বর্তমানে ব্রিটেনে এডিএইচডি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি দ্য ব্রিটিশ জার্নাল অফ সাইকিয়াট্রি-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ৩২ জন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রেই এই রোগের সঠিকভাবে নির্ণয় হচ্ছে না। ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই সমস্যার হার বাড়ছে বলেই মনে করছেন গবেষকেরা। চিকিৎসকদের মতে, একই প্রবণতা ভারতেও দেখা যাচ্ছে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ব্রিটেনে প্রতি ২০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ১ জন এই সমস্যায় ভোগে, অর্থাৎ প্রায় ৫.৪ শতাংশ। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে আক্রান্তের হার প্রায় ৩.৩ শতাংশ। যদিও সচেতনতা কিছুটা বাড়ায় অনেকেই এখন চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন, কিন্তু মোট আক্রান্তের তুলনায় সেই সংখ্যা এখনও অনেক কম। ফলে বহু মানুষ রোগ নির্ণয়ের বাইরে থেকেই যাচ্ছেন।ভারতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। চিকিৎসকদের মতে, অনেক বাবা-মা বুঝতেই পারেন না যে তাদের সন্তানের আচরণগত সমস্যার পিছনে থাকতে পারে অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার অর্থাৎ এডিএইচডি। ফলে চিকিৎসা শুরুই হয় না।
এডিএইচডি হল একটি স্নায়ুবিক বিকাশজনিত সমস্যা, যার লক্ষণ সাধারণত শৈশব থেকেই দেখা দিতে শুরু করে এবং অনেক সময় প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও থাকে। এই রোগের সম্পূর্ণ নিরাময় নেই, তবে ওষুধ এবং আচরণগত থেরাপির মাধ্যমে লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।অনেকেই মনে করেন এডিএইচডি মানেই অতিরিক্ত দুষ্টুমি বা স্থির হয়ে বসে থাকতে না পারা। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এর লক্ষণ অনেক সময় সূক্ষ্ম হয়।
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সাধারণ লক্ষণের কথা জানিয়েছেন যেগুলি হল—সময়ের সঠিক ধারণা না থাকা বা সব কাজেই দেরি হয়ে যাওয়া, ঘর বা কাজের জায়গা সবসময় অগোছালো থাকা, কোনও কাজে অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়ে অন্য সব ভুলে যাওয়া, জরুরি কাজ বারবার পিছিয়ে দেওয়া, আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হওয়া, অন্যের অনুরোধে না বলতে না পারা, অধৈর্য হয়ে পড়া বা কথা বলার সময় অন্যকে থামিয়ে দেওয়া, অস্থিরতা বা ভিতরে ভিতরে ছটফট করা, কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো চিকিৎসা না হলে এডিএইচডি আক্রান্তদের মধ্যে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, নেশার প্রতি আসক্তি বা মানসিক সমস্যার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ট্যামসিন ফোর্ড জানিয়েছেন, অনেক সময় সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে রোগীরা বেসরকারি ক্লিনিকে ছুটছেন, যেখানে ভুল রোগ নির্ণয়ের আশঙ্কাও থাকে।শিশুদের মধ্যে এই সমস্যার নির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, জিনগত কারণের পাশাপাশি গর্ভাবস্থায় মায়ের কিছু স্বাস্থ্যগত অভ্যাসও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত কিছু ওষুধ সেবনের সঙ্গে এই সমস্যার সম্ভাবনার সম্পর্ক থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইকোলজিক্যাল থেরাপি, সামাজিক দক্ষতার প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধের সাহায্যে এডিএইচডি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তবে তার জন্য সবচেয়ে জরুরি হল সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, যদি এই ধরনের লক্ষণ দীর্ঘ সময় ধরে কাজকর্ম বা ব্যক্তিগত সম্পর্কে সমস্যা তৈরি করে, তবে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।