বৈবাহিক জীবনের অশান্তি এবং আইনি টানাপড়েনের মর্মান্তিক পরিণতি দেখা গেল মহারাষ্ট্রে। স্ত্রীর দায়ের করা বধূ নির্যাতনের মামলা ঘিরে মানসিক ও সামাজিক চাপের অভিযোগ তুলে আত্মঘাতী হলেন ২৪ বছরের এক যুবক। মৃতের নাম বিশ্বরাজসিং ময়ূরসিং গোহিল। গুজরাতের ভাবনগরের বাসিন্দা ওই যুবক পেশায় ডাক বিভাগের কর্মী ছিলেন। মৃত্যুর আগে প্রায় ১৩ মিনিটের একটি ভিডিও রেকর্ড করেন তিনি। সেখানে নিজের বৈবাহিক সম্পর্কের টানাপড়েন, শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং বধূ নির্যাতন সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি বিয়ে হয়েছিল বিশ্বরাজের। তবে বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁদের সম্পর্কে ভাঙন ধরে। অভিযোগ, গত ১২ সেপ্টেম্বর তাঁর স্ত্রী বিশ্বরাজ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য হিংসা ও বধূ নির্যাতনের মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার প্রেক্ষিতে গত ৯ অক্টোবর আদালতে হাজিরাও দিতে হয়েছিল তাঁকে। এরপর মহারাষ্ট্রের কোঙ্কনকড়া পাহাড়ের প্রায় ১,৭০০ ফুট উঁচু খাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন ওই যুবক বলে জানা গিয়েছে।
মৃত্যুর আগে রেকর্ড করা ভিডিওতে বিশ্বরাজ নিজের মানসিক বিপর্যয়ের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, বৈবাহিক জীবনের মতপার্থক্য ও বিবাদ ক্রমশ এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যা তাঁর কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। বিয়েকে পবিত্র বন্ধন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দু’জন মানুষের চিন্তাভাবনা, স্বভাব ও অভ্যাসের অমিল থেকে সম্পর্কের মধ্যে সমস্যা তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই বিবাদ যখন আইনি লড়াইয়ে পরিণত হয়, তখন তার প্রভাব মানুষের জীবনে গভীরভাবে পড়ে।
ভিডিওতে স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগও তোলেন বিশ্বরাজ। তাঁর দাবি, সাধারণ দাম্পত্য কলহকেই বধূ নির্যাতনের অভিযোগে পরিণত করা হয়েছিল। তাঁর আরও অভিযোগ, স্ত্রীকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতনের যে দাবি মামলায় করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। বিশ্বরাজের বক্তব্য, এই মামলায় তাঁর মা ও ভাইয়ের নামও জড়ানো হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, পর্যাপ্ত প্রমাণ বা মেডিক্যাল রিপোর্ট যাচাই না করেই পুলিশ এফআইআর দায়ের করেছে। তবে এই অভিযোগগুলির স্বাধীন সত্যতা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের বিরুদ্ধে মানসিক, আর্থিক ও সামাজিক চাপ তৈরির অভিযোগও করেন ওই যুবক। তাঁর দাবি, স্ত্রীর পরিবারের লোকজন তাঁকে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় সোনার গয়না নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তারও অন্য ব্যাখ্যা রয়েছে। বিশ্বরাজের বক্তব্য, তাঁর স্ত্রী তাঁদের দেওয়া গয়না পরেই বাড়ি ছেড়েছিলেন। তাঁর দাবি, এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এলাকার কয়েক জন বাসিন্দা। যদিও এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য জানা যায়নি।
ভিডিওতে নিজের পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিশ্বরাজ। তাঁর বক্তব্য, এই মামলায় তাঁর ১৬ বছরের ভাইয়ের নামও জড়ানো হয়েছে। মৃত্যুর আগে তিনি প্রশ্ন তোলেন, তাঁর বাবা-মা এবং নাবালক ভাইয়ের কী হবে। শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির ফলে তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ছাড়াও, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ ধারার প্রয়োগ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিশ্বরাজ। তাঁর দাবি, এই ধারায় দায়ের হওয়া বহু মামলায় আইনের অপব্যবহার হচ্ছে এবং নির্দোষ ব্যক্তিরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ভিডিওতে তিনি আইন সংস্কারের দাবিও জানান। তবে ৪৯৮এ ধারায় দায়ের হওয়া ৯০ থেকে ৯২ শতাংশ মামলা মিথ্যা—ভিডিওতে করা তাঁর এই দাবির পক্ষে কোনও স্বাধীন পরিসংখ্যান বা প্রমাণ এখানে পাওয়া যায়নি। তাই ওই সংখ্যাকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
মৃত্যুর আগে প্রশাসন ও সমাজের কাছে আবেদন জানিয়ে বিশ্বরাজ বলেন, বধূ নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের পরিস্থিতি আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, আইনি লড়াইয়ের চাপে তাঁর জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তিনি নিজের ও পরিবারের জন্য ন্যায়বিচারের দাবিও জানান।
ঘটনার পর পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে। বিশ্বরাজের মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি, তাঁর তোলা অভিযোগ এবং মামলার সঙ্গে এই ঘটনার যোগসূত্র তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।