ভেজাল দুধে লিভার কিডনির সর্বনাশ

গুজরাতের সবরকণ্ঠ জেলায় উদ্ধার হয়েছে প্রায় ১৮০০ লিটার এমন দুধ যাতে আসল দুধের পরিমান মাত্র ৩০০ লিটার। ভাবা যায়! স্বাস্থ্যের জন্য সেরা উপাদান দুধ নিয়ে এহেন জালিয়াতি মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। গুজরাত পুলিশের লোকাল ক্রাইম ব্রাঞ্চ এবং খাদ্য সুরক্ষা ও মান নির্ধারণ কর্তৃপক্ষ (এফসিসিআই) কর্তাদের হাতে ধরা পড়েছে গোটা জালিয়াতি দলটি। পুলিশ জানিয়েছে, গত পাঁচ বছর ধরে সেখানে চলছিল ভুয়ো দুধ তৈরির এক বিপজ্জনক কারবার। অভিযানে একটি কারখানা থেকে বিপুল পরিমাণ ‘সিন্থেটিক’ দুধ উদ্ধার করা হয়েছে ।
চমকে দেওয়ার মত তথ্য দিয়েছেন তদন্তকারীরা।

তাঁরা জানিয়েছেন, কারখানায় মাত্র ৩০০ লিটার আসল দুধের সঙ্গে বিভিন্ন রাসায়নিক মিশিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৮০০ লিটার কৃত্রিম দুধ তৈরি করা হত। এই ভুয়ো দুধে মেশানো হত ডিটারজেন্ট পাউডার, ইউরিয়া সার, কস্টিক সোডা, রিফাইন পাম অয়েল এবং সয়াবিন তেলের মতো ক্ষতিকর উপাদান। পাশাপাশি ঘোল ও স্কিমড মিল্ক পাউডার মিশিয়ে সেটিকে দেখতে আসল দুধের মতো করা হত। পরে এই বিষাক্ত মিশ্রণ পাউচে ভরে বাজারে খাঁটি দুধের নামে বিক্রি করা হচ্ছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই দুধ শুধু শিশুদের জন্য নয়, পূর্ণবয়স্ক যেকোন মানুষের জন্য বিপদজ্জনক।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জন্য সতর্কবার্তা জারি করেছে এফসিসিআই। দুধের গুণমান যাচাই করতে কয়েকটি সহজ ঘরোয়া পরীক্ষার কথাও জানানো হয়েছে। যেমন, মসৃণ জায়গায় এক ফোঁটা দুধ ফেললে খাঁটি দুধ ধীরে গড়িয়ে সাদা দাগ রাখবে, কিন্তু জল মেশানো থাকলে তা দ্রুত গড়িয়ে যাবে।


আবার দুধে আয়োডিন দিলে রং নীল হলে বুঝতে হবে তাতে স্টার্চ রয়েছে। দুধ ঝাঁকালে বেশি ফেনা তৈরি হলে ডিটারজেন্ট থাকার সম্ভাবনা থাকে।চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন এই ধরনের রাসায়নিক মেশানো দুধ খেলে লিভার ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই দুধ কেনার সময় সতর্ক থাকা এবং বিশ্বস্ত উৎস থেকে পণ্য কেনার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সচেতনতা বাড়ানোই এখন এই ভেজাল দুধের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।

হেলথ ইনস্টিটিউট অফ নরওয়ের গবেষক ফার্নাড কেজ জানিয়েছেন, ডিটারজেন্ট, ইউরিয়া, কস্টিক সোডা বা ভেজাল তেল মিশিয়ে তৈরি কৃত্রিম দুধ শরীরের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই ধরনের দুধ নিয়মিত পান করলে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি— দুই ধরনের ক্ষতি হতে পারে—

১. লিভারের ক্ষতি
ডিটারজেন্ট ও কস্টিক সোডার মতো রাসায়নিক পদার্থ লিভারের কোষের উপর সরাসরি আঘাত করে। দীর্ঘদিন এই ধরনের ভেজাল দুধ খেলে লিভারের প্রদাহ, ফ্যাটি লিভার এমনকি লিভার বিকল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।

২. কিডনির উপর মারাত্মক প্রভাব
ইউরিয়া ও অন্যান্য রাসায়নিক শরীরে জমে কিডনির উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে কিডনিতে পাথর, ইউরিন সংক্রান্ত সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনি বিকল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

৩. হজমের গোলমাল
ডিটারজেন্ট মেশানো দুধ পেটে গেলে বমি, পেট ব্যথা, ডায়রিয়া, গ্যাস ও অম্বলের সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও গুরুতর হতে পারে।

৪. ত্বক ও অ্যালার্জির সমস্যা
রাসায়নিকযুক্ত দুধ শরীরে অ্যালার্জি, চুলকানি, র‍্যাশ বা ত্বকের সংক্রমণ ঘটাতে পারে। সংবেদনশীল ত্বকের মানুষদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি দেখা যায়।

৫. শিশুদের বৃদ্ধি ব্যাহত
শিশুদের শরীর অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভেজাল দুধ খেলে তাদের হাড়, মস্তিষ্ক ও শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। অপুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

৬. দীর্ঘমেয়াদে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি
এই ধরনের কৃত্রিম দুধে থাকা রাসায়নিক পদার্থ শরীরে ধীরে ধীরে জমে বিষক্রিয়া তৈরি করতে পারে। এতে স্নায়ুর সমস্যা, দুর্বলতা, ক্লান্তি এবং বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে।

চিকিৎসকদের পরামর্শ:
সবসময় বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড বা নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে দুধ কিনুন। দুধের গুণমান নিয়ে সন্দেহ হলে সহজ ঘরোয়া পরীক্ষা করতে পারেন বা নিকটবর্তী খাদ্য পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করান। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া জরুরি। সচেতন থাকলেই এই ধরনের বিপজ্জনক ভেজাল থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করা সম্ভব।