• facebook
  • twitter
Monday, 23 February, 2026

বাণিজ্যচুক্তি ও বিতর্ক

রাহুল গান্ধীর অভিযোগ যে প্রধানমন্ত্রী 'আপসকামী'— এটি রাজনৈতিক ভাষ্য। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত হল, ভারত কি আলোচনায় সমান অবস্থানে ছিল?

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর সাম্প্রতিক মন্তব্য আবার কেন্দ্রবিরোধী রাজনৈতিক সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিল।

নরেন্দ্র মোদীকে লক্ষ্য করে তাঁর অভিযোগ— ‘প্রধানমন্ত্রী আপসকামী, তিনি পুনরায় আত্মসমর্পণ করবেন।’ এ শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, এর মধ্য দিয়ে তিনি ভারত-আমেরিকা বাণিজ্যচুক্তিকে ঘিরে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। ঘটনাপ্রবাহে যুক্ত হয়েছে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়, যেখানে মার্কিন শুল্কনীতি সংক্রান্ত এক মূল সিদ্ধান্ত খারিজ হয়েছে বলে খবর। এই প্রেক্ষাপটে চুক্তির সময়, প্রক্রিয়া ও শর্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে কংগ্রেস।

Advertisement

ভারত-মার্কিন বাণিজ্যসম্পর্ক বহুস্তরীয়। প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও পরিষেবা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু যে কোনও বাণিজ্যচুক্তির কেন্দ্রে থাকে দেশের অভ্যন্তরীণ স্বার্থরক্ষা। কংগ্রেসের অভিযোগ, চুক্তির খসড়া, আলোচনার ক্রম ও চূড়ান্ত শর্তাবলি সম্পর্কে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই। বিশেষ করে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং দেশীয় উৎপাদন ক্ষেত্রের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে তাদের আশঙ্কা প্রবল। কৃষিপণ্যে শুল্কছাড় বা আমদানি সহজ করা হলে দেশীয় কৃষক কতটা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন, এই প্রশ্ন অমূলক নয়।

Advertisement

রাহুল গান্ধীর বক্তব্যে যে রাজনৈতিক তীব্রতা রয়েছে, তা নিঃসন্দেহে সংসদীয় কৌশলের অংশ। সামনে অধিবেশন, তাই বিরোধী দল চায় অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটিকে জনমতের কেন্দ্রে আনতে। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তি প্রায়শই বহুস্তরীয় দরকষাকষির ফল। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ আদালতের রায় সরাসরি অন্য দেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিকে অকার্যকর করে দেয় না। তবে যদি মার্কিন শুল্কনীতির ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে থাকে, তা হলে আলোচনার প্রেক্ষাপট যে বদলাতে পারে, সেটিও অস্বীকার করা যায় না। বিরোধীদের দাবি, এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত কি পুনরায় শর্ত পর্যালোচনার সুযোগ পাবে?

সরকারের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, এই চুক্তি রপ্তানি বাড়াবে, বিনিয়োগ টানবে এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বকে গভীর করবে। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাসের সময়ে ভারত যদি উৎপাদন ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রের বড় অংশীদার হতে চায়, তবে মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকারের গুরুত্ব অপরিসীম। সরকারি সূত্রের দাবি, সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলির জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা রাখা হয়েছে।

এখানেই মূল প্রশ্ন— স্বচ্ছতা। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, সুরক্ষা-ব্যবস্থার প্রকৃতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সংসদ ও জনসাধারণকে স্পষ্টভাবে জানানো হলে বিতর্কের অনেকটাই প্রশমিত হতে পারে। গণতন্ত্রে বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কেবল কূটনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠিতে বিচার করা যায় না, তার সামাজিক প্রভাবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা দেশীয় শিল্পোদ্যোগীরা যদি আশ্বস্ত না হন, তবে অর্থনৈতিক কৌশল রাজনৈতিকভাবে টেকসই হয় না।

রাহুল গান্ধীর অভিযোগ যে প্রধানমন্ত্রী ‘আপসকামী’— এটি রাজনৈতিক ভাষ্য। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত হল, ভারত কি আলোচনায় সমান অবস্থানে ছিল? আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য সব সময় সমান থাকে না। বৃহৎ অর্থনীতির সঙ্গে চুক্তিতে ছোট বা উদীয়মান অর্থনীতিকে কৌশলগত বিচক্ষণতা দেখাতে হয়। অতীতে ভারত বহুপাক্ষিক মঞ্চে কৃষি ও ওষুধ শিল্পের স্বার্থরক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বর্তমান চুক্তিতেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় আছে কি না, তা স্পষ্ট করা জরুরি।

অন্যদিকে, বিরোধীদেরও দায়িত্ব আছে তথ্যভিত্তিক সমালোচনা করার। আদালতের একটি রায়ের প্রেক্ষিতে চুক্তিকে সম্পূর্ণ ‘আত্মসমর্পণ’ বলে চিহ্নিত করা রাজনৈতিকভাবে তীক্ষ্ণ হলেও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে তার ভিত্তি কতটা দৃঢ়, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সংসদীয় বিতর্ক, স্থায়ী কমিটির পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনে শর্ত সংশোধনের প্রক্রিয়া— এসবই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ।

সবশেষে, এই বিতর্ক কেবল একটি বাণিজ্যচুক্তিকে ঘিরে নয়, এটি অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব বনাম আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের চিরন্তন টানাপোড়েনের প্রতিফলন। ভারত যদি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে চায়, তবে তাকে চুক্তি করতে হবে। কিন্তু সেই চুক্তি যেন দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক স্থিতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে— সেটি নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

সংসদে আসন্ন বিতর্ক তাই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের উচিত পূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে জনআস্থা সুদৃঢ় করা, আর বিরোধীদের উচিত যুক্তিসঙ্গত সমালোচনার মাধ্যমে নীতিনির্ধারণে গঠনমূলক ভূমিকা নেওয়া। আবেগ ও আক্রমণের বাইরে গিয়ে যদি এই আলোচনা পরিণত হয় তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণে, তবেই গণতন্ত্রের আসল শক্তি প্রকাশ পাবে।

Advertisement