলন বিশ্বের পরিবেশ ও জলবায়ু সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলি নিয়ে আলোচনার একটি মঞ্চ। এই মঞ্চ নীতি প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঘাটতি চিহ্নিত করা, সফল দৃষ্টান্ত বিনিময় করা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার উপর আলোকপাত করবে। এর লক্ষ্য হল বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিবেশ এবং জলবায়ু বিষয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা।