• facebook
  • twitter
Sunday, 18 January, 2026

মাত্র দু’হাজার টাকায় বাংলাদেশ থেকে প্রবেশ

ত্রিপুরা সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে তোলপাড়

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

আন্তর্জাতিক সীমান্তে কাঁটাতারের ফেন্সিং, উঁচু আলো, নজরদারি— সবকিছুকে উপেক্ষা করে দিনের পরে দিন বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ চলছেই ত্রিপুরার খোয়াই মহকুমায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাত্র দু’হাজার টাকার বিনিময়ে রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পেরিয়ে আসছেন বাংলাদেশিরা। আর সেই অনুপ্রবেশের পথ বানিয়ে দিচ্ছে একদল ভারতীয় দালালচক্র। অভিযোগ আরও গুরুতর— সীমান্তের দায়িত্বে থাকা সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাকি সব জেনেও নীরব!

স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, গত পনেরো দিনে খোয়াই থানার পুলিশই ধরে ফেলেছে মোট ২২ জন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে। তাঁদের দাবি, ‘প্রতিদিনই সীমান্তে অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছে— কে কত জনকে বাংলাদেশ থেকে এনে শহরে ঢোকাতে পারে।’ অভিযোগ, এই কাজে দালালদের সঙ্গে যুক্ত কিছু চালক এবং সীমান্তের পাহারায় থাকা কয়েকজন কর্মীও।

Advertisement

বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনাটি যেন আগুনে ঘি ঢেলেছে। করঙ্গী ছড়া সীমান্ত দিয়ে ১১ জন বাংলাদেশি প্রবেশ করেন। তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই দু’হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় যুবক শঙ্কু দাসের বিরুদ্ধে। শনিবার রাতে দুটি অটোরিক্সায় করে তাঁদের খোয়াই শহরে পাঠানোর চেষ্টা চলছিল। কিন্তু সোমবাড়িয়া বাজারে স্থানীয় বাসিন্দারা অটোরিক্সা দু’টি আটক করেন। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, যাত্রীরা বাংলাদেশি। মুহূর্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ জনতা দুই চালক বিশ্বজিৎ দাস ও অতীশ দাসকে মারধর করেন।

Advertisement

ঘটনার খবর পেয়ে পৌঁছয় বিশাল পুলিশবাহিনী। স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘চোখের সামনেই সীমান্ত পেরিয়ে লোকজন ঢুকছে। অথচ বিএসএফ কিছু করছে না। তাহলে এত ফেন্সিং, আলো, নজরদারি— সব কই গেল?’

পুলিশ পরে অটোরিক্সা দু’টি বাজেয়াপ্ত করে এবং ১১ জনকেই আটক করে থানায় নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদে ধৃতদের মধ্যে ছ’জন স্বীকার করেন— তাঁরা বাংলাদেশি, বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জে। বাকিরা দাবি করেন— তাঁরা কমলপুর ও শিলচরের বাসিন্দা। কিন্তু তাঁদের বক্তব্য নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

ধৃত বাংলাদেশিদের নাম জানানো হয়েছে— মণিরানি দাস (৩০), তাঁর মেয়ে মহিমা দাস (৮) ও পিয়াসা দাস (৩), দেওর দীপন দাস (৩০), হৃদয় দাস (২৮)— এঁদের সবার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকায়। গোপাল দাস (৪১)-এর বাড়ি হবিগঞ্জে। পাশাপাশি গ্রেপ্তার হয়েছেন কচুছড়ার প্রণবেশ সরকার (৩৬), কমলপুরের অর্চনা সরকার (৩৩), প্রিয়তম সরকার (৩), সাগর সরকার (১২) এবং শিলচরের সুজিত দাস (৩৭)। তাঁদের বিরুদ্ধে রাতেই তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

জেলা পুলিশ সুপার রানাদিত্য দাস জানিয়েছেন, ‘ধৃত ছয় বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা রুজু হয়েছে। দুই চালকের বিরুদ্ধেও মামলা চলছে। দালাল চক্রে কারা যুক্ত, তা নিয়েও তদন্ত চলছে।’

বিষয়টি সামনে আসার পর সীমান্ত সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নে উঠছে। খোয়াই মহকুমায় ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৬১.৫ কিলোমিটার। এর ৯৯ শতাংশেই কাঁটাতারের বেড়া, ফ্লাড লাইট, নজরদারি–ক্যামেরা রয়েছে। তবু উত্তর প্রান্তের কয়েকটি এলাকার ফাঁক গলে প্রতিদিনই ঢুকছেন বাংলাদেশিরা। এমনটাই দাবি স্থানীয়দের। অভিযোগ, বিগত তিন মাসে সীমান্তে থাকা দু’টি ব্যাটালিয়নের দায়িত্বাধীন অঞ্চল দিয়ে ‘কাতারে কাতারে’ অনুপ্রবেশ চলছে।

এই ঘটনার জেরে এলাকার মানুষ আতঙ্কিত। তাঁদের কথায়, ‘গ্রাম, বাজার, রাস্তা— সর্বত্র অচেনা লোক। কী ঘটছে বুঝতে পারছি না। যদি এ ভাবে অনুপ্রবেশ বাড়তেই থাকে, নিরাপত্তা বলে আর কিছুই থাকবে না।’

অবৈধ অনুপ্রবেশের এই ধারাবাহিক ঘটনা এখন সীমান্ত সুরক্ষা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। কাঁটাতার, আলো, ক্যামেরা— সবই কি শুধু লোক দেখানোর জন্য? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে গভীর ষড়যন্ত্র?

Advertisement