শোভনলাল চক্রবর্তী
আরাবল্লী পাহাড় নিয়ে শীর্ষ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিতর্ক এখনও থামেনি। নবনির্মিত সংজ্ঞায় ভূষিত আরাবল্লীর ভবিষ্যৎ ‘উন্নয়ন’-এর কোপে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই জানা গিয়েছে, আর এক জীববৈচিত্রপূর্ণ অঞ্চল গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জও ভারত সরকারের সুবিস্তৃত উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আলোচনাসভায় উঠে এল উন্নয়নের আড়ালে অন্ধকার ভবিষ্যৎটির কথা। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য, সিঙ্গাপুর এবং হংকংয়ের আদলে ক্রান্তীয় বনভূমি আচ্ছাদিত অঞ্চলে এক অত্যাধুনিক শহুরে বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলা, যা মলাক্কা প্রণালীর কাছে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জের কৌশলগত অবস্থানের কারণে জাতীয় স্বার্থের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণও বটে। সংবাদে প্রকাশ, গ্রেট নিকোবরে বিমানবন্দর, পাওয়ার প্ল্যান্ট ও টাউনশিপ-সহ বিরাট এক প্রকল্পের বাস্তবায়নে দু’বছর আগেই সায় দিয়েছিল কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক। দেখা যায়, যে জায়গায় এসব হবে তার ৮০% জমিই ঘন অরণ্যে ঢাকা, কাটতে হবে প্রায় ১০ লক্ষ গাছ। এ ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী একটি ‘নন-ফরেস্ট ল্যান্ড’-এ ক্ষতিপূরণ হিসাবে অরণ্য সৃষ্টি করা বাধ্যতামূলক। তারই জায়গা হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছে হরিয়ানার পাঁচটি জেলাকে, এবং সরকার সেই লক্ষ্যে জমি চিহ্নিত করার কাজও শুরু করেছে। এই সংবাদ এক জন সাধারণ নাগরিক হিসাবে উদ্বিগ্ন করেছে। দু’টি স্থানের ভৌগোলিক দূরত্ব কেবল ২৪০০ কিমিই নয়, দু’টি স্থানের জলবায়ুগত পার্থক্যও আছে। গ্রেট নিকোবরে যেখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ৩৮০০ মিলিমিটার, সেখানে হরিয়ানাতে প্রায় ৫৯২ মিলিমিটার। ফলে দু’টি অঞ্চলের বৃক্ষের চরিত্রগত পার্থক্যও থাকবে। কিছু দুষ্প্রাপ্য বৃক্ষ, যা ওই অঞ্চলেই দেখা যায়, তা হারিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। বৃক্ষ নিধন মানে ওই সকল বৃক্ষের উপর থাকা অসংখ্য প্রাণীকে নিরাশ্রয় করা, যা পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের উপর বিপুল প্রভাব ফেলবে। আর একটা কথা মনে রাখা বোধ হয় দরকার যে, রোপণ করা চারাগাছ কখনও পরিণত বৃক্ষের সমতুল্য হতে পারে না।
Advertisement
এ বিষয়টি নিয়ে পরিবেশবিদ পঙ্কজ সেখসারিয়া একটি বই লিখেছেন। ১২৪ পৃষ্ঠার গ্রন্থটির নাম ‘দ্য গ্রেট নিকোবর বিট্রেয়াল’। একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি পত্রিকার সাক্ষাৎকারে লেখক জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের ফলে সবচেয়ে অসুবিধায় পড়বেন এখানে বসবাসকারী নিকোবরি ও শম্পেন জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষ। এঁদের সংখ্যা এমনিতেই ক্রমহ্রাসমান, এখন বিপুল সংখ্যক বাইরের মানুষ এখানে এলে তাঁদের বিবিধ রোগ এই জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে, যা প্রতিরোধ করার শারীরিক সক্ষমতা এই জনজাতি শ্রেণির মানুষের নেই। ধরা হচ্ছে, ২০৫০ সাল নাগাদ এই দ্বীপে তিন লক্ষ বাইরের মানুষ বসবাস করবেন এবং তখন জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষদের সঙ্গে তাঁদের অনুপাত হবে ১:১০০০। প্রভাব পড়বে এখানকার আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও জীবিকার উপরে। লেখক ও সংগ্রাহক পঙ্কজ সেখসারিয়ার মতে, এই প্রকল্পের মূল অংশটাই হল বাণিজ্যিক। বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হবে মূলত টাউনশিপ বানাতে এবং পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে। অথচ, এই দ্বীপটির অবস্থান সম্বন্ধে বলা হয়— দ্বীপটি অবস্থিত ‘অগ্নিবলয়’ অর্থাৎ ভূত্বকের ক্ষেত্রে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সক্রিয় অঞ্চলের উপর। এখানে প্রতি সপ্তাহেই তাই ভূমিকম্প হয়। সেই কারণে এই ধরনের বিশাল প্রকল্প দ্বীপ ও দ্বীপের বসবাসকারী মানুষের অস্তিত্ব সঙ্কটের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তবে আশার কথা, কেন্দ্রীয় জনজাতি বিষয়ক মন্ত্রক এই প্রকল্প বিষয়ে পুনরায় বিবেচনা করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে এবং প্রকল্প শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন।
Advertisement
গ্রেটার নিকোবর দ্বীপকে কেন্দ্র করে বন্দর, বিমানবন্দর, নগরী ইত্যাদি তৈরির পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সেই কাজের জন্য ওই দ্বীপ এলাকায় পরিবেশগত বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। কমিয়ে দেওয়া হয়েছে সংবেদনশীল এলাকার পরিমাপ। সেই নির্দেশিকার বিরুদ্ধে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে কলকাতা হাই কোর্টে। মামলাকারীর আইনজীবী পূষণ মজুমদারের অভিযোগ, কেন্দ্রের এই নির্দেশিকার ফলে গ্রেটার নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এলাকায় স্থানীয় জীবমণ্ডল, বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রসঙ্গত, গত বছর পাঁচেক ধরেই এই পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। ওই এলাকায় জনজাতি আবাস থাকায় এবং পরিবেশ, বন্যপ্রাণগত দিক থেকে সুরক্ষিত হওয়ায় একাধিক মন্ত্রকের ছাড়পত্র প্রয়োজন ছিল। নীতি আয়োগ স্বীকৃত এই প্রকল্পে অবশ্য বিভিন্ন মন্ত্রক সহজেই ছাড়পত্র দিয়েছে বলে খবর। সূত্রের খবর, গ্রেট নিকোবর উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একটি সামরিক ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে।
এই প্রকল্পের মধ্যে থাকবে একটি আন্তর্জাতিক কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণ, সামরিক ও অসামরিক উদ্দেশ্যে দ্বৈত ব্যবহারের জন্য একটি বিমানবন্দর, একটি গ্যাস, ডিজেল এবং সৌর-বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ১,০০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের দ্বীপে একটি গ্রিনফিল্ড টাউনশিপ। কিন্তু আন্দামানে এমন প্রকল্পের কুপ্রভাব নিয়ে বরাবর সরব হয়েছেন পরিবেশবিদেরা। জাতীয় স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে উন্নয়নমূলক কাজকর্ম হবে— তাতে আপত্তি থাকার কথা নয়, যদি সেই উন্নয়ন সুস্থায়ী এবং পরিবেশবান্ধব হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তেমনটি হওয়ার লক্ষণমাত্র নেই। প্রথমত, প্রকল্প অঞ্চলটি ‘গ্রেট নিকোবর বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ’-এর অভ্যন্তরে সংরক্ষিত অরণ্যের অংশ। স্থানীয় প্রাণিসম্পদের প্রায় ২৪ শতাংশের ঠিকানাও এই অঞ্চলটি। উন্নয়নের ধাক্কায় তাদের বিরাট অংশই অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে পড়তে চলেছে। এর মধ্যে রয়েছে মেগাপোড পাখি থেকে শুরু করে গ্যালাথিয়া খাঁড়িতে ডিম পাড়তে আসা বিশালাকায় লেদারব্যাক সি টার্টলও। সমুদ্র দূষিত হলে হারিয়ে যেতে পারে বহু সামুদ্রিক প্রাণী, মাছ, ধ্বংস হবে সুবিস্তৃত প্রবাল প্রাচীরও। তা ছাড়া কয়েক লক্ষ ক্রান্তীয় বৃক্ষ কাটা পড়বে। তার ধাক্কায় স্থানীয় বর্ষাচক্রের ছন্দটি বিপুল ভাবে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা। সামগ্রিক ভাবে ভারতের উপরেও যে এর প্রভাব পড়বে না, তার নিশ্চয়তা কই? এই ক্ষতি পূরণের কথাও অবশ্য বলা হয়েছে। দশ লক্ষ ক্রান্তীয় বৃক্ষের পরিবর্তে গাছ লাগানো হবে হরিয়ানা ও মধ্যপ্রদেশে। হাস্যকর প্রয়াস। ক্রান্তীয় অরণ্য ও তাকে ঘিরে থাকা বাস্তুতন্ত্র সুদীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠে। পরিকল্পিত অরণ্য সৃষ্টি করে সেই ক্ষতিপূরণ অসম্ভব। ইতিপূর্বেও দেশের ক্রান্তীয় বা প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট অরণ্যগুলিকে নির্বিচারে কেটে কিছু পরিকল্পিত অরণ্য সৃষ্টির মাধ্যমে খাতায়-কলমে অরণ্য আচ্ছাদন অটুট দেখানোর প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়েছে। এই হিসাবের গোঁজামিল শেষ পর্যন্ত দেশের পরিবেশগত ভারসাম্যে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
অন্য ক্ষতির সম্ভাবনাটি দ্বীপপুঞ্জের জনজাতিভুক্তদের জীবনে। এই দ্বীপের জনসংখ্যা আট হাজারের কাছাকাছি। উন্নয়নের পর তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে সাড়ে আট লক্ষে। এই বৃদ্ধিকে ধারণ করা স্বল্পায়তন দ্বীপটির পক্ষে সম্ভব কি না, প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। কী হবে এখানকার জনজাতিভুক্তদের? তাঁদের সংখ্যা এমনিতেই ক্রমহ্রাসমান। আধুনিক বিশ্ব থেকে নিজেদের পৃথক করে রাখা জনজাতিভুক্তরা পরিবেশের এই আমূল পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেবেন কোন উপায়ে? না কি তাঁদের স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্য, নিজস্ব সংস্কৃতির পরিসরটুকুকে কেড়ে জবরদস্তি মিশিয়ে দেওয়া হবে ‘আধুনিক বিশ্ব’-এর সঙ্গে? এক দিকে জলবায়ু পরিবর্তন, অন্য দিকে আগ্রাসী উন্নয়নের চাপে সারা বিশ্বেই দুর্বল, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলি কোণঠাসা। ভারত সেই তালিকাকেই বিস্তৃততর করছে মাত্র।
Advertisement



