ভারত ও উজবেকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমাত্রিক করে তোলার বার্তা দিয়ে দু’দিনের সরকারি সফর শেষ করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। রবিবার তাসখন্দে উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োয়েভের সঙ্গে বৈঠকের পর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর (Narendra Modi) হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে উজবেকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘ওলি দারাজালি দোস্তলিক’ অর্ডার। দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে মোদীর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান দেওয়া হয়েছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইউরেনিয়ামের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করতেও এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের উপর নির্ভরতা কমিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন ইউরেনিয়াম উৎপাদনকারী দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে নয়াদিল্লি। সেই নীতির অংশ হিসেবেই উজবেকিস্তানের সঙ্গে এই চুক্তিকে দেখা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য ইউরেনিয়াম উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে উজবেকিস্তানের সঙ্গে সরবরাহ চুক্তি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
এ দিনের বৈঠকে তিনটি ‘সিস্টার-সিটি’ এবং ‘সিস্টার-স্টেট’ চুক্তিও চূড়ান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। উজবেক প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, গত বছর ভারত ও উজবেকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ১০০ কোটি ডলারের গণ্ডি পেরিয়েছে। আগামী কয়েক বছরে সেই পরিমাণ আরও বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে দুই দেশের।
নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নিয়েও দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছে। উজবেকিস্তান বর্তমানে ‘নিউ তাসখন্দ’ নামে একটি নতুন শহর গড়ে তুলছে। এই প্রকল্পের প্রসঙ্গে ভারতের গুজরাতের ‘গিফট সিটি’-র উদাহরণ তুলে ধরেন মোদী। আধুনিক নগর পরিকল্পনা, পরিকাঠামো এবং আর্থিক পরিষেবা ক্ষেত্রে গিফট সিটির অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে উজবেকিস্তানের একটি প্রতিনিধিদলকে ভারতে আসার আমন্ত্রণও জানান তিনি। ফলে দুই দেশের সহযোগিতার পরিধি যে শুধু বাণিজ্য বা কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না, নগর উন্নয়নেও তা প্রসারিত হচ্ছে।
সফরের আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘোষণা ভারতীয় নাগরিকদের জন্য। উজবেকিস্তান জানিয়েছে, ভারতীয়রা সে দেশে গেলে ৩০ দিন পর্যন্ত ভিসা ছাড়াই থাকতে পারবেন। পর্যটন এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। বর্তমানে ভারত ও উজবেকিস্তানের মধ্যে ১৪টি সরাসরি বিমান চলাচল করে। ভিসামুক্ত প্রবেশের সুবিধা চালু হলে দুই দেশের মানুষের যাতায়াত আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে রবিবার তাসখন্দে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মোদীকে উজবেকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘ওলি দারাজালি দোস্তলিক’ প্রদান করা হয়। প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োয়েভ নিজে প্রধানমন্ত্রীর হাতে এই সম্মান তুলে দেন। ভারত ও উজবেকিস্তানের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারে মোদীর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান দেওয়া হয়েছে।
সম্মান গ্রহণ করে মোদী বলেন, এই স্বীকৃতি তাঁর কাছে অত্যন্ত গর্বের। তবে তিনি পুরস্কারটিকে ব্যক্তিগত সম্মান হিসেবে না দেখে ১৪০ কোটি ভারতবাসী এবং ভারত-উজবেকিস্তানের বন্ধুত্বকে উৎসর্গ করেন। ‘দোস্তলিক’ শব্দের অর্থ বন্ধুত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সম্মান দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের প্রতীক।
সফরের শুরুতেই তাসখন্দে প্রবাসী ভারতীয়দের উষ্ণ অভ্যর্থনা পান প্রধানমন্ত্রী (Narendra Modi)। ভারতীয় সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও অংশ নেন তিনি। কত্থক এবং আন্দিজান পোলকা নৃত্য পরিবেশনের পাশাপাশি উজবেকিস্তানের খুদে শিল্পীদের জনপ্রিয় ভারতীয় গান ‘উড়ে জব জব জুলফে তেরি’-র সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনও নজর কাড়ে। মোদী জানান, প্রবাসী ভারতীয়রা দুই দেশের মধ্যে সেতুবন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।