• facebook
  • twitter
Saturday, 28 February, 2026

ভন্ডামি ও প্রতারণাই যেখানে চালিকাশক্তি

শীর্ষ আদালত ওয়াকফ বোর্ডের হাতে পাঁচ একর জমি তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিল— মন্দির চত্বরে নয়, অন্য কোথাও— সেখানে তৈরি হবে নতুন মসজিদ।

ফাইল চিত্র

শোভনলাল চক্রবর্তী

ভারত থেকে পাকাপাকি ভাবে মুছে গেছে বাবরি মসজিদের শেষ দাগটুকু। একটা আপাত-অকিঞ্চিৎকর মসজিদ আর তাকে ঘিরে তৈরি করে তোলা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বয়ান কীভাবে পাল্টে দিয়েছিল ভারতের রাজনীতিকে, সেই তর্ক তার শেষ প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে৷ মন্দিরের অস্তিত্ব জানিয়ে দিচ্ছে যে, এই ধর্মনিরপেক্ষ দেশে সংখ্যালঘুরা হার মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। কীভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্ম ধাপে ধাপে পৌঁছে যেতে পারে এমন প্রশ্নাতীত জয়ে, আর কীভাবে রাষ্ট্রশক্তি সংখ্যালঘুদের বাধ্য করতে পারে জমি ছেড়ে দিতে, সে প্রশ্ন হয়তো ভবিষ্যতেও উঠবে, কিন্তু তেমন রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকবে কি তার? হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার এই আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, এবং মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পর্যবসিত করা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির শতাব্দীলালিত লক্ষ্য। কিন্তু, শুধু কি সেই রাজনীতিই পারত এমন নিঃসংশয় জয় অর্জন করতে? হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বাইরের পরিসরে কীভাবে মসজিদের মুছে যাওয়া ক্রমে অনিবার্য হয়ে উঠল?

Advertisement

১৯৮৫ সালে বাবরি মসজিদের তালা খোলার পর ক্রমে তৈরি হল মন্দিরকেন্দ্রিক রাজনীতির হাওয়া, লালকৃষ্ণ আডবাণী রথযাত্রা করলেন; করসেবকরা অযোধ্যায় মসজিদ ভাঙল, বিজেপি নেতারা সে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলেন— কেউ উল্লসিত ভঙ্গিতে, কেউ বা ছলছল চোখে। তার পাঁচ দিনের মাথায় ইলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দিল: মসজিদের জমির মালিকানা যেহেতু সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের এবং সেই জমিতে যেহেতু একটি কবরস্থান রয়েছে, ফলে উত্তরপ্রদেশে কল্যাণ সিংহের নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার যেভাবে সেই জমি অধিগ্রহণ করেছে, তা আইনানুগ নয়।

Advertisement

এই রায়ের দু’সপ্তাহের মধ্যে নরসিংহ রাওয়ের সরকার অর্ডিন্যান্স জারি করে মসজিদ ও সংলগ্ন এলাকার জমি অধিগ্রহণ করল এবং বাবরি মসজিদ তৈরি হওয়ার আগে সেখানে কোনও হিন্দু মন্দির বা কোনও হিন্দু ধর্মীয় কাঠামোর অস্তিত্ব ছিল কি না, সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের মতামত চাইতে অনুরোধ করল রাষ্ট্রপতিকে। ১৯৯৪ সালে আদালত সেই অনুরোধকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে সরিয়ে রাখল বটে, কিন্তু যে দাবিটি এত দিন ছিল হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির, তার উপরে রাষ্ট্রীয় সিলমোহর পড়ল। সুপ্রিম কোর্টের সেই রায়ে অযোধ্যার মসজিদ পরিসরে হিন্দুদের প্রার্থনার অনুমতি দেওয়া হল। তার পিছনে ছিল একটি তথ্যভিত্তিক যুক্তি— মসজিদ ভাঙার আগে যত মুসলমান সেখানে নমাজ পড়তে যেত, তাদের সংখ্যার চেয়ে সেই চত্বরে হিন্দু পুণ্যার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি।

তথ্যগতভাবে যুক্তিটি ঠিক, কিন্তু তার পিছনে একটা অন্য তথ্যও থাকে, আইনজীবী রাজীব ধাওয়ান যার উল্লেখ করেছিলেন— ১৯৪৯ সালের পর থেকে মুসলমানরা বাবরি মসজিদে নমাজ পড়েননি, তার কারণ, মসজিদে তালা ঝুলিয়ে সেখানে প্রবেশের পথ বন্ধ করেছিল রাজ্য সরকার।
মসজিদের জমি শেষ অবধি কাদের দখলে থাকবে, ইলাহাবাদ হাইকোর্টে সেই প্রশ্নে মামলা চলল দীর্ঘ দিন। ইলাহাবাদ হাইকোর্টের সেই রায় থেকে উঠে এসেছিল আরও একাধিক সূত্র, যার মধ্যে অন্যতম ছিল এই কথাটি যে, বাবরি মসজিদই রামের জন্মভূমি কি না, সেই প্রশ্নে ভক্তদের বিশ্বাসই যথেষ্ট। একটি পাঁচশো বছরের পুরনো মসজিদ, আর একটি মন্দির যার অস্তিত্বের কোনও অকাট্য প্রমাণ নেই— এই সময় থেকেই সে দু’টির গুরুত্ব হয়ে দাঁড়াল তুল্যমূল্য। বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিতে অযোধ্যার রাম মন্দিরের উল্লেখ যে নেহাতই অনতিঅতীতের কথা, এমনকি স্কন্দপুরাণেও তার অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে সম্ভবত সপ্তদশ শতকে, ইতিহাসবিদদের এমন আপত্তি গুরুত্বহীন হল।

আর্কিয়োলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার রিপোর্টের অস্পষ্ট ইঙ্গিত থেকেই প্রতিষ্ঠিত হল রাম মন্দিরের অস্তিত্বের প্রমাণ। পরবর্তী কালে, ২০১৯ সালে, প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ-এর বেঞ্চ এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণার সময় চার ইতিহাসবিদের (আর এস শর্মা, এম আতহার আলি, ডি এন ঝা ও সুরজ ভান) ১৯৯১ সালের রিপোর্টকে— যেখানে বলা হয়েছিল যে, অযোধ্যা আদৌ রামের জন্মভূমি নয়, এবং ১৮৫০-এর আগে রামায়ণেও অযোধ্যার বিশেষ গুরুত্ব ছিল না— ‘বড় জোর একটি মতামত’ বলে উড়িয়ে দিলেন। ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে গোটা জমিটিই রাম মন্দিরের জন্য বরাদ্দ হল। কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়িত্ব দিল আদালত— অছি পরিষদ গঠন করে তার হাতে মন্দির নির্মাণের ভার দিতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে কেন সরকার মন্দির নির্মাণের বিষয়ে মাথা গলাবে, সে প্রশ্ন তত দিনে অবান্তর। শীর্ষ আদালত ওয়াকফ বোর্ডের হাতে পাঁচ একর জমি তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিল— মন্দির চত্বরে নয়, অন্য কোথাও— সেখানে তৈরি হবে নতুন মসজিদ। কারণ, তাদের ধর্মস্থান ভাঙার ক্ষতিপূরণ প্রয়োজন।

আদালত জানাল, ১৯৪৯ সালে মসজিদে রামলালার মূর্তি স্থাপন করাও অন্যায় ছিল, ১৯৯২ সালে মসজিদ ভাঙাও অন্যায়। অযোধ্যায় মন্দির কি তবে এই দুটো অন্যায়ের উপরেই দাঁড়িয়ে থাকবে না? সেই অন্যায়ের স্বীকৃতিটুকু পেয়েছে মুসলমানরা; অন্যায় মুছে দেওয়ার কোনও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আজকের ভারতে তাদের কল্পনাতীত। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে ‘বৈচিত্রের মধ্যে একতা’-র গুণকীর্তন করেছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য মেনে নেওয়ার— মেনে নিতে বাধ্য হওয়ার— মধ্যে যে ‘একতা’, ভারতে তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিলক্ষণ।
ইতিহাস বলছে দ্বাদশ শতাব্দীতে বা তার আগে অযোধ্যায় কোনও মন্দির থাকা বা মুসলিমদের হাতে তার ধ্বংস হওয়ার কোনও চূড়ান্ত প্রমাণ নেই। অর্থাৎ বোঝাই যাছে যে, ভিএইচপি যে শিলালিপিগুলি পুঁতে দিয়েছিল, তাতে শেষ পর্যন্ত তাদের বক্তব্যই অসার বলে প্রমাণিত হচ্ছে। এই শিলালিপিগুলি দ্বাদশ শতাব্দীতে কোনও মন্দিরের গায়ে থাকলেও তার সঙ্গে রাম জন্মভূমির কোনও যোগ নেই। আর ওই রাম জন্মভূমিতে আগে কোনও মন্দিরও ছিল না।

মীর বাকি যেখানে বাবরি মসজিদ তৈরি করবেন বলে স্থির করেছিলেন সেখানেই রাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে যে প্রচার হিন্দুদের মধ্যে চালানো হয় তা অমূলক। বাবরি মসজিদ কোনও মন্দিরের জায়গায় তৈরি হয়েছে বলে ভিএইচপি দাবি তুললেও তারা এর সমর্থনে যে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পেশ করছে তাতে অনেক কারচুপি আছে। কারণ, ওইসব মূর্তি বা শিলালিপি উদ্ধারের সময় কোনও পেশাদার প্রত্নতত্ত্ববিদকে থাকতে দেওয়া হয়নি। ওইগুলির রঙ এবং প্রাকৃতিক অবস্থা দেখে বোঝাই যায় সেগুলিকে হাল-আমলে মাটিতে পোঁতা হয়েছে। ভিএইচপি তাদের বক্তব্যের পিছনে কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি স্থাপন করতে পারেনি।

বিজেপি সরকার যখন অবৈধভাবে বাবরি মসজিদের লাগোয়া জমির একটা বড়ো অংশ বিশ্ব হিন্দু পরিষদকে দিল তখনই চক্রান্তের আভাস পাওয়া গেল। তখন দাবি তোলা হল ১৯৯২ সালের জুন মাসে যখন ওই জমি সমান করা হচ্ছিল তখন একটি গর্ত পাওয়া যায়। সে গর্ত থেকে খোদাই করা কিছু মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। অদ্ভুত বিষয় হল, যখন এসব মূর্তিগুলি ‘উদ্ধার’ করা হল তখন কিন্তু আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াকে জানানো হয়নি। অথচ কোনও প্রত্নতত্ত্ব উদ্ধার তা ওই সংস্থাকে জানানো আইনগত দিক থেকে বাধ্যতামূলক। বরং এই উদ্ধারের সংবাদ বিশ্ব হিন্দু পরিষদ হঠাৎ ঘোষণা করল। তাদের ‘বিশেষজ্ঞরা’ বলতে শুরু করলেন, ওই মূর্তিগুলি একাদশ শতাব্দীর। এরকম একজন বিশেষজ্ঞ হলেন স্বরাজ প্রকাশ গুপ্ত, যিনি কোনও দিনই মধ্যযুগের গোড়ার দিকের স্থাপত্য সম্পর্কে কোনও কাজ করেননি। অপরদিকে মনে হচ্ছে এটাই ঠিক যে ওই মূর্তি বা স্থাপত্যগুলি কোনও একটি নির্দিষ্ট সময়কালের নয়। এগুলি সম্পর্কে আর এস শর্মা ‘দি হিন্দু’ পত্রিকায় (১০/১১/৯২) প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেছেন, এই মূর্তির স্থাপত্যগুলির সময়কাল সপ্তদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যে। সুতরাং এগুলি নিশ্চয় কোনও একটি মন্দিরের নয়। তাছাড়া বেশ কিছু মূর্তির রঙ দেখে বোঝা যাচ্ছে যে সেগুলি আংশিকভাবে মাটিতে গ্রোথিত ছিল। অর্থাৎ সেগুলি কোনও গহ্বর থেকে তোলা হয়নি। অর্থাৎ এগুলি বাইরে থেকেই আনা হয়েছে যখন উত্তর প্রদেশ সরকারের মাধ্যমে ওই জায়গাটি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বিজেপি-র পুরোপুরি দখলে ছিল, সেই সময়ে। সেজন্যেই ওই মূর্তিগুলি বিভিন্ন সময়কার।

বাবরি মসজিদের ইতিহাসের ক্ষেত্রে সঙ্ঘ পরিবার বিকৃতি ঘটিয়েছে। এনসিইআরটি-র নতুন পাঠ্যপুস্তকের ক্ষেত্রেও তারা একই কাজ করেছে। বিজেপি খোলাখুলি প্রচার করেছে যে, তারা ক্ষমতায় এসেছে বাবরি মসজিদের ধ্বংসাবশেষের ওপর দিয়ে। তাই এখন আরও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা ক্ষমতায় এসেছে প্রতারণা ও ভণ্ডামির মধ্য দিয়ে।

Advertisement