চাকরির পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ঝাড়খণ্ডে ছাত্র-যুবদের আন্দোলন ঘিরে মঙ্গলবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সোমবার আন্দোলনকারীদের বিধানসভা ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশি লাঠিচার্জ ও জলকামানের ব্যবহারের প্রতিবাদে বিজেপির (BJP) ডাকা ১১ ঘণ্টার বন্ধে রাঁচি-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় পথ অবরোধ, টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ এবং পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। বন্ধের সমর্থনে বিধানসভা অভিমুখে মিছিল করে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ বা এবিভিপি। মিছিল আটকাতে গিয়ে পুলিশ শতাধিক কর্মীকে আটক করে। অন্য দিকে, এই আন্দোলনের জেরে বিধানসভাতেও তুমুল হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেই অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি করে দিতে হয়।
ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা জেপিএসসি এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন বা জেএসএসসির বিভিন্ন পরীক্ষা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে বেশ কিছুদিন ধরেই আন্দোলন করছেন পড়ুয়া ও চাকরিপ্রার্থীরা। তাঁদের অন্যতম দাবি, জেএসএসসির কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল বা সিজিএল পরীক্ষা বাতিল করতে হবে এবং নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়মের সিবিআই (CBI) তদন্ত করতে হবে। ১০ আগস্ট এই দাবিতেই রাঁচিতে বিধানসভা ঘেরাওয়ের ডাক দেওয়া হয়েছিল। মিছিল বিধানসভার কাছে পৌঁছে ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয় (ABVP)। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও জলকামান ব্যবহার করে।
এরপরেই মঙ্গলবার বিজেপি (BJP) রাজ্য জুড়ে বন্ধের ডাক দেয়। সকাল থেকেই বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা রাঁচির বিভিন্ন রাস্তায় নামেন। কাঙ্কে রোডের সিএমপিডিআই গেট, কিশোরগঞ্জ, আরগোরা, কাঙ্কে, রাতু রোড-সহ বিভিন্ন জায়গায় পথ অবরোধ করা হয়। নিউক্লিয়াস মল, হারমু চক এবং কিশোরগঞ্জ চকের কাছে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখানো হয়। কয়েকটি জায়গায় পুলিশ বন্ধ সমর্থনকারীদের সরাতে গেলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যায়। রামগড়ে রাঁচি-পাটনা সংযোগকারী ৩৩ নম্বর জাতীয় সড়ক প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকে। চার লেনের ওই রাস্তায় দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। পরে পুলিশ গিয়ে অবরোধকারীদের সরিয়ে দেয় এবং কয়েকজনকে আটক করে।
আরও পড়ুন: শুধু পেট্রল নয়, এবার নজরে রান্নাঘর: LPG-তেও মিশবে ইথানল, বড় পদক্ষেপের পথে কেন্দ্র
বন্ধের মধ্যেই এদিন বিধানসভা অভিমুখে মিছিল করে এবিভিপি (ABVP)। পুরনো বিধানসভা ভবন থেকে নতুন বিধানসভা ভবনের দিকে মিছিল এগোতে শুরু করতেই পুলিশ বাধা দেয়। বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় বসে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের (Hemant Soren) সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে শুরু করেন। পুলিশ তাঁদের সরাতে গেলে ফের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত বহু বিক্ষোভকারীকে আটক করে পুলিশ। এক সংবাদ সংস্থার খবর অনুযায়ী, অন্তত ১১০ জন এবিভিপি (ABVP) কর্মীকে আটক করা হয়েছে। আটক কর্মীদের নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের বাস আটকে দেওয়ার চেষ্টাকে ঘিরেও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
বন্ধের প্রভাব পড়ে বিধানসভার ভিতরেও। অধিবেশন শুরু হওয়ার পর বিজেপি (BJP) বিধায়করা বিক্ষোভকারী ছাত্রদের উপর পুলিশি পদক্ষেপের প্রতিবাদে ওয়েলে নেমে স্লোগান দিতে থাকেন। শাসক ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে পাল্টা স্লোগানে অচল হয়ে পড়ে বিধানসভার কাজ। স্পিকার রবীন্দ্রনাথ মাহাতো প্রথমে দুপুর পর্যন্ত এবং পরে দুপুর ২টো পর্যন্ত অধিবেশন মুলতুবি করে দেন। দুপুরের পর অধিবেশন শুরু হলেও ফের হট্টগোল শুরু হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেই বিধানসভা অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি করে দেওয়া হয়।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে উঠেছে। বিজেপি নেতা তথা রাজ্যের বিরোধী দলনেতা বাবুলাল মারান্ডি ছাত্রদের দাবির প্রতি সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিজেপির অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশ হামলা চালিয়েছে। দলের তরফে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের(Hemant Soren) সরকারের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার পাশাপাশি কংগ্রেসকেও নিশানা করা হয়েছে। বিজেপির একাংশের প্রশ্ন, ছাত্রদের উপর পুলিশি পদক্ষেপের প্রতিবাদে কংগ্রেস কেন ঝাড়খণ্ড সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে না। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা দিল্লি বিজেপির সভাপতি হর্ষ মালহোত্রাও রাহুল গান্ধীকে নিশানা করে একই প্রশ্ন তুলেছেন।
আরও পড়ুন: দুর্গাপুজোর আগেই রাজ্য পুলিশে ১২ হাজার কনস্টেবল নিয়োগ
অন্য দিকে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ছাত্রদের উপর পুলিশি পদক্ষেপের নিন্দা করেছেন। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদরত ছাত্রদের উপর যে কোনও ধরনের হিংসার বিরোধিতা করেছেন তিনি। আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালও ঝাড়খণ্ডের আন্দোলনরত ছাত্রদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং দ্রুত সমস্যার সমাধানের আবেদন করেছেন।
তবে ছাত্র-যুব আন্দোলনকারীরা বিজেপির (BJP) বন্ধ থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রেখেছেন। তাঁদের বক্তব্য, তাঁদের দাবিকে যে কেউ সমর্থন করতে পারেন, কিন্তু আন্দোলন কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি নয়। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, তাঁরা কোনও রাজনৈতিক দলের পাশে দাঁড়াতে চান না। বরং তাঁদের দাবি, এবার মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে চান তাঁরা। মঙ্গলবার নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করার কথাও রয়েছে তাঁদের।
এই দিনের বন্ধে রাঁচি-সহ রাজ্যের বেশ কিছু এলাকায় স্কুল, দোকানপাট ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যাও ছিল তুলনামূলক কম। তবে সর্বত্র বন্ধের প্রভাব সমান ছিল না। এর মধ্যেই ছাত্রদের আন্দোলন, বিজেপির (BJP) বন্ধ এবং বিধানসভায় অচলাবস্থা— সব মিলিয়ে ঝাড়খণ্ডে নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগ এখন ক্রমেই বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠছে।
দেখুন: ‘রাজনৈতিক কারণে বঞ্চিত হয়েছে জঙ্গলমহল’, উন্নয়ন নিয়ে সরব শুভেন্দু
এদিকে, বিজেপির বন্ধের ডাকের তীব্র সমালোচনা করেছে শাসক শিবির। ঝাড়খণ্ডের মন্ত্রী ইরফান আনসারির অভিযোগ, ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে রাজনৈতিক স্বার্থে ‘হাইজ্যাক’ করার চেষ্টা করছে বিজেপি। তাঁর দাবি, হেমন্ত সোরেনের সরকার ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে সমর্থন করছে। কিন্তু বিজেপি আন্দোলনকে অন্য দিকে ঘোরাতে গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করছে। মন্ত্রীর কথায়, ‘ছাত্র আন্দোলনে হস্তক্ষেপ করার আপনারা কে ? আপনাদের কে ডেকেছে ? আজ আপনারাই বন্ধ ডেকেছেন। কেন ?’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকার-বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ছাত্রদের ‘ঢাল’ হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্য দিকে, জেএমএম সাংসদ মহুয়া মাঝির দাবি, ছাত্রদের প্রায় ৯৮ শতাংশ দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। বাকি দাবিগুলির মধ্যে কিছু বিষয় সরকারের এক্তিয়ারের বাইরে, আবার জেএসএসসির সিজিএল পরীক্ষা বাতিলের বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। তাঁর কথায়, মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন এবং কিছুটা সময় চেয়েছেন। মহুয়ার অভিযোগ, ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনার পরেও বিজেপি তাঁদের উস্কে দিয়ে আন্দোলনকে রাজনৈতিক রং দেওয়ার চেষ্টা করছে।