নকশালবাড়ির বিপ্লবী চারু মজুমদারের ওপর মূল্যবান বই প্রকাশিত

বাপি ঘোষ, শিলিগুড়ি, ১৫ এপ্রিল— পৃথিবীর বিভিন্ন মহলে শিক্ষাপ্রেমী ও চিন্তাবিদদের মধ্যে শিলিগুড়ির একটি নামের পরিচিতি রয়েছে৷ সেই নামটি হলো চারু মজুমদার৷ আজ নকশালবাড়ি বা নকশাল আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা হলেই বিশ্ব জুড়ে উঠে আসে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব চারু মজুমদারের নাম৷ সেই চারু মজুমদারের ওপর প্রায়ই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বই প্রকাশিত হয়৷ কিন্ত্ত প্রয়াত এই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে তাঁর পারিবারিক জীবনের অনেক অজানা এবং মূল্যবান কথা নিয়ে প্রকাশিত হলে ‘মেয়ের চোখে বাবা—চারু মজুমদার, বেলা অবেলার স্মৃতিলেখ ও গুচ্ছ গল্প’৷ প্রয়াত নকশাল নেতা চারু মজুমদারের ওপর এই বইটি লিখেছেন তাঁর কন্যা মধুমিতা মজুমদার৷ শিলিগুড়ি চন্ডাল পাবলিকেশন থেকে বইটি প্রকাশিত হয়৷ শারীরিক অনেক অসুবিধা বিশেষ করে পারকিনসনের মতো রোগের সঙ্গে লড়াই করে বইটি লিখেছেন মধুমিতাদেবী৷

বইটি থেকে চারু মজুমদার সম্পর্কে বহু তথ্য জানা যাবে যা আগামীদিনে নকশালবাড়ি আন্দোলনের গবেষকদের কাছেও এক মূল্যবান তথ্য সমৃদ্ধ দলিল হয়ে থাকবে৷ সেই বইয়ের শুরুতে ‘অসাধারণ আমার বাবা’ শিরোনামে কন্যা মধুমিতা মজুমদার তাঁর স্মৃতিচারণার এক জায়গায় লিখেছেন, ‘বাবা আমাকে গানে উৎসাহ যোগাতেন৷ নিজে খুব গান ভালোবাসতেন৷ পরবর্তীতে মা সাংসারিক ব্যয় সংক্ষেপ করে আমাকে একটা হারমোনিয়াম কিনে দিয়েছিলেন৷ বৃদ্ধ সঙ্গীত শিক্ষক ছিলেন ননীবাবু৷ উনি বুধবার করে সপ্তাহে একদিন গান শেখাতে আসতেন৷ বাবা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রসিক শ্রোতা ছিলেন৷ ওস্তাদ আমীর খাঁ ও পন্ডিত ভীমসেন যোশী ছিলেন বাবার প্রিয় শিল্পী৷ আমাদের মেয়েবেলায় আকাশবানী কেন্দ্রে দুপুর বারোটা থেকে সাড়ে বারোটা পর্যন্ত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান সম্প্রচার হোত৷ বাবা মন দিয়ে শুনতেন৷ এতটাই বোদ্ধা ছিলেন যে মাঝেমধ্যেই বলতেন, ‘মিটি শোন’ আমাকে অবাক করে প্রতিটি রাগকে আলাদা করে চিনিয়ে দিতে পারতেন৷ বাবা আমাকে আদর করে মিটি বলে ডাকতেন৷ আমি তখন ওস্তাদী গানের মাথামুণ্ডু বুঝতাম না৷ কলেজে পড়ার সময় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখতে শুরু করি, কিন্ত্ত বাবা তখন আর নেই৷ আমার বাবা ও মা দুজনে প্রায়ই দরাজ কন্ঠে কবিতা আবৃত্তি করতেন৷ মনে পড়ে সেই সময় অনেকেই বাবার কাছে কবিতা বলা শিখতে আসতো৷ বাবার মুখে শোনা একটা ঘটনা উল্লেখ না করে পারছি না৷

তেভাগা আন্দোলনের সময় গোপন অবস্থায় তিনদিন না খেয়ে থেকে, তৃতীয় দিনে বাবা পচাগড়ে গ্রামবাসী এক কৃষক কমরেডের বাড়ি পৌঁছেছেন৷ উঠোনে ভাত রান্না হচ্ছে৷ ভাতের হাঁড়ি ঘিরে শীর্ণকায় শিশুদের ভিড়৷ তারাও অভুক্ত৷ বাবা ও সাথী কমরেডরা ক্ষুধার সেই অসহ দৃশ্য দেখে চুপিচুপি পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে আসেন৷ ১৯৬২ সালে চীন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধের বিরুদ্ধতার জন্যে ভারতরক্ষা আইনে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে থাকাকালীন বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়৷ তখন তাঁকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে পি জি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়৷ আমরা( মা, দিদি, আমি ও অভি) সে সময় শিলিগুড়ি থেকে বাবার সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করতে যেতাম৷’ এভাবে বিভিন্ন তথ্য বইতে মেলে ধরেছেন মধুমিতাদেবী৷ বই প্রকাশের পর সাংবাদিকদের মধুমিতাদেবী বলেন, তাঁর বাবা রান্না করতেও ভালোবাসতেন৷ মাংস খুব ভালো রান্না করতেন৷
এদিন বিকেলে সেই বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রয়াত চারু মজুমদারের পুত্র তথা নকশাল নেতা এবং অধ্যাপক অভিজিৎ মজুমদারও উপস্থিত ছিলেন৷


অভিজিৎবাবুও সাংবাদিকদের সামনে সেই বইটি সম্পর্কে কিছু বক্তব্য মেলে ধরেন৷ অনুষ্ঠানে লেখক ও সাহিত্যিক বিপুল দাস, বিখ্যাত শল্য চিকিৎসক এবং উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডাক্তার এস পি ব্যানার্জী, ড. ঝিলিক দাশগুপ্ত, সুতপা সাহা সহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন৷ তাঁরা সকলেই সেই মূল্যবান বই প্রকাশনায় বেশ খুশি৷ সেখানে কবিতা পাঠ করেন শ্যামলী বসু৷ বই প্রকাশনার সেই ঐতিহাসিক মুহুর্তে উপস্থিত থাকতে পেরে তাঁরা সকলেই সন্তোষ প্রকাশ করেন৷